যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হলে বিশ্ব অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে জ্বালানি সরবরাহের বিপর্যয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং একই সময়ে লোহিত সাগরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের অবরোধ কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে এ কারণে যে, যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যে বিপুল পরিমাণ জরুরি তেলের মজুত ব্যবহার করেছে, তা এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হলে আগের মতো সহজে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে এবং সরবরাহের বিকল্প পথগুলোও বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্বের হাতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো সময় থাকতে পারে মাত্র এক থেকে দুই মাস।
এই সংকটের তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমেই হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব উপলব্ধি করা প্রয়োজন। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রধান পথ এই প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ প্রতিদিন আনুমানিক দুই কোটি ব্যারেল তেল, এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং এশিয়া, ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকেও সরাসরি বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টা অচলাবস্থায় পড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ও তার আশপাশে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও দ্রুত বাড়ছে। গত বুধবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি দুই ডলারের বেশি বেড়ে ১১০ দশমিক ৮৫ ডলারে পৌঁছায়, যা পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি। এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগেরও প্রতিফলন। ব্যবসায়ীরা যখন আশঙ্কা করেন যে আগামী দিনে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাবে না, তখন সরবরাহের প্রকৃত ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই দাম বেড়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে মাইনে আঘাত পেয়ে দুটি তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায়। পরদিন সংস্থাটি আরও সাতটি জাহাজে আঘাত হানার দাবি করে। ওয়াশিংটন অবশ্য এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইআরজিসির বক্তব্য অনুযায়ী, আক্রান্ত জাহাজগুলোর মধ্যে কয়েকটি তেল পরিবহনের কাজে নিয়োজিত ছিল। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক স্থাপনা বা যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। জাহাজ চলাচল বন্ধ না হলেও হামলার আশঙ্কা, বিমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবহন অনিশ্চয়তা তেল সরবরাহকে ব্যাহত করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, জরুরি তেলের মজুত আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ ১৯৭৪ সালে আরব তেল অবরোধের পর প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। সংস্থাটির সদস্যদেশগুলোকে কমপক্ষে ৯০ দিনের নিট তেল আমদানির সমপরিমাণ মজুত রাখতে হয়। তবে চীন ও ভারত আইইএর সদস্য নয়। ফলে তাদের মজুতব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাজারে জরুরি তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত এই সমন্বিত ব্যবস্থার বাইরে স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হয়।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেলের সরবরাহে বিঘ্ন মোকাবিলায় আইইএর সদস্যরা নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছিল। ১১ মার্চ সংস্থাটির ৩২টি সদস্যদেশ জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সম্মত হয়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর যে পরিমাণ তেল ছাড়া হয়েছিল, নতুন এই উদ্যোগ তার দ্বিগুনেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে ১৭ কোটি ২২ লাখ ব্যারেল এবং জাপান সাত কোটি ৯৮ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু জরুরি মজুত থেকে তেল বাজারে সরবরাহ করার তাৎক্ষণিক সুবিধা থাকলেও এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্য রয়েছে। মজুত একবার ব্যবহার করা হলে তা পুনরায় পূরণ করতে সময় লাগে। ফলে একই ধরনের সংকট আবার দেখা দিলে আগের মতো বড় পরিমাণ তেল ছাড়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশটির কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বা এসপিআর কমে ২৮ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা ১৯৮২ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন। অর্থাৎ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির কাছেও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সংরক্ষিত তেলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মজুত থেকে ছাড়া তেলের সবটাই বিক্রি করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এর বড় অংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে এবং পরে অতিরিক্ত তেলসহ তা ফেরত পাওয়ার কথা। ফলে কাগজে-কলমে যে পরিমাণ তেল জরুরি সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ হিসাবও রয়েছে। একদিকে বাজারে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে কৌশলগত মজুত পুনর্গঠন- এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক অ্যারন কিলডো আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ থেকে চীন ও ইরানকে বাদ দিয়ে বিশ্বের কৌশলগত তেলের মজুত প্রায় ৩২ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল কমেছে। এই ঘাটতির প্রায় ৯৫ শতাংশের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের মজুত হ্রাস। তার হিসাব অনুযায়ী, চীনের মজুত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের এমন মজুত বাদ দিলে, যা হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে, বিশ্বে কার্যকরভাবে ব্যবহারযোগ্য জরুরি তেলের পরিমাণ এখন প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল।
এই সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে বড় মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিনের বৈশ্বিক তেলের চাহিদা এবং সম্ভাব্য সরবরাহ ঘাটতির সঙ্গে তুলনা করলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। কেপলারের জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক মিউই শুর হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হুতিদের কারণে সৌদি আরবের বিকল্প রপ্তানি পথ বাধাগ্রস্ত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন তেল সরবরাহ প্রায় ৯৩ লাখ ব্যারেল কমে যেতে পারে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হচ্ছে, তা এক কোটি ৬৮ লাখ ব্যারেল। সংকটের পরিস্থিতিতে তা কমে প্রায় ৭৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসতে পারে।
অর্থাৎ সম্ভাব্য ঘাটতি প্রতিদিন প্রায় ৯৩ লাখ ব্যারেল। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে শুধু জরুরি মজুতের পরিমাণ থাকলেই হবে না; প্রয়োজনীয় সময়ে সেই তেল বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে। কিলডোর মতে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মজুত থেকে দ্রুত তেল সরবরাহ করা সম্ভব হলেও যুক্তরাষ্ট্রের মজুত থেকে তেল উত্তোলন ও বাজারে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া প্রায় তিন মাস পর্যন্ত সময় নিতে পারে। ইউরোপের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে জরুরি মজুতের মোট পরিমাণ এবং বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য সরবরাহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
ইউরোপের পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিলডোর হিসাবে, ইউরোপে প্রায় সাত কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল রয়েছে, যা অন্য কোনো প্রতিশ্রুতির আওতায় নেই। কিন্তু জার্মানির মতো কয়েকটি দেশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মজুতের একটি অংশ ধরে রাখতে চায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত কেবল সরবরাহের প্রয়োজন দিয়ে নির্ধারিত হবে না; প্রতিটি দেশ নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তাকেও অগ্রাধিকার দেবে। কিলডো ইউরোপের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, তেল ছাড়ার সময় এবং সে বিষয়ে ইউরোপের সদিচ্ছা- দুটিই অনিশ্চিত।
এখানে চীনের ভূমিকা আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চীনের স্থলভিত্তিক অপরিশোধিত তেলের মজুত বর্তমানে প্রায় ১১৩ কোটি ব্যারেল। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এই পরিমাণ ছিল ১২৩ কোটি ব্যারেল। অর্থাৎ চীনের মজুতও কমেছে। তবে এখনও তা দেশটির শোধনাগারগুলোর প্রায় ৮০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো। কিন্তু চীনের এই বিপুল মজুতকে সরাসরি বিশ্ববাজারের জন্য সহজলভ্য সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। দেশটি তার নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেবে। ফলে বিশ্বের মোট মজুতের হিসাব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য দেশগুলোর জন্য বাস্তবে পাওয়া সম্ভব এমন তেলের পরিমাণ এক নয়।
ভারতের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্বেগজনক। রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, ভারতের জরুরি মজুত তার আমদানির মাত্র আট দিনের সমপরিমাণ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের এই সীমিত মজুত আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি বাড়ায়। ভারত ও পাকিস্তানের মতো এশীয় আমদানিকারকদের জন্য সমস্যাটি আরও তীব্র হতে পারে। কারণ তাদের বিকল্প সরবরাহের উৎস থেকে তেল আনতে অনেক বেশি সময় লাগে। কিলডোর মতে, পশ্চিম আফ্রিকা থেকে তেলবাহী জাহাজ ভারতে পৌঁছাতে ২৫ থেকে ২৮ দিন সময় নিতে পারে। বিপরীতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা থেকে সময় লাগে মাত্র দুই দিন।
এখানেই সংকটের ভৌগোলিক বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সব দেশ একই সময়ে বা একই মাত্রায় তেলের ঘাটতির মুখে পড়বে না। যেসব দেশের নিজস্ব মজুত কম, আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি এবং বিকল্প সরবরাহের উৎস দূরে, তারা সবচেয়ে দ্রুত সংকটে পড়বে। বিপরীতে যেসব দেশের নিজস্ব উৎপাদন বেশি, মজুত পর্যাপ্ত অথবা বিকল্প পরিবহন পথ রয়েছে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। তাই তেলের বৈশ্বিক সংকট শুধু মোট সরবরাহের প্রশ্ন নয়; বরং কোন দেশে কখন কতটা তেল পৌঁছানো সম্ভব, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে কিছু বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সৌদি আরব তার পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে পশ্চিমাঞ্চলের লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহনের জন্য ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছে। এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানি করতে পারে। কিন্তু এই বিকল্প পথও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। পাইপলাইনটিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। উপরন্তু ইয়ানবু থেকে দক্ষিণ দিকে যাওয়া জাহাজগুলোকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়।
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী এই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও হুমকি তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি ইয়েমেনের ভূখণ্ডে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এর আগে জুলাই মাসে তারা সৌদি আরবের জাহাজ চলাচলে অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কেপলারের মিউই শুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসে বাব আল-মান্দেব দিয়ে প্রতিদিন মাত্র তিন লাখ ৭৩ হাজার ব্যারেল সৌদি অপরিশোধিত তেল পরিবহনের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেছে, যা ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন। ইয়ানবু থেকে যাওয়া অধিকাংশ তেলবাহী জাহাজ এখন দক্ষিণের পথের পরিবর্তে মিসর হয়ে উত্তরের পথে চলাচল করছে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব- দুটি প্রণালিই একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানির বিকল্প ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হবে। এমন পরিস্থিতিতে তেলক্ষেত্র, রপ্তানি টার্মিনাল ও পাইপলাইনে আরও হামলা হলে সরবরাহের ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এই সংকট কত দিন স্থায়ী হতে পারে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের বক্তব্য বেশ স্পষ্ট। আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্পের মতে, বিশ্ব সম্ভবত এক থেকে দুই মাসের বেশি সময় স্বাভাবিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হওয়াটা ছিল সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু এবার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি একইভাবে রক্ষা পাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এক বা দুই মাস পর পৃথিবীর তেল সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে। বরং জরুরি মজুত এবং বিকল্প সরবরাহ দিয়ে বাজারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তখন তেলের দাম এমন পর্যায়ে উঠতে পারে, যেখানে উচ্চমূল্যের কারণে ভোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান জ্বালানি ব্যবহার কমাতে বাধ্য হবে। অর্থনীতির ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে চাহিদা ধ্বংস বা ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন বলা হয়। বিউচ্যাম্পের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার তেলের দাম একটি বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারে।
তেলের দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানি বা পরিবহন ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহের খরচও বাড়তে পারে। জ্বালানির ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদক ও পরিবহনকারীরা সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়। যেসব দেশের অর্থনীতি আমদানি করা জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
এই সংকটে বিশেষভাবে চাপে পড়তে পারে ডিজেলের বাজার। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজেলের দাম ইতিমধ্যে অপরিশোধিত তেলের দামের প্রায় দ্বিগুন। ডিজেল শুধু পরিবহন খাতে নয়, কৃষি, পণ্যবাহী ট্রাক, শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের সরবরাহ কমে গেলে বা দাম বেড়ে গেলে অর্থনীতির বিস্তৃত অংশে তার প্রভাব পড়ে।
কিলডোর মতে, শোধনাগারগুলো ডিজেল উৎপাদনে উপযোগী অপরিশোধিত তেলের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করলে সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।
অন্যদিকে, এই সংকটের মধ্যেও কিছু দেশ ও কোম্পানি আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অবস্থিত তেল উৎপাদক দেশগুলো উচ্চমূল্যের সুবিধা পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা ও রাশিয়া থেকে সরবরাহের চাহিদা বাড়তে পারে, কারণ শোধনাগারগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হবে। কেপলারের শু বলেছেন, এতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎপাদকরা বেশি দামে অপরিশোধিত তেল বিক্রির সুযোগ পেতে পারেন; একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলক কম হতে পারে।
যুদ্ধের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফার পরিসংখ্যান এই প্রবণতার উদাহরণ তুলে ধরে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ চলার সময় এক্সনমোবিল এক হাজার ৪৫০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। শেভরনের মুনাফা ছিল এক হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, শেলের মুনাফা দ্বিগুনেরও বেশি বেড়ে প্রায় এক হাজার কোটি ডলারে পৌঁছায়। প্রতিবেদনে এসব মুনাফার বড় কারণ হিসেবে উচ্চ তেলের দামকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সবশেষে, এই সংকটের মূল শিক্ষা হচ্ছে- বিশ্বের হাতে কত ব্যারেল তেল রয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে সেই তেল কোথায় আছে, কত দ্রুত ব্যবহার করা যাবে এবং সংকটের সময় কোন দেশ কতটা ভাগ করে দিতে প্রস্তুত। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং বাব আল-মান্দেবের পথও বাধাগ্রস্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯৩ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বিপরীতে ব্যবহারযোগ্য জরুরি মজুতের পরিমাণ আনুমানিক ৪০ কোটি ব্যারেল হলেও তা দ্রুত বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। এই ব্যবধানই বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা প্রকাশ করে।
ক্রিস বিউচ্যাম্পের সতর্কবার্তা- বিশ্বের হাতে হয়তো মাত্র এক থেকে দুই মাস সময় রয়েছে- তাই কেবল তেলের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত, যেখানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রবাহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বকে শুধু বিকল্প তেল সংগ্রহ করতে হবে না; বরং উচ্চমূল্য, পরিবহন ব্যয়, সীমিত মজুত এবং জ্বালানি বণ্টনের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। আর এই পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে সেই দেশগুলো, যাদের মজুত কম, আমদানিনির্ভরতা বেশি এবং বিকল্প সরবরাহের পথ দীর্ঘ ও অনিশ্চিত।