
পুরনো বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটেছে, এরপর যা আসতে পারে
অবশ্য আগামী বছর বা দশকগুলোতে পরিস্থিতি অন্য যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে—এমন সম্ভাবনা অগণিত। আমাদের মহান আমেরিকান চিন্তাবিদের ভাষায়, “ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন, বিশেষ করে ভবিষ্যতের বিষয়ে।”

মানুষ শিখতে চায়। প্রাচীনকাল থেকেই এই পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের শেখার ইচ্ছাটা একটু বেশিই দেখা গেছে। আর সেই কারণেই অন্যান্য প্রাণীদের পেছনে ফেলে মানুষ এই পৃথিবীতে অনেকটা শাসক হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। আর এই শেখার ইচ্ছাটাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাহিত করেছে।
তাই কোনো মানবশিশুর জন্মের পর থেকেই তাকে এক ধরনের শিখন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেসবের উপকরণও নানা ধরনের হয়। হ্যাঁ, নিজেদের লাশ থেকেও মানুষ শেখে বটে। সেভাবেই চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি হয়েছে। তবে তা হয়েছে জীবন বাঁচানোর ইচ্ছা থেকেই। দিন যত গেছে, মানুষ নিজের লাশ থেকে শেখার বিষয়টা সংকুচিত করেছে এবং করছে। কারণ মৃত মানুষের নির্জীব দেহটাকে যতটা সম্ভব সম্মান দেওয়ার একটা সমষ্টিগত ইচ্ছাও মানুষের মধ্যে আছে।
তো, আমাদের দেশের দুটি মানুষ সম্প্রতি বিদেশের মাটিতে মারা গেছেন। সৌদি আরবে ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। হয়েছে শিরশ্ছেদ। অর্থাৎ, মাথাটাকে কেটে শরীর থেকে আলাদা করে মৃত্যুর দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বর্তমান তথাকথিত সভ্য রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থা এবং পররাষ্ট্রনীতির দৌলতে এসব বিষয়ে আগে থেকে জানা কর্তব্য। অথচ, বাংলাদেশের সরকার সে বিষয়ে কিছুই জানত না। সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের দূতাবাসও জানত না। জানত না দেশের পররাষ্ট্রনীতি দেখা মন্ত্রণালয়ও। বাংলাদেশের মানুষ তা জেনেছে সৌদি সংবাদমাধ্যম থেকে। ওরাই জানিয়েছে যে, দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হয়েছে। অভিযোগ দিয়েছে, অনৈতিক কর্মকাণ্ড বিষয়ক অপরাধের।
এই সবটাই আসলে সৌদি আরবের দাবি কেবল। যেহেতু বাংলাদেশ সরকার কিছুই জানে না, ফলে বিদেশের মাটিতে দেশি নাগরিক দুজন (১ নারী, ১ পুরুষ) আদৌ কোনো সঠিক আইনি সুরক্ষার সেবা পেয়েছেন কিনা, তাও নিশ্চিত করার কোনো উপায় নেই।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ দুজনের মৃত্যুদণ্ডের খবর সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু সৌদি আরব কিংবা বাংলাদেশ সরকার কেউই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করেনি। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই দুই বাংলাদেশির একজনের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, এক সপ্তাহ আগেও তিনি জেলে থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, যদিও মৃত্যুদণ্ড হতে পারে এমন কোনো আভাস তিনি দেননি। ওই ব্যক্তিটির মা ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে আনা ও ঘটনার ন্যায় বিচার চেয়েছেন।
তো সব জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর আমাদের দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এটি সত্যিই স্বস্তির খবর। সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে গত রোববারই ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে ডেকে এনে বৈঠক করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রিরা। জানানো হয়েছে যে, সৌদি আরবে যে দুজনের মৃত্যুদণ্ডের খবর এসেছে, তাদের ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল। সরকার এখন রায়ের কপি চেয়েছে।
যদিও ২০২৩ সালের ওই ঘটনার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন এতদিনেও কিছু জানল না, বা কী ব্যবস্থা নিতে পারল বা কেন পারল না- সেসব নিয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে এতকিছুর ফাঁকেও দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দেওয়া হয়েছে বিশেষ ‘নসিহত’। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ‘আমাদের জন্য’ বড় শিক্ষা বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। গত শনিবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি কথাটি বলেছেন। সে সময় তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের যেই দেশেই থাকুক, সেই দেশের আইন মেনে চলার পরামর্শ দেন।
অতিগুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ বটে। আমাদের দেশে আইনের শাসনের যে অবস্থাই থাকুক না কেন, বিদেশে তো আর সেটি থাকে না। তাই বিদেশের মাটিতে গিয়ে ভিনদেশি নাগরিক হিসেবে আয়ের পাশাপাশি এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর পাশাপাশি ওই দেশের আইন মেনে চলা অবশ্যই উচিত। না মানলে সমস্যা হবেই। কিন্তু ভিনদেশি আইন সম্পর্কে জানানো বা ওই আইনের জালে কেউ বাংলাদেশি প্রবাসীদের ফাঁসিয়ে দিচ্ছে কিনা, তা কি আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খেয়াল রাখে? কতটুকু খেয়াল রাখা হয় আসলে? যদিও সেসব দেখভাল করাই এ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বড় কাজ হওয়ার কথা। অথচ আমরা দেখছি, দুই, তিন বছরেও একজন প্রবাসীর আটক হওয়ার, বিচার চলার বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরও আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানতে পারছে না। মাথা কেটে ফেলার পর এখন রায়ের কপির জন্য অপেক্ষা করছে। লাশের জন্য অপেক্ষাটা তাহলে শুরু হবে কবে?
ওহ্, লাশের কথা উঠতে মনে পড়ল। ওই দুই বাংলাদেশির লাশেও তো ট্যাগ পড়েছে। অনেকটা সরকারি ট্যাগই বলা যায়। সরকারদলীয় এমপি, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন এক বেসরকারি টেলিভিশনের টক শোতে বলেছেন, ‘আমি এই পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক, তা চাই না।’ ওই টক শোতে তিনি এও বলেছিলেন যে, এই মন্তব্যের জন্য কেউ তার প্রতি ক্ষুব্ধ হলেও তার কিছু আসে যায় না। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তেমনই ছিল। সেই এমপি আবার সমালোচনা ওঠার পর ওই মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশও করেছেন। বলেছেন যে ভুল হয়েছে, ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু, এমপি মহোদয়, যা বলার তো বলেই ফেলেছেন। ওই দুই বাংলাদেশি নাগরিকের পরিবারের মানুষজন তা শুনেছে, দেখেছে। আপনি তাদের পা ধরে বসে থাকলেও, তারা আপনাকে কি ক্ষমা করবে? সব অকাজের ক্ষমা কি হয়?
কোনোকিছু ঠিক মতো জানার আগেই তাহলে কেন দুই বাংলাদেশির লাশকে ‘পাপের লাশ’ বলে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে? কেন প্রতিমন্ত্রী লাশ ভুলে ‘শিক্ষা’ নিতে বলছেন? যেখানে তিনি নিজেই বলছেন যে, ঘটনা পুরোপুরি জানা যায়নি। অথচ শিক্ষা নিতে বলতে কেন ইতস্তত বোধ করছেন না? তাদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য?
অথচ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসার সময় ঠিকই তা সরকারের সফলতা হিসেবেই প্রচার করা হয়। বলার চেষ্টা হয় যে, সরকার ভালো, তাই এত এত রেমিট্যান্স আসছে। সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আছে, নির্ভরতা আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তা সেই আস্থা ও নির্ভরতার প্রতিদান কী? ‘পাপের লাশ’ সরবরাহ? নাকি নতুন ‘শিক্ষা’র স্কুল খোলা?
যাক গে। যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। বিদেশের মাটি দুটো বাংলাদেশি মানুষের মাথা কাটার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক না জেনেও, না জানিয়েও, ওই দুটো মানুষের পরিবারকে পাপ, পূণ্যের নসিহত দেওয়া হয়ে গেছে। তা জনগণকে শিক্ষা নিতে বলা মন্ত্রণালয় এখন কি একটু নিজেদের দিকেও তাকাবে? নিজেদের কাজগুলো ঠিকঠাক মতো করার শিক্ষাটা কি একটু নেবে? যত যাই হোক, তাদের বেতন তো এসব করার জন্যই দেয় জনগণ।
আর দয়া করে, মানুষ দুইটার লাশের অপেক্ষাটা একটু শুরু করা হোক সরকারি কায়দায়। কফিনে ‘পাপের লাশ’ লিখেও যদি ফেরত দেওয়া যায়, দেন অন্তত! জনগণের করের টাকায় চলা সরকারের কাছে এতটুকু আশা তো করা যায়, নাকি?
অর্ণব সান্যাল: বার্তা সম্পাদক, চরচা

পুরনো বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটেছে, এরপর যা আসতে পারে
অবশ্য আগামী বছর বা দশকগুলোতে পরিস্থিতি অন্য যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে—এমন সম্ভাবনা অগণিত। আমাদের মহান আমেরিকান চিন্তাবিদের ভাষায়, “ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন, বিশেষ করে ভবিষ্যতের বিষয়ে।”

সৌদি রাজতন্ত্রকে নিরাপত্তা খুঁজতে হবে জনগণের শাসনের মধ্যে
নিজেদের উত্তম ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃত ভরসা খুঁজতে হবে আরব সাগর, লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতির ওপর।

মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্যই ইশরাকের পদত্যাগ!
প্রশ্ন উঠেছে, একজন প্রতিমন্ত্রীকে অস্ত্র উঁচিয়ে যদি মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করছে?

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কি রিপাবলিকানদের জন্য অন্ধকার দিন অপেক্ষা করছে?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশংসা করতেই হয়। তিনি ডেমোক্র্যাটদের ক্ষুব্ধ করেছেন, নিরপেক্ষ ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছেন, আর এখন—সব মিলিয়ে—রিপাবলিকানদেরও বিরক্ত করে তুলেছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকতে, এটি খুব একটা বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক কৌশল নয়।