ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮৩২ কোটি। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স (আইআইএফ) বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম ভাগ শেষে পৃথিবীতে সব দেশ, কোম্পানি আর পরিবারের মিলিত ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি! ৩৬৫-এর পর ১২টা শূন্য, এবং সেই হিসাবটাও হবে ডলারে!
এই হিসাবে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের দেনার পরিমাণ কত? সরল ভাগের অঙ্ক বলছে, উত্তরটা–প্রায় ৪৪ হাজার ডলার! বিনিময় হারে এক ডলারের বিপরীতে ১২৩ টাকা করে ধরলেও বাংলাদেশি মুদ্রায় অঙ্কটা দাঁড়ায় প্রায় ৫৪ লাখ ১২ হাজার টাকা! আজ যে শিশুটি জন্ম নিল, প্রথম চিৎকার করার আগেই তার নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে এই অঙ্কের ঋণ। আজ যে ব্যক্তিটি মারা গেলেন, তার নামের সঙ্গেও জড়িয়ে এই অঙ্ক।
বিশ্বে ঋণের অঙ্কটা কীভাবে ধাঁই ধাঁই করে বাড়ছে, সরকারগুলো কীভাবে ঋণ নেয়, সরকারের বাড়তে থাকা ঋণ আর তার সুদের অঙ্ক কীভাবে দেশে দেশে, বিশেষ করে ইউরোপে, বিক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে, সেই বিশ্লেষণ উঠে এসেছে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে–
ইউরোপজুড়ে রাস্তায় নামছে মানুষ। গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে চলছে বিক্ষোভ। যে দাবিতে বিক্ষোভগুলো হচ্ছে, সে দাবিগুলো খুব মৌলিক–মোটাদাগে-জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, মজুরি কমে যাওয়া, বাড়িভাড়া সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া এবং স্কুল-কলেজে শিক্ষার পেছনে সরকারের দিক থেকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকা।
ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে বিক্ষোভের সময় কখনো কখনো সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। তবে অনেক বিক্ষোভ হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে।
এই অস্থিরতার মধ্যে সামনে এসেছে দেশে দেশে সরকারগুলোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকা আর্থিক সংকট। বছরের পর বছর বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ায় ইউরোপের অনেক দেশ এখন গভীর ঋণসংকটে। একই সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে ঋণ নেওয়ার খরচ, যার মূল অংশটা যায় সুদের পেছনে।
২০০২ সালের পর ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সরকার ঋণের সুদ পরিশোধে যত বেশি অর্থ ব্যয় করছে, ততই স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো সামাজিক খাতে ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ কমছে।
এখন প্রশ্ন হলো–একটা সরকার কীভাবে ঋণ নেয়? বিশ্বে বড় দেশগুলোর মধ্যে কার ঋণের কী অবস্থা? আর সরকারগুলো ঋণের সুদ পরিশোধে কত ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে?
সরকার কীভাবে ঋণ নেয়?
সাধারণ মানুষের মতো সরকারও ঋণ নেয়। তবে মানুষ যেখানে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, সরকার অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম হলো বিভিন্ন ধরনের বন্ড বা ঋণপত্র বিক্রি করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে সরকারের ঋণ নেওয়ার একটি মাধ্যম হলো সঞ্চয়পত্র বিক্রি।
এসব বন্ড বা ঋণপত্রের বিনিময়ে ক্রেতাদের সুদ দেয় সরকার। পাশাপাশি নির্ধারিত সময় পর তাদের মূল টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়।
যেমন, ১০ বছর মেয়াদি বন্ড হলো এমন একটি ঋণ, যা সরকার ১০ বছর পর পরিশোধ করে। এই বন্ডের সুদের হার বোঝায়, সরকারকে ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা কী হারে সুদ পাচ্ছেন। এই হার দিয়ে একটি দেশের ঋণ নেওয়ার খরচও বোঝা যায়।
এই ঋণব্যবস্থা কাজ করে কীভাবে?
প্রথমত, সরকার ঋণ নেয়। যেমন, একজন বিনিয়োগকারী ১০ বছর মেয়াদি একটি বন্ড কিনতে ১০০ ইউরো সরকারকে দেন।
দ্বিতীয়ত, সরকার নির্দিষ্ট সময় পরপর সুদ দেয়। যেমন, ১০ বছর ধরে প্রতি বছর বিনিয়োগকারী নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ পান। সুদের হার ২.৫ শতাংশ হলে বছরে পান ২.৫০ ইউরো। ১০ বছরে মোট সুদ পান ২৫ ইউরো। আর সুদের হার ৫ শতাংশ হলে বছরে পান ৫ ইউরো, অর্থাৎ ১০ বছরে মোট ৫০ ইউরো।
সর্বশেষ ধাপে, সরকার বন্ডের মেয়াদ শেষে মূল টাকা ফেরত দেয়। অর্থাৎ, ১০ বছর পর বিনিয়োগকারী তার মূল ১০০ ইউরো ফেরত পান।
সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে কী হয়?
বন্ডের দাম কমলে সাধারণত এর ইল্ড (বিনিয়োগকারীর প্রকৃত আয়ের হার) বেড়ে যায়। ফলে নতুন করে ঋণ নিতে গেলে সরকারের খরচও বাড়ে। আর এই খরচ বাড়লে সামাজিক খাতে খরচ কমাতে বাধ্য হয় সরকার।
সহজ উদাহরণ–একটা পরিবার যদি বাড়ির জন্য মর্টগেজ লোন নিয়ে থাকে, সেখানে সুদের হার বেশি হলে কী হবে? পরিবারটির মাসিক আয়ের মধ্যে ঋণের কিস্তির পেছনে খরচ বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে পরিবারের অন্য খরচ কমিয়ে আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে হবে! সরকারের ক্ষেত্রেও হিসাবটা তেমনই। ঋণের সুদের পেছনে খরচ বেড়ে যাওয়ার মানে, স্কুল-হাসপাতাল-সড়কের মতো জরুরি খাতে খরচ করার জন্য অর্থ সরকারের হাতে কম থাকবে।
ইউরো চালুর অল্প কিছুদিন পর থেকে, অর্থাৎ, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে, ইউরোপের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার কখনো ৫ শতাংশে পৌঁছায়নি। ২০১০ থেকে ২০১২ সালে ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটে থাকা দেশগুলোকেই যা এর চেয়ে বেশি সুদ দিতে হয়েছিল! সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছিল।
বর্তমানে ফ্রান্স ১০ বছর মেয়াদে ঋণ নিতে ৫ শতাংশের কাছাকাছি সুদ দিচ্ছে। অন্যদিকে, জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩.৪১ শতাংশ। দুই দেশের সুদের হারের ব্যবধান বাড়ার অর্থ হলো, ফ্রান্সকে ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা জার্মানির তুলনায় বেশি মুনাফা চাইছেন।
ইউরোজোনের দেশগুলো ও যুক্তরাজ্যের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হারের একটা চিত্র তুলে ধরেছে আল-জাজিরা, যেখানে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও বেশি সুদ দিচ্ছে ফ্রান্স। ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ছিল এই দুটি দেশ। ইউরোজোনের বাইরে থাকা দেশগুলোর মধ্যে শুধু যুক্তরাজ্যকেই ফ্রান্সের চেয়ে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে কার ঋণ নেওয়ার খরচ বেশি। ছবি: আল জাজিরা
কোন দেশগুলোর ঋণ সবচেয়ে বেশি?
বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র সবার ওপরে। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১.৪ ট্রিলিয়ন বা ৪১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার–যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের তুলনায় একটা বাড়তি সুবিধা পায়, তা হলো–তারা ঋণ নেয় মার্কিন ডলারেই, যা বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা। এ কারণে দেশটির সরকারি ঋণের চাহিদা বিশ্বজুড়েই ব্যাপক। তবে ঋণ নেওয়ার এই সক্ষমতারও সীমা আছে।
সরকারি ঋণের পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রের পরই আছে চীন। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ২২.৫ ট্রিলিয়ন বা ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার–যা দেশটির জিডিপির ১০৪ শতাংশ।
জাপানের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৮.৭ ট্রিলিয়ন বা ৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার। তবে অঙ্কে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের চেয়ে কম হলেও জাপানের বিপদ এই যে, প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ ও জিডিপির অনুপাত (ডেট টু জিডিপি রেশিও) সবচেয়ে বেশি–১৯৯ শতাংশ!
যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪.৪ ট্রিলিয়ন বা ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার–যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ।
বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে ফ্রান্সের অবস্থান পঞ্চম। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার–যা তাদের জিডিপির ১১৮.৫ শতাংশ।
ইতালির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ফ্রান্সের চেয়ে কম। তবে দেশটির ঋণের পরিমাণ তাদের জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে, জার্মানির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ১২১.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
আইএমএফের ২০২৬ সালের অক্টোবরের তালিকা অনুযায়ী আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে একটি এক্সেল ফাইল প্রকাশ করেছে, যেখানে বিশ্বের প্রতিটি দেশের ঋণের পরিমাণ, ২০১০ ও ২০২৬–এই ১৭ বছরে ঋণের অঙ্কের পার্থক্য এবং বর্তমান ঋণ ওই দেশের জিডিপির কত শতাংশ, সেটি খুঁজে দেখা যায়। তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারি ঋণের পরিমাণ ২০৪.৯ বিলিয়ন বা ২০ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার–যা দেশের মোট জিডিপির ৪০ শতাংশ। ২০১০ সালে অঙ্কটা ছিল ৪০.৯ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৯০ কোটি ডলার।
বিশ্বজুড়ে সুদ পরিশোধের খরচই বাংলাদেশের বাজেটের ৪৩ গুণ
বাংলাদেশের সর্বশেষ বাজেটের অঙ্কটা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ডলারের হিসাবে প্রায় ৭৬ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ৬০০ কোটি।
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে সরকার, পরিবার ও কোম্পানির মোট ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন বা ৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের বেশি হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের ভাগে প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। ঋণের এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে।
এই ঋণের সুদ পরিশোধের খরচও অনেক বেশি। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ ৩.৩ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ ৩০ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সর্বশেষ বাজেটেরও ৪৩.৪২ গুণ অর্থ খরচ হয়েছে শুধু বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর ঋণের সুদ পরিশোধে!
এই অর্থ কতটা বিশাল? বিশ্বের প্রতিরক্ষা খাতে সর্বশেষ বছরে ব্যয় ৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ব্যয় ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয় করা ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার! এসবের চেয়েও বেশি খরচ হয়েছে শুধু সরকারগুলোর নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধে!
সাধারণ মানুষের জন্য ঋণের সুদের খরচ বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো, স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো সেবায় ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে কম অর্থ থাকবে। সুদ পরিশোধের খরচ মেটাতে সরকারকে কর বাড়াতে বা সরকারি ব্যয় কমাতে হতে পারে।
এ ছাড়া, সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে বাড়ি, গাড়ি ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদের হারও বেড়ে যেতে পারে। ফলে ঋণের বাড়তি চাপ শুধু সরকারের ওপর নয়, সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে।