
ব্যারিকেড গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে পারে না
গত কয়েক মাসে যন্তর মন্তর এলাকায় বেশ জোরদার আন্দোলন-বিক্ষোভ দেখা গেছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের জেরে নতুন করে বিক্ষোভের ঢেউ উঠেছে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। প্রতি শব্দের অদ্যাক্ষর নিয়ে মজা করে সংক্ষেপ করতে চাইলে হয়ে যায়, ‘স–স্বা’। এখন এটিকে উচ্চারণের কিঞ্চিৎ সমতার হিসাবে যদি ‘শসা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চান, তাতেও খুব একটা ভুল হবে না। কারণ আমাদের দেশে যেভাবে লবণের বিজ্ঞাপনে অবলীলায় শসা কচকচিয়ে খেয়ে ফেলার দৃশ্য দেখানো হয়, ঠিক সেভাবেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও খেয়ে ফেলা যায় ইচ্ছে হলেই। অনেক সময় লবণও লাগে না সাথে!
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অনেকটা পথ পার করেছে। একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কী ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়, বা গড়ে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়—৫০ বছরের বেশি এই সময়কাল অন্তত সেটি নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশ সেই সময়টা পেয়েছে। তো, ফলাফল হিসেবে যদি সংবাদমাধ্যমের দিকে আমরা তাকাই, তাহলে যে চিত্রটি দেখা যাবে, ওটিই আসলে পুরো দেশের একটি চিত্র ফুটিয়ে তোলে। বলতেই হয় যে, সেই চিত্রটি একেবারেই স্বস্তিদায়ক নয়। বরং কিছু ক্ষেত্রে প্রচণ্ড লজ্জার, এবং বিরক্তি উদ্রেককারী।
আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে স্বাধীনতার চর্চার কি অবস্থা আসলে? প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ) ২০২৬ সালে জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এই অবনতির মিছিলে বাংলাদেশও পিছিয়েছে। ২০২৬ সালের সূচকে গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৫২তম। গত বছর (২০২৫) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৯তম। অর্থাৎ এক বছরে সূচকে আরও তিন ধাপ অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের। আরএসএফ–এর মতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে প্রতিটি সরকার গণমাধ্যমকে নিজেদের প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ওপরের অনুচ্ছেদের এই শেষ লাইন ধরে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যাক। আরএসএফ যে মন্তব্যটি করেছে, সেটি শতভাগ সত্য। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা এমন কোনো সরকার পাইনি, যারা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। বরং সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, নিবর্তনমূলক আইন পুরোপুরি উধাও হয়নি। মোড়ক বদলে ফিরে ফিরে এসেছে। আর যেকোনো সরকারের জন্য নেতিবাচক যেকোনো সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেই সংবাদমাধ্যমগুলো দ্বিধায় থেকেছে। এই দ্বিধা এমনি এমনি তৈরি হয় না। তৈরি হয় ভয় থেকে। সেই ভয় তখনই তৈরি হয়, যখন তেমন ভয় সৃষ্টির সহায়ক পরিবেশ থাকে। মনে রাখা দরকার, সরকার না চাইলে কখনো তেমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় না।
কথা হলো, যে কোনো দেশেরই শাসন কাঠামো অবশ্যই স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যমকে ভয় পায়। একই সঙ্গে পুঁজিবাদী কাঠামোও ভয় পায়। এই ভয়ের কারণটি মূলত নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি প্রকাশিত হওয়ার আশঙ্কায় নিহিত। সংবাদমাধ্যমকে দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বেশির ভাগ দেশেই এই কাজটি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে, কেউ বা কোনো পক্ষ (সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষসহ) স্বৈরাচারী না হয়ে উঠতে পারে। এবং এসব কারণেই হয়তো আমাদের দেশে বরাবরই সংবাদমাধ্যমের স্বাতন্ত্র্য না রাখার চেষ্টা করে গেছে ক্ষমতাধরেরা।

তাহলে কি এ দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকোচনের দায় কেবলই সরকারের, ক্ষমতাধরদের? একেবারেই না। এক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের, সাংবাদিকদেরও দায় আছে। তাতে আরও বেশি করে তেল, ঘি ঢেলেছে সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষের সিংহভাগও। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের ক্ষেত্রে তারাও একদল ‘কিডন্যাপার’ বটে। এই দেশের বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ ভয়ে থাকতেও আগ্রহী! অর্থাৎ, এখানে একটা সম্মতির ব্যাপারও আছে।
আমাদের দেশে বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান শুরুর উদ্যোগটি যেহেতু হয় রাজনৈতিক, নাহয় অর্থনৈতিক প্রভাববলয় থেকেই উদ্ভূত হয়, ফলে হয় ব্যবসায়িক, না হয় রাজনৈতিক আদর্শজাত স্বার্থ প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকে। এতে যেটা হয়, সেটি হলো—ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ বা অর্থনৈতিক পক্ষজনিত সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান কখনোই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায় না। কারণ তখন পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিজম বা অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে গুলিয়ে যায় জার্নালিজম। সাংবাদিকতা তখন লক্ষ্য থাকে না। লক্ষ্য থাকে তুষ্ট করার। ফলে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা পথ হারায়, সেই সাথে স্বাধীনতাও।
এটা তো সরকারের পক্ষের সংবাদমাধ্যমের কথা বলা হলো। একইভাবে সরকারে থাকা রাজনৈতিক শক্তির বিরোধী রাজনৈতিক আদর্শ বা অর্থনৈতিক পক্ষজনিত সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানও এই দেশে আছে। তারা করে ঠিক উল্টো কাজ। গঠনমূলক সমালোচনার বদলে চলে নির্বিচারে সমালোচনা, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিন্দা–মন্দের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ফলে একইভাবে ওইসব সংবাদমাধ্যমগুলোরও নিরপেক্ষতা পথ হারায়, স্বাধীনতাও আর থাকে না।
আবার ক্ষমতাপ্রেমি সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকের সংখ্যাও আমাদের দেশে প্রচুর। এদের কাজ হলো, ক্ষমতা যে পক্ষে, তারাও সেই পক্ষে। এসব সংবাদমাধ্যম কখনো সত্যিকারের সংবাদ বা সংবাদবিষয়ক কনটেন্ট তৈরির ধার ধারে না। বৃষ্টি যেদিকে পড়ে, সেদিকেই তারা ছাতা ধরে। গত ১৬/১৮ বছর পর এসে আমরা হুট করেই এমন সংবাদমাধ্যমের প্রবল বিস্তার লক্ষ্য করছি। দেখছি যে মেইনস্ট্রিমে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাওয়া মিডিয়া হাউজগুলোও চরিত্র বদলে সুসাংবাদিকতার বদলে ‘গিরগিটি’ চরিত্র ধারণ করছে। এতে করে মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা বলতে কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না।
তাই বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের অবস্থা অসাধারণ কিছু না। সেটি যেমন সাংবাদিকতার নীতি–নৈতিকতার দিক থেকে, যেমন সরকার প্রদত্ত অধিকারের ও সম্মানের দিক থেকে, তেমনি সংবাদমাধ্যমের আর্থিক অবস্থার দিক থেকেও। অর্থাৎ, মানসম্মত সাংবাদিকতার যেমন অভাব আছে, তেমনি মানসম্মত সাংবাদিকতা উপহার দেওয়ার জন্য যেসব আবশ্যকীয় উপাদানের প্রয়োজন হয়, সেসবেরও অভাব আছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও এ দেশের সাংবাদিকতার ভিতই মজবুত হয়নি। নৈতিকভাবে সৎ থেকে সাংবাদিকতা করার উদাহরণও ঢের কম। যারা নিজেদের ‘সৎ’, ‘সাহসী’ বলে উচ্চকিত থাকেন, তারাই বা আসলে কতটুকু সৎ? কতটুকু সাহসী? এখন একটি সংবাদমাধ্যমের এডিটোরিয়াল জাজমেন্ট তো খুবই নিবিড়ভাবে এডিটর বা সম্পাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট। সম্পাদক পদটাই এমন যে সেখানে কোনো ব্যক্তিগত অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত না। কারণ মাথাতে সমস্যা হলো তা অচিরেই পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে কতজন সম্পাদক আসলে ব্যক্তিগত অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হন না? বা সেই কারণে তাদের এডিটোরিয়াল জাজমেন্ট প্রভাবিত হয় না? এর সঙ্গে আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক লাভালাভের বিষয়টিও যদি যুক্ত করা হয়, তাহলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় করার মতো অবস্থার সৃষ্টি হবে।
সুতরাং আমাদের দেশে সংবাদমাধ্যমের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত কেবলই সমস্যা, আর সমস্যা। সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই আদর্শ কোনো পরিস্থিতি দেখা যায় না খুব একটা। এখন দেশ যেমন, দেশের মানুষ যেমন, শাসন যেমন, সাংবাদিকতা তো কম–বেশি তেমনই হবে, তাই না? গোবরে পদ্মফুল–কথাটি প্রবাদ হিসেবে ঠিক আছে, কিন্তু বাস্তবে গোবরের মধ্যে পদ্মফুল পাওয়া যায় আসলে কয়টা?
গোবরের মধ্যে যেমন গণহারে পদ্মফুল পাওয়া যায় না, ঠিক তেমনি এই দেশে ‘নিখাদ’ বা ‘শুধুই সাংবাদিকতা’ করতে আসা সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের সংখ্যাও অতি নগণ্য। গুটিকয়েক যা আছে, তাদেরও চলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ দূষিত পরিবেশে সুসাংবাদিকতার সুবাতাস আর কারও গায়ে লাগছে না। উল্টো জনমানুষের কাছে সাংবাদিকদের ইমেজ এমন জায়গাতেই পৌঁছেছে যে, ‘সাংঘাতিক’ বা ‘সঙবাদিক’ নামগুলো অতিপরিচিত এবং স্বাভাবিক আকার ধারণ করেছে।
এই দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে তাই ‘তলে তলে টেম্পু চালানো’ বন্ধ করতে হবে। এভাবে টেম্পু চালানোর কাজটি যেমন সংবাদমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে স্বার্থসিদ্ধি করার হিসাবে পরিচালিত হয়, যেমন ‘মুক্ত সাংবাদিকতা’ শীর্ষক ক্ষমতাপন্থী কুমিরের কান্নার মাধ্যমে হয়, ঠিক তেমনিভাবে তথাকথিত ‘স্বাধীনতা, স্বাধীনতা’ বলে গলা ফাটানোর মাধ্যমেও হয়। এমন দ্বিচারী কর্মকাণ্ডকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করাটা জরুরি। তাহলেই তলে তলে টেম্পু চালানো বন্ধ হবে। তখন অন্তত সত্যিকারের উন্নতির পথে হাঁটার চেষ্টাটা শুরু করা যাবে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আদতেই কাজ করা যাবে।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা
নিউইয়র্কে ড. ইউনূসকে হেনস্তা গ্রহণযোগ্য নয়: তথ্য উপদেষ্টা
‘রাষ্ট্রের দিকে তাকান–রাষ্ট্রটা যেন শুয়ে পড়ছে’
বিশ্বব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেওয়ার আলোচনা চলছে : অর্থমন্ত্রী
শ্রমবাজার নিয়ে আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার আলোচনা
প্রবাসীদের জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে: আইনমন্ত্রী

ব্যারিকেড গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে পারে না
গত কয়েক মাসে যন্তর মন্তর এলাকায় বেশ জোরদার আন্দোলন-বিক্ষোভ দেখা গেছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের জেরে নতুন করে বিক্ষোভের ঢেউ উঠেছে।

পাকিস্তান: স্থিতিশীলতা কেন আজও অধরা
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা অধরা। পারস্পরিক দোষারোপের মধ্য দিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পিটিআই ও সরকারের মধ্যকার সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে।

গাইড বইয়ের বিপরীতে একটা নির্মোহ প্রস্তাবনা
বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের অনেক মাধ্যম চোখে পড়ে। এখন শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে পাঠ্যপুস্তক, গাইড বই, রেফারেন্স বই ও শিক্ষকের পাশাপাশি রয়েছে ইন্টারনেট, জার্নাল, মাল্টিমিডিয়া, ইউটিউবসহ নানা পরিসর। তবে এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজলভ্য মাধ্যম হয়ে আছে গাইড বই

দিল্লির জেনজি আন্দোলনে টালমাটাল মোদির গদি!
তরুণদের ক্ষেপিয়ে কোনো দেশের শাসকেরা যে টিকতে পারেন না, সেটা নিকট অতীতে বাংলাদেশ ও নেপাল প্রমাণ করেছে।