ব্রাজিলের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার ভূমিকা দেশটির রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে প্রশ্নটি এখন আর শুধু রাজনৈতিক প্রচার কিংবা কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়।
ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারিক সিরিল আমার গতকাল শুক্রবার আরটি-তে লেখা এক নিবন্ধে এই সংকটের ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। তার বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, ব্রাজিলের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস এবং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রতিযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।
আমারের নিবন্ধ অনুযায়ী, মেটার তত্ত্বাবধান বোর্ডকে এমন অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটির প্ল্যাটফর্মগুলো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে সুবিধা তৈরি করেছে এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার প্রচারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। লেখক দাবি করেছেন, লুলার সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর রিচ সীমিত করার বিষয়ে মেটার কর্মীদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
মেটা অবশ্য এ ধরনের অভিযোগকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রযুক্তিগত সমস্যা বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কথা বলা হলেও আমারের মতে, বিষয়টিকে নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আড়ালে থেকে যায়। তবে অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা এবং স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। নির্বাচনে মেটার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এর ফলে ভোটের ফলাফল কতটা প্রভাবিত হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
এখানে বড় প্রশ্ন হলো, বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা যখন কয়েকটি বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন একটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর তাদের প্রভাব কতটা হওয়া উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কোন পোস্ট বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, কোন অ্যাকাউন্টের দৃশ্যমানতা কমবে এবং কোন রাজনৈতিক বক্তব্য আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে, তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে প্রচলিত নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন না করেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশে অসমতা তৈরি হতে পারে। এই কারণেই ব্রাজিলের ঘটনাটি শুধু দুই প্রার্থীর বিরোধ নয়। এটি ডিজিটাল যুগে নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে।
আমার তার নিবন্ধে ব্রাজিলের অতীতের দিকে ফিরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্তের সরকার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়। গুলার্তের ভূমি সংস্কার, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চীন, কিউবা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। আমারের ব্যাখ্যায়, ব্রাজিলের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। সামরিক শাসন ১৯৬৪ সালে শুরু হয়ে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই ইতিহাস বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখার সুযোগ নেই। তবে এটি বোঝায় যে ব্রাজিলের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে বিরোধের শিকড় অনেক গভীরে।
লেখক ২০১০-এর দশকের দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত, নজরদারি ও রাজনৈতিক প্রচারণার ঘটনাগুলোকেও এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, এসব কর্মকাণ্ড ব্রাজিলের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করতে ভূমিকা রেখেছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি হয়েছিলেন। পরে ২০২১ সালে তার বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল হয়। তবে এসব ঘটনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বিচারিক পদক্ষেপের উদ্দেশ্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা আমার দিয়েছেন, বর্তমান নির্বাচনে লুলা ও ফ্লাভিও বলসোনারোর রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য এই সংকটকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
লুলা বামপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধি এবং ব্রিকসের প্রতিষ্ঠাতা প্রজন্মের একজন নেতা। তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কার, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের একক প্রাধান্য কমানো এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে আসছেন। বিপরীতে, ফ্লাভিও বলসোনারো তার বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি। তিনি ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে অবস্থান করেন। আমারের মতে, দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাই শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি ব্রাজিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোন পথে এগোবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ব্রাজিলের এই অবস্থানের গুরুত্ব বোঝার জন্য চীনের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমারের নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে চীন ব্রাজিলের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ রেকর্ড ১৭১ বিলিয়ন (১৭ হাজার ১০০ কোটি) ডলারে পৌঁছেছিল। ব্রাজিলের কৃষিপণ্য, খনিজ সম্পদ ও শিল্পজাত পণ্যের জন্য চীন গুরুত্বপূর্ণ বাজার। একই সঙ্গে ব্রাজিলের অর্থনীতি ও অবকাঠামোয় চীনা বিনিয়োগের গুরুত্ব বাড়ছে। ফলে ব্রাজিল যদি বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাবের হিসাবেও ঝামেলা তৈরি করতে পারে।
লেখকের দৃষ্টিতে, লুলার বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটনের প্রচলিত আঞ্চলিক আধিপত্যের ধারণার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আঞ্চলিক নীতিকে ‘ডনরো ডকট্রিন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ঐতিহাসিক মনরো নীতির আরও কঠোর সংস্করণ বলে তার অভিমত। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পশ্চিম গোলার্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রভাববলয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। লুলার বিপরীতে ফ্লাভিও বলসোনারোর রাজনৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং পশ্চিমা বলয়ের সঙ্গে অধিক সংযুক্তির পক্ষে।
তবে ব্রাজিলের ভোটারদের সিদ্ধান্তকে কেবল ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল হিসেবে দেখা যাবে না। দেশের অর্থনীতি, সামাজিক বৈষম্য, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থাও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
গাজা যুদ্ধ নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। লুলা ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও গাজায় ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে মিলে ব্রাজিলও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় যুক্ত হয়েছে। আমারের মতে, বলসোনারো পরিবার ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি এই সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ব্রাজিলের নেতৃত্বে পরিবর্তন হলে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে দেশটির কূটনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, তারিক সিরিল আমারের বিশ্লেষণ ব্রাজিলের নির্বাচনকে জাতীয় রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। মেটার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, রাজনৈতিক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের স্বচ্ছতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি কোম্পানির জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা বর্তমান অভিযোগগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
যদিও অতীতের ঘটনা বর্তমানের প্রতিটি অভিযোগকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ করে না। ব্রাজিলের ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। সেই সিদ্ধান্ত কতটা অবাধ, স্বচ্ছ ও বহিরাগত প্রভাবমুক্ত থাকে, তার ওপর শুধু ব্রাজিলের গণতন্ত্র নয়, বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় দেশটির অবস্থানের ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করবে।