
জনমিতিক লভ্যাংশকে বেকারত্বের অভিশাপে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না
আজ যদি আমরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের এই ব্যবধান দূর করতে ব্যর্থ হই, তবে জনমিতিক লভ্যাংশ একসময় জনমিতিক বোঝায় পরিণত হবে।
কিছুদিন পরপরই আমরা কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিয়ে নানা বক্তব্য শুনতে পাই। এই যেমন, ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে’, ‘সাংবাদিকদের স্বাধীনতা জাতির জন্য অতীব প্রয়োজন’, ‘সংবাদমাধ্যমের প্রতি হুমকি সহ্য করা হবে না’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব বক্তব্য যেমন সরকারি তরফে আসে, তেমনি আসে সাংবাদিকদের সংগঠন থেকেও। কিন্তু দিনশেষে আসলে এই সোনার বাংলায় সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন? সাংবাদিকদের জানমালের নিরাপত্তাই বা কতটা?
শেষের প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার আগে বরং একটি খবর জেনে নেওয়া যাক। গত বৃহস্পতিবার রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ওই সাংবাদিকের নাম লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। সীমান্তে চোরাচালান, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দুর্গাপুরে শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি চায়ের দোকান থেকে বের হওয়ার পর গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে ছয়টি গুলি করা হয়েছিল।
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির অবশ্য আগে থেকেই আশঙ্কা করছিলেন যে, তিনি হামলার শিকার হতে পারেন। গত বছরের ৩০ নভেম্বর নেত্রকোনার তৎকালীন পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। এমনকি স্থানীয় পুলিশকে এ ব্যাপারে অবহিতও করেছিলেন। তবে পুলিশ আসলে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার জানের শঙ্কা মেটাতে? আংশিক উত্তর হয়তো পাওয়া যায় আলিফের গায়ে চালানো ছয়টা গুলি থেকেই।
এ ঘটনায় নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। হত্যায় জড়িত সন্দেহে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, দুর্গাপুর থেকেই। সুতরাং এবার আর ‘পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি’–তেমনটা বলার সুযোগ নেই। রোগী মারা যাওয়ার পরও ডাক্তার যে হাজির হয়েছে এবং অপারেশন চালিয়ে গেছে, সেটাই বা কম কীসে!
তো, সাংবাদিকদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি আসলে সুখকর বা স্বস্তিদায়ক নয় কোনোভাবেই। একটু হিসাব দেখা যাক। সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি(এইচআরএসএস) দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে।
তাতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সারা দেশে ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় ২৯৭ জন আহত, ৮৭ জন লাঞ্ছিত এবং ৭৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। আটক হয়েছেন ২০ সাংবাদিক।
ওদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পর্যবেক্ষণ বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সারা দেশে সাংবাদিক নিপীড়নের মোট ৩১৫টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেই সাংবাদিক নিপীড়নের ৪২টি ঘটনা ঘটেছে। আর ঘোষিত ও স্বীকৃত সন্ত্রাসীরা ঘটিয়েছে ৪৩টি ঘটনা। নিপীড়নকারীর ভূমিকায় সরকারে থাকা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোও আছে। তারা ২৭টি নিপীড়নের ঘটনায় কর্তা। বিরোধী দলে থাকা জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোও পিছিয়ে নেই। ২২টি ঘটনায় তারা কর্তা। অবশ্য ‘ছায়া সরকার’ হিসেবে পিছিয়ে থাকলে তো আর চলে না!
এর উপরে আছে আবার দেশে প্রচলিত নিপীড়নমূলক আইন। এইচআরএসএস বলছে, এই ৯ মাসে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর অধীনে ৫১ সাংবাদিককে আসামি করে ১৯টি মামলা করা হয়েছে। আসক বলছে, এই আইনের অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৬টি ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সংখ্যাটি যে পনেরোর বেশি, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
এবার বলুন তো, এই দেশে সাংবাদিকেরা আসলে কেমন আছে? তাদের জানমালের নিরাপত্তা কতটা আছে? যে দেশে সরকারি দল, বিরোধী দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রতিষ্ঠিত সন্ত্রাসী, অপরাধীরা মিলেমিশে এভাবে সাংবাদিকদের নিপীড়ন করতে পারে, নির্যাতন করতে পারে, সে দেশে আলিফের জীবন গুলিতে শেষ হবে না, তো কী হবে?
হ্যাঁ, এটি ঠিক যে, আমাদের বাংলাদেশে কোনোকালেই সাংবাদিকেরা আরামে ছিলেন না। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার একেবারে নহর বইয়ে দেওয়া সময়, এ দেশের সাংবাদিকেরা জীবনে চোখে দেখেনি। তেমন আশা এ দেশের কয়জন সাংবাদিক স্বপ্নের মধ্যেও দেখেন, তা নিয়েও একটা জরিপ হতে পারে। হাতে গোণা হতচ্ছাড়া ঘরানার আশাবাদী সাংবাদিক ছাড়া সেই জরিপে ইতিবাচক উত্তর দিতে কাউকে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
এই দেশে সাংবাদিকেরা তাই খারাপের তারতম্য বিচার করেই একটু সুবিধাজনক সময় বেছে নিতে পারে। সেই তারতম্যের বিচারে বর্তমান সময়টা একেবারেই সুবিধার না। আগে ক্ষমতা (সেটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক, যেটিই হোক) সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে চাইত বেশি, কোণঠাসা করতে চাইত, হয়রানি করত। কিন্তু গত বছরদুয়েক ধরেই সংবাদ পছন্দ না হলেই প্রচণ্ড মাত্রায় নিপীড়ন ও নির্যাতন করার একটি ট্রেন্ড চালু হয়ে গেছে। এবং গায়ে হাত তোলা, হামলা চালানো, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মব করার চেষ্টাসহ একটি নানামাত্রিক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
যদিও এক বছর আগেই সরকারি তরফে একজন কর্তাব্যক্তি বলেছিলেন দেশীয় সংবাদমাধ্যমের ‘অভূতপূর্ব স্বাধীনতা’ উপভোগের কথা, তবে আসলে ওই সময় থেকেই এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো এক ‘অভূতপূর্ব’ সেলফ সেন্সরশিপের ভেতরে ঢুকেছে। কারণ, সেই সময়কার ওই সাবেক সাংবাদিকের সরকারের আমলেই এ দেশে দুটো সংবাদমাধ্যমের ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল, ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ঘটনা ঘটেছিল। এবং সেসব ঘটনায় পুরো সরকারযন্ত্রের ‘অভূতপূর্ব’ নীরবতা সবাই প্রত্যক্ষ করেছে।
সাংবাদিকদের প্রতি সেসব নিপীড়ন, নির্যাতনের ধারাবাহিক ফলাফলই হয়তো বর্তমান এই সময়টা। অন্যায়ের সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ব্যবস্থা না করলে নির্যাতনকারীরা আদতে উৎসাহিতই বোধ করে। এই দেশে সাংবাদিকতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তার হিসাব আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও দিচ্ছে। প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ) ২০২৬ সালে জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
এই অবনতির মিছিলে বাংলাদেশও পিছিয়েছে। ২০২৬ সালের সূচকে গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৫২তম। গত বছর (২০২৫) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৯তম। অর্থাৎ, এক বছরে সূচকে আরও তিন ধাপ অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের।
অবনতির এই ধারায় নিশ্চিতভাবেই উন্নতির কোনো চিহ্ন নয় সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, সাংবাদিকদের প্রতি নিপীড়নকে কেমন যেন ‘খেলারাম খেলে যা’ মনোভাবে ঘটতে দেওয়া হচ্ছে অবলীলায়। নিশ্চয়ই সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিক মহলেও ত্রুটি, বিচ্যুতি আছে। তবে সেসব আর এই দেশের কোন খাতে নেই, কোন পেশায় নেই? কিন্তু তাই বলে কি কোনো গণতান্ত্রিক দেশে সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রশ্নে একের পর এক সরকার এতটা উদাসীন থেকে যেতে পারে?
পারে যে, সেটা তো এ দেশেই দেখা যাচ্ছে। আসলে ক্ষমতা যেমন চারিত্রিক কারণেই প্রশ্ন শুনতে ইচ্ছুক থাকে না, তেমনি শুধুই ক্ষমতার রাজনীতি করনেওয়ালারাও ততদিনই সংবাদমাধ্যমের ততটুকু স্বাধীনতার পক্ষে থাকেন, যতদিন সংবাদ তাদের পছন্দ হয়। শঙ্কার বিষয় হলো, এমন প্রবণতা এখন দেশের নানা স্তরেই দেখা দিয়েছে। তাই সংবাদ পছন্দ না হলেই সাংবাদিকদের মারধর, মামলা, হামলা, এমনকি গুলি করে মেরে ফেলাটাও ‘সহজ’ হয়ে উঠছে। আর এমন সহজীকরণই আমাদের দেশে ক্রমে সাংবাদিকদের ‘হত্যাযোগ্য’ করে তুলেছে। তবে মনে রাখা দরকার, এমনটা চলতেই থাকলে, এই দেশের অবশিষ্ট গণতান্ত্রিক কাঠামোও ধ্বংসের মুখোমুখি হবে অচিরেই।
তাই যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে নিজেদের ভালোর জন্যই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। এখন সেটি সরকারসহ সব পক্ষেরই অনুধাবন করা প্রয়োজন। অবশ্য সম্প্রতি প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে যে লক্ষণ প্রতিভাত হচ্ছে, তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়া বেশ কঠিনই। বরং বারবারই শুধু মনে হতে থাকে যে, এ দেশে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটা আর বোধহয় কারও দ্বারা হলো না!
অর্ণব সান্যাল: বার্তা সম্পাদক, চরচা

জনমিতিক লভ্যাংশকে বেকারত্বের অভিশাপে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না
আজ যদি আমরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের এই ব্যবধান দূর করতে ব্যর্থ হই, তবে জনমিতিক লভ্যাংশ একসময় জনমিতিক বোঝায় পরিণত হবে।

মার্কিন ডলারের প্রকৃত মূল্য ক্রমে কমছে
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ সম্প্রতি ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে—এটা এমন এক বিশাল সংখ্যা, যা মানুষের মস্তিষ্ক ঠিকঠাক ধারণই করতে পারে না। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তার দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য শপথ নেন, তখন ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৬.২ ট্রিলিয়ন ডলার।

‘পাপের লাশ’ কীভাবে আমাদের ‘শেখা’র উপকরণ হচ্ছে?
কোনো মানবশিশুর জন্মের পর থেকেই তাকে এক ধরনের শিখন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেসবের উপকরণও নানা ধরনের হয়। হ্যাঁ, নিজেদের লাশ থেকেও মানুষ শেখে বটে। সেভাবেই চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি হয়েছে। তবে তা হয়েছে জীবন বাঁচানোর ইচ্ছা থেকেই। দিন যত গেছে, মানুষ নিজের লাশ থেকে শেখার বিষয়টা সংকুচিত করেছে এবং করছে।

পুরনো বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটেছে, এরপর যা আসতে পারে
অবশ্য আগামী বছর বা দশকগুলোতে পরিস্থিতি অন্য যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে—এমন সম্ভাবনা অগণিত। আমাদের মহান আমেরিকান চিন্তাবিদের ভাষায়, “ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন, বিশেষ করে ভবিষ্যতের বিষয়ে।”