ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং সেই সূত্রে ফের যুদ্ধ কি আসন্ন? ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষিত নতুন কৌশল ঘোষণার পর এরই মধ্যে সৌদি আরব থেকে নিজের কূটনীতিকদের সরে যাওয়ার আদেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। এতে এই প্রশ্ন এবার উঠছে জোরেশোরেই।
যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের পদক্ষেপের কারণ হিসেবে ইরানের আক্রমণাত্মক কৌশলের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছে। এদিকে আইআরজিসি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা করলে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে জোর হামলা চালাবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত আট মাস ধরা যুদ্ধাবস্থার মধ্যে শান্তি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার কার্যকারিতা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা, এর মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে গতকাল বুধবার হামলা বেড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের সতর্কতা এসেছে উভয় পক্ষ থেকে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেন মোহেবি বলছেন, “আগে আমাদের প্রতিরক্ষানীতি ছিল রক্ষণশীল। আমরা সাধারণত বলতাম- যদি কোনো দেশ হামলা চালায়, আমরা প্রত্যুত্তর দেব। এখন আমরা বলি–যদি কোনো দেশ আমাদের হামলা করে আমরা প্রত্যুত্তর দেব এবং আক্রমণ করব।”
এর আগে সৌদি আরবে লাগাতার হুতি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটি থেকে কিছু কূটনীতিক সরিয়ে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে সিদ্ধান্ত দ্রুতই জানানো হবে বলে জানিয়েছিলেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আসা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফের হামলার পরিকল্পনা করছে, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে। চলমান শান্তি আলোচনায় স্থবিরতা এবং উভয় পক্ষ থেকে আসা নতুন করে হুমকি এ ধরনের আশঙ্কা তৈরি করছে।
ইরানের নতুন প্রতিরক্ষানীতিতে কী আছে?
আইআরজিসি বুধবার তাদের নতুন ‘আক্রমণাত্মক ও অপ্রতিসম’ প্রতিরক্ষানীতি ঘোষণা করে, যেখানে যে দেশই হামলা করবে, তা হামলার শিকার হবে বলে ইরান ঘোষণা করেছে। হোসেন মোহেবি স্পষ্ট বলেছেন, ইারান আর তার সামরিক অভিযানকে ‘প্রত্যুত্তর’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না।
মোহেবি জানিয়েছেন, গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের সময়কার তুলনায় তাদের মিসাইলের মজুত দেড় গুণ হয়েছে। তবে তিনি এ সম্পর্কিত সুস্পষ্ট কোনো সংখ্যা জানাননি। শুধু বলেছেন, “মিসাইলগুলোর পাল্লা, নির্ভুল আঘাত ও ধ্বংসের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।”
আইআরজিসি মুখপাত্র বলেছেন, “ইরানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে ‘ফাদার অব অল বম্ব’ উন্মোচনের পর্যায়ে রয়েছে, যা শত্রুদের জন্য একেবারে অভিনব।”
এদিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের হামলা অব্যাহত। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি নৌবাহিনী আজ বৃহস্পতিবার ভূমধ্যসাগরের উত্তরাঞ্চলে ‘অবৈধভাবে তেল পরিবহনের’ কারণে চারটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে জানায়। এ ছাড়া আরও তিনটি জাহাজ পুঁতে রাখা মাইনে আঘাত করে আক্রান্ত হয়েছে।
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও এ সূত্রে যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশ হতো। বর্তমানে এ অঞ্চল দিয়ে সরবরাহের অনেক কম হলেও মোটাদাগে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহ আগের পর্যায়ে চলে গেছে। তবে এটা হচ্ছে এখন বিকল্প পথে।
ইরানের কৌশলে কেন এই বদল?
ইরান হঠাৎ করে কেন রক্ষণশীল প্রতিরক্ষানীতি থেকে সরে এল। কেন তারা ঘোষণা দিয়ে আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা কৌশল গ্রহণ করল? বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে একটি বার্তা দিতে চাইছে। তারা বলতে চাইছে–আমাদের ওপর ফের হামলা হলে তোমাদের আগের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য চোকাতে হবে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোরতাজাভি আল জাজিরাকে বলেছেন, “তেহরান মূলত ২০২৫ ও ২০২৬ সালে হওয়া যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়েছে। তারা বুঝেছে যে, তাদের প্রত্যুত্তর দেওয়ার প্রতিরক্ষানীতি প্রতিপক্ষের তরফ থেকে ফের হামলা ঠেকাতে পারছে না। তেহরান এখন নতুন একটি সমীকরণ দাঁড় করাতে চায়। আর তা হলো–ইরানের ওপর ভিবষ্যতে যেকোনো হামলার জন্য আগ্রাসনকারীকে অনেক বেশি মূল্য চোকাতে হবে।”
নেগার মোরতাজাভির মতে, সামরিক সক্ষমতায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। এ কারণে ইরান আরও বেশি করে অপ্রচলিত রণকৌশল গ্রহণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে মিসাইল, ড্রোন ইত্যাদির অত্যধিক ব্যবহার এবং হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে তাদের বাড়তি সুবিধা। তারা এখন আগের চেয়ে বড় পরিসরের কৌশল গ্রহণ করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়। এমনকি তারা যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনেও প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। তিনি বলেন, “ইরান ওয়াশিংটনকে একটা শীক্ষা দিতে চায়। তারা বলতে চাইছে, এমনকি ইরানে হামলার কারণে (মধ্যবর্তী) নির্বাচনেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।”
মোরতাজাভির মতে, এর একটি ইঙ্গিত রয়েছে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে, যেখানে রিপাবলিকানরা হেরে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ইরানের নেতারা এ নির্বাচনের দিকে গভীর মনোযোগ রেখেছেন। তারা বিশ্বাস করেন, ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতির মাশুল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নির্বাচনে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শোধ করতে হবে।