গত বছরের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পররাষ্ট্রনীতিতে খুব বেশি সাফল্য পাননি তিনি। তার দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যর্থ যুদ্ধ থেকে ব্যর্থ শান্তি প্রক্রিয়ার মতো একের পর এক ব্যয়বহুল ভুলের ঘটনা ঘটেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তবে লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের গল্পটা কিছুটা ভিন্ন।
লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশই এখন ডানপন্থী এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে অবস্থান নেওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করছে। এবার এই পথে হাঁটছে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দেশ ও অর্থনীতি ব্রাজিল।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে আবার নিজেদের প্রভাব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। নথিটিতে বেশ খোলাখুলিভাবেই বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রভাবের আওতায় থাকা দেশগুলোর রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে। একই সঙ্গে যেসব সরকার ও রাজনৈতিক আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও কৌশলের সঙ্গে মোটামুটি একমত, তাদের পুরস্কৃত করার কথাও বলা হয়েছিল।
এই নীতির অংশ হিসেবে ট্রাম্প আর্জেন্টিনাকে ৪০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেন। এরপর প্রেসিডেন্ট হ্যাভিয়ার মিলেইয়ের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে এই অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন। কলম্বিয়ায় বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে বারবার চাপ ও হুমকি দেন ট্রাম্প। তার ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেন এবং তাকে ‘অবৈধ মাদক ব্যবসার নেতা’ বলে অভিযোগ করেন। সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে তিনি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টকে ধরে নিয়ে যান। নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পরদিন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ‘এই গোলার্ধ আমাদের’ লেখা একটি স্লোগানসহ ট্রাম্পের একটি ছবি প্রকাশ করে।
দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য বলছে, গত ১৮ মাসে লাতিন আমেরিকায় সাতজন ডানপন্থী বা কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিজয়ী প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন। গত মাসে ট্রাম্প বলেন, “দক্ষিণ আমেরিকায় আমরা খুব ভালো করছি। আমি যাদের নির্বাচিত হতে সহায়তা করেছি, তাদের সংখ্যা অনেক।”
তাই ব্রাজিলেও তিনি এমন কিছুই দেখতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ব্রাজিলে প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে। এতে তিনবারের নির্বাচিত বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভাকে পেছনে ফেলে ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো প্রথম দফায় জয়ী হয়েছেন। তবে সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট তিনি পাননি। তাই আগামী ২৫শে অক্টোবর এই দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
ফ্লাভিও বলসোনারো সাবেক ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। গত নির্বাচনে পরাজয়ের পর ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার জন্য জাইর বলসোনারো বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য অবজার্ভারের আন্তর্জাতিক সংবাদের সাবেক সম্পাদক স্টিভ ব্লুমফিল্ড দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “বলসোনারো জিতলে ট্রাম্পেরও জয় হবে। আর তখন পশ্চিম গোলার্ধে সত্যিই তার প্রভাব আরও শক্তিশালী হবে।”
ব্রাজিলের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের এই নির্বাচন ট্রাম্পের ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আবারও বাড়ানোর চেষ্টার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বলসোনারো জয়ী হলে আর্জেন্টিনা, চিলি ও কলম্বিয়ায় গড়ে ওঠা ট্রাম্পপন্থী জোট আরও শক্তিশালী হবে। আর লুলা জয়ী হলে এই পরিবর্তনের বিপরীতে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে ব্রাজিলের অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে।
গত বছর ট্রাম্প ব্রাজিলের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেন এবং দেশটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। এর উদ্দেশ্য ছিল জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলা মামলা বন্ধ করতে ব্রাজিলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ছবি: রয়টার্স
তবে দ্য অবজার্ভারের স্টিভ ব্লুমফিল্ডও একই অভিযোগ করেছেন। তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, হোয়াইট হাউস শুধু দূর থেকে ব্রাজিলের নির্বাচন দেখছে না। তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং ট্রাম্পের ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট’ পন্থী ঘনিষ্ঠরা লুলাকে দুর্বল করা এবং বলসোনারো পরিবারকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করে আসছেন। শুরুতে তাদের লক্ষ্য ছিল জইর বলসোনারোকে কারাগারে যাওয়া থেকে রক্ষা করা। ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর ট্রাম্পের মতো তিনিও ফল মেনে নেননি। ট্রাম্পের সমর্থকদের মতো বলসোনারোর সমর্থকেরাও সরকারি ভবনে হামলা চালিয়েছিল।
তবে ব্রাজিলের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল। প্রথমত, ক্ষমতায় থাকার জন্য বলসোনারোর চেষ্টা ছিল অনেক বেশি গুরুতর। দ্বিতীয়ত, তাকে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে ব্রাজিলের মানুষের মধ্যে শক্ত অবস্থান ছিল।
স্টিভ ব্লুমফিল্ড জানান, তদন্তকারীরা বলসোনারো ও তার ঘনিষ্ঠ সাত সহযোগীর নেতৃত্বে ক্ষমতায় টিকে থাকার একটি বড় ষড়যন্ত্রের তথ্য খুঁজে পান। এই ষড়যন্ত্রের মধ্যে লুলা, তার নির্বাচনী সঙ্গী এবং সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারককে হত্যার পরিকল্পনাও ছিল। নির্বাচনের ফল বাতিল করার জন্য একটি খসড়া আদেশও তৈরি করা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করে বলসোনারোকে আবার ক্ষমতায় বসাবে। তবে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। বলসোনারো ও তার কয়েকজন সহযোগী, যার মধ্যে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও নৌবাহিনীর প্রধানও ছিলেন, গ্রেপ্তার হন এবং তাদের বিচার শুরু হয়।
এর জবাবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্প ব্রাজিলের সব পণ্য আমদানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। তিনি বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলা মামলাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে দাবি করেন।
তবে অন্য একটি দেশের বিচারপ্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য হস্তক্ষেপের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দেয়। লুলা স্পষ্ট করে দেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নতি স্বীকার করবেন না। বলসোনারোর বিচারও চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বলসোনারো দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ট্রাম্পের চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর জনমত জরিপেও লুলার সমর্থন বেড়ে যায়।
স্টিভ ব্লুমফিল্ড বলেন, এ বছরের জুলাইয়ে নির্বাচনী প্রচার জোরালো হওয়ার সময় ট্রাম্প আবারও শুল্কের পথ বেছে নেন। তিনি ব্রাজিলের কিছু পণ্যের ওপর নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করেন। এরপর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ‘নির্বাচনের স্বচ্ছতা’ নিয়ে তদন্ত করতে দুই কর্মকর্তাকে ব্রাজিলে পাঠানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ব্রাজিল তাদের ভিসা দেয়নি। দেশটির অভিযোগ, ওই কর্মকর্তারা ব্রাজিলের নির্বাচনে ‘হস্তক্ষেপ’ করতে আসছেন।
জুলাইয়ে ওয়াশিংটন পোস্টও জানায়, ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর দেশটিতে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
স্টিভ ব্লুমফিল্ড বলেন, নির্বাচনের শেষ দিকে লুলাও এই অভিযোগকে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করছেন। সম্প্রতি একটি বিজ্ঞাপনে ফ্লাভিও বলসোনারোকে ‘ট্রাম্পের প্রার্থী’ বলা হয়। বিজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্রাজিলকে ‘উপনিবেশ বানাতে, দেশের সম্পদ নিয়ে যেতে, আমাদের ভবিষ্যৎ চুরি করতে এবং আমাদের নিঃস্ব করে দিতে’ চান।
তবে ব্রাজিলে হোয়াইট হাউসের এই কৌশল কতটা সফল হচ্ছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আমেরিকাস কোয়ার্টারলির প্রধান সম্পাদক ব্রায়ান উইন্টার বলেন, “ব্রাজিলে কেউ কেউ মজা করে বলেন, লুলার হয়ে সবচেয়ে বেশি প্রচার করছেন ট্রাম্প।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স
লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থীদের উত্থানের কারণ কী?
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ডানপন্থী রাজনীতরি দিকে ঝুঁকে পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্র নয়। এর মূল কারণ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সংগঠিত অপরাধী চক্র, যাদের অনেকেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।
গত বছর ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরো মহাদেশে কয়েক দশক ধরেই মাদকভিত্তিক সংগঠিত অপরাধ একটি সমস্যা। তবে এখন এর বিস্তার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি এবং দেশ ও সমাজের ভেতরে এর প্রভাবও গভীর হয়েছে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় বামপন্থী সরকারগুলোর ব্যর্থতা ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের চেয়েও বেশি ক্ষতির কারণ হয়েছে।
স্টিভ ব্লুমফিল্ড বলেন, লাতিন আমেরিকায় কোনো বিদেশি প্রেসিডেন্টের নীতির যদি সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে থাকে, তিনি হলেন এল সালভাদরের নাইব বুকেলে। তার কঠোর দমননীতির আওতায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এটিই এখন অন্যান্য ডানপন্থী নেতার কাছে একটি মডেল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যেসব দেশে সশস্ত্র অপরাধী চক্র ও মাদক কারবারিদের সহিংসতা বড় সমস্যা, সেসব দেশের নেতারা বুকেলের এই নীতি অনুসরণ করতে চাইছেন।