একদিন রিকশায় করে বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি নামলাম। আমার বাস ধরতে হবে। কিন্তু রিকশাচালক আমাকে এমন এক জায়গায় নামিয়ে দিলেন, যেখান থেকে ঠিক কোন দিকে গেলে বাসস্ট্যান্ড পাব, বুঝতে পারছিলাম না।
হাতে আমার সাদা ছড়ি। ছড়ি দিয়ে এদিক সেদিক পথ খুঁজছি। কোথাও ফুটপাত, কোথাও গর্ত, কোথাও রাস্তার কিনারা কিছুই যেন স্পষ্ট হচ্ছে না। পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি যাচ্ছে। হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল সব মিলিয়ে মুহূর্তেই নিজেকে খুব অনিরাপদ মনে হলো।
ভাবছি, এখন কী করব?
ঠিক তখন একজন নারী আমার কাছে এলেন। বয়স তার সম্ভবত বেশ হয়েছে। খুব স্বাভাবিকভাবে আমার হাত ধরে বললেন, ‘স্যার, আপনি কই যাবেন? আসেন।’
বললাম, ‘বাসস্ট্যান্ডে যাব।’
তিনি আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। খুব যত্ন করে আমাকে হাঁটিয়ে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। তারপর চলে গেলেন।
কৌতূহল থেকে বাসস্ট্যান্ডের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, যে মহিলা আমাকে এখানে দিয়ে গেলেন, উনি কে?’
উত্তরটি শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
‘উনি তো এখানে ভিক্ষা করেন।’
সেদিন অনেকক্ষণ ভাবলাম, এটাই আমার বাংলাদেশ।
যে নারী হয়তো নিজের জীবন নিয়েই প্রতিদিন সংগ্রাম করেন, তিনি আমার সাদা ছড়িটি দেখেই বুঝেছিলেন, এই মুহূর্তে একজন মানুষের তার সহায়তা প্রয়োজন। তাকে কে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল? কে তাকে বলেছিল যে সাদা ছড়ি হাতে থাকা একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির পাশে দাঁড়াতে হয়?
সম্ভবত কেউ না। তাকে শিখিয়েছে তার মানবিকতা।
প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর পালিত হয় সাদা ছড়ি নিরাপত্তা দিবস বা White Cane Safety Day। সাদা ছড়ি শুধু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির পথ খোঁজার একটি উপকরণ নয়; এটি স্বাধীনভাবে চলাচলের প্রতীক, একই সঙ্গে অন্য মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। বিশ্বজুড়ে এই দিনটি সাদা ছড়ি ব্যবহারকারী মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ চলাচলের অধিকারকে সামনে আনে।
কিন্তু দিবসটি সামনে এলে আমি এখন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও করি, আমাদের দেশে সাদা ছড়ির ভাষাটা আমরা কি ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি?
একসময় সাদা ছড়ি হাতে রাস্তায় দাঁড়ালে প্রায়ই কেউ না কেউ এগিয়ে আসতেন। ‘ভাই, রাস্তা পার হবেন?’ ‘কোথায় যাবেন?’ এমন প্রশ্ন ছিল পরিচিত। একজন না হলে আরেকজন হাত বাড়াতেন।
এখন অভিজ্ঞতাটা অনেক ক্ষেত্রে উল্টো। আমাকে বলতে হয়, ‘ভাই, একটু রাস্তা পার করে দেবেন?’ কখনো একাধিকবার বলতে হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যাদের দায়িত্বের মধ্যেই পথচারীদের নিরাপত্তা রয়েছে, তাদের মধ্যেও সাদা ছড়ি সম্পর্কে সচেতনতা সব সময় চোখে পড়ে না। ট্রাফিক পুলিশের সদস্য কিংবা গাড়িচালকদের একটি অংশ হয়তো জানেনই না সাদা ছড়ি শুধু একজন মানুষের হাতে থাকা একটি লাঠি নয়। এটি বলে দিচ্ছে, এই পথচারী দৃশ্যনির্ভর সংকেত দেখতে পারছেন না এবং নিরাপদভাবে রাস্তা পার হওয়ার জন্য তার একটু বেশি সময় বা সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।
এটি দয়া বা করুণার প্রশ্ন নয়। এটি নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিকভাবে সাদা ছড়িকে স্বাধীন চলাচলের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বিভিন্ন দেশে গাড়িচালকদের সাদা ছড়ি ব্যবহারকারী পথচারীর প্রতি বিশেষ সতর্কতা দেখানোর নির্দেশনা আছে। কোথাও আইন, কোথাও ট্রাফিক বিধি, কোথাও জনসচেতনতা সবকিছুর মূল কথা একটাই: সাদা ছড়ি দেখলে বুঝতে হবে, এই পথচারীকে নিরাপদে চলাচলের সুযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশেও অধিকারের ভিত্তি আছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ তে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রবেশগম্যতা, পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণ এবং নিরাপদ পরিবেশের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। অর্থাৎ রাস্তায় স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে চলাচল কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি অধিকার।
জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদ UNCRPD এর ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সড়ক, পরিবহন, ভবন, তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থাসহ জনসাধারণের ব্যবহারের পরিবেশে সমান প্রবেশগম্যতার কথা বলা হয়েছে। ২০ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত চলাচল ও প্রয়োজনীয় সহায়ক প্রযুক্তি, সহায়তা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
তবে এখানেই আরেকটি পরিবর্তনের গল্পও আছে।
প্রযুক্তি এখন সাদা ছড়িকেও বদলে দিচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘স্মার্ট ক্যান’ ব্যবহার শুরু হয়েছে। কোনো কোনো স্মার্ট ক্যান সেন্সরের সাহায্যে সামনে বা মাথার উচ্চতায় থাকা বাধা শনাক্ত করে ব্যবহারকারীকে শব্দ বা কম্পনের মাধ্যমে সতর্ক করতে পারে। কিছু ডিভাইস স্মার্টফোনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নেভিগেশন ও আশপাশের স্থান সম্পর্কে তথ্যও দিতে পারে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাদের জন্য, যাদের একই সঙ্গে দৃষ্টি ও শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা রয়েছে। শব্দ শুনতে না পারলেও কম্পনের ধরন ও তীব্রতার মাধ্যমে সামনে থাকা বাধার দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
আমিও এখন প্রযুক্তির সাহায্য নিই। ফোনের অ্যাপ আমাকে আশপাশের অনেক কিছু বলে দিতে পারে। কোথায় কী আছে, কোন দিকে যেতে হবে প্রযুক্তি আমার স্বাধীনতাকে আগের তুলনায় অনেক বাড়িয়েছে।
কিন্তু এখানেই আমাদের একটি ভুল করা চলবে না।
স্মার্ট ক্যান যতই ‘স্মার্ট’ হোক, একটি শহর যদি প্রবেশগম্য না হয়, ফুটপাত যদি দখল হয়ে থাকে, রাস্তা পার হওয়ার নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকে, গাড়িচালক যদি সাদা ছড়ির অর্থ না বোঝেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যদি প্রয়োজনের মুহূর্তে এগিয়ে না আসেন তাহলে প্রযুক্তি একা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
প্রযুক্তি আমাকে সামনে বাধা আছে বলে সতর্ক করতে পারে। কিন্তু একটি বেপরোয়া গাড়িকে থামানোর সামাজিক দায়িত্ব প্রযুক্তির নয়।
সেই দায়িত্ব আমাদের।
তাই ১৫ অক্টোবরকে শুধু র্যালি, আলোচনা সভা আর সাদা ছড়ি বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কয়েকটি খুব সাধারণ কাজ শুরু করা যায়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষায় সাদা ছড়ি সম্পর্কে বাধ্যতামূলক ধারণা থাকতে পারে। ট্রাফিক পুলিশের প্রশিক্ষণে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পথচারীকে নিরাপদে সহায়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। স্কুলের শিশুদের শেখানো যেতে পারে সাদা ছড়ি দেখলে কী করতে হবে। গণমাধ্যমও প্রতিবছর অন্তত এই একটি দিনে মানুষকে মনে করিয়ে দিতে পারে যে সাদা ছড়ি কী বার্তা দেয়।
আর সাহায্য করতে চাইলে একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। হঠাৎ কাউকে টেনে ধরে নিয়ে যাওয়া নয়। প্রথমে বলুন, ‘আপনার কি সহযোগিতা প্রয়োজন?’ তিনি চাইলে তাকে আপনার কনুই ধরতে দিন এবং কোথায় যাচ্ছেন তা বলুন। সহায়তার মধ্যেও মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা বজায় রাখা জরুরি।
সেদিনের সেই বৃদ্ধ নারী হয়তো UNCRPD জানতেন না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনের ধারাও হয়তো তাঁর জানা ছিল না। ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’ শব্দটিও সম্ভবত তিনি কখনো ব্যবহার করেননি।
কিন্তু তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জানতেন পাশে থাকা একজন মানুষের নিরাপদে পৌঁছাতে সহযোগিতা করা যায়।
আজ আমাদের হাতে আইন আছে, প্রযুক্তি আছে, স্মার্টফোন আছে, স্মার্ট ক্যান আছে।
প্রশ্ন হলো, সেই নারীর মতো মানবিক বোধটুকু কি আমাদের আছে?
সাদা ছড়িটি আমাকে পথ চিনতে সাহায্য করে। কিন্তু আমার শহর, আমার সমাজ এবং আমার দেশের মানুষ যদি সাদা ছড়িটির ভাষা বুঝতে না পারে, তাহলে আমার পথ কখনোই পুরোপুরি নিরাপদ হবে না।
লেখক: ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি বিশেষজ্ঞ