মার্কিন সামরিক শক্তির ইতিহাসে ভিয়েতনাম যুদ্ধ একটি গভীর শিক্ষা রেখে গিয়েছিল—অসীমতুল্য সামরিক ক্ষমতা থাকা আর সেই ক্ষমতাকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করা এক বিষয় নয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের বিজয়ের পর ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব মনে করেছিল, ভিয়েতনামের সেই শিক্ষা হয়তো চিরতরে অতীত হয়েছে। কিন্তু ২০০১ সালের পর আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধ, আর এখন ইরানকে ঘিরে সাত মাসের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সংকট আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। মিডিল ইস্ট আই–তে সম্প্রতি প্রকাশিত সামি আল-আরিয়ানের এক বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো—যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হলেও সেই শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা এবং প্রতিপক্ষকে নিজের রাজনৈতিক শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা এক নয়।
সামি আল-আরিয়ানের বিশ্লেষণের সূচনা হরমুজ প্রণালির একটি তাৎপর্যপূর্ণ বাস্তবতা দিয়ে। ২২ সেপ্টেম্বর মাত্র দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছিল। অথচ এই সরু জলপথ দিয়ে সাধারণ সময়ে বিশ্বের দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসেরও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ কয়েক বিলিয়ন ডলারের মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এই অঞ্চলে অবস্থান করলেও বাণিজ্যিক জাহাজের মালিক, পরিচালনাকারী এবং বিমা কোম্পানিগুলো স্বাভাবিক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়। এখানেই সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কার্যকারিতার মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় যেকোনো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু সেই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফল অর্জন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
লেখক এই পরিস্থিতিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি অবশ্য সতর্ক করে দিয়েছেন যে ভিয়েতনাম, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং বর্তমান ইরান যুদ্ধকে একেবারে একই মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না। প্রতিপক্ষ, সময়, ভূরাজনৈতিক পরিবেশ ও সামরিক প্রযুক্তি—সবই আলাদা। কিন্তু তিনটি যুদ্ধই মার্কিন শক্তির সীমা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোচীনে পাঁচ লাখের বেশি সেনা মোতায়েন করেছিল। বিপুল বোমাবর্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি এবং সায়গনের সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন দেওয়ার পরও ওয়াশিংটন রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে সায়গনের পতন সেই ব্যর্থতার সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতীক হয়ে ওঠে। আল-আরিয়ানের মতে, ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রকে শিখিয়েছিল যে বিপুল সামরিক শক্তি এমন কোনো প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক সমাধান মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে না, যে প্রতিপক্ষ দীর্ঘ সময় টিকে থেকে মার্কিন রাজনৈতিক সংকল্পকে ক্ষয় করতে প্রস্তুত।
ভিয়েতনামের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে মানসিক অভিঘাত তৈরি হয়েছিল, সেটিই ‘ভিয়েতনাম সিনড্রোম’ নামে পরিচিত। এটি কেবল মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি নিয়ে জনমনে ভয় বা বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের অনীহা ছিল না; বরং মার্কিন সামরিক শক্তি আদৌ কার্যকর রাজনৈতিক ফলাফল তৈরি করতে পারে কি না—সে প্রশ্নও এর কেন্দ্রে ছিল। সায়গন পতনের পর দীর্ঘ সময় বিদেশে বড় ধরনের স্থলসামরিক অভিযান নিয়ে ওয়াশিংটনে দ্বিধা ছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পথে, জার্মানি পুনরেকত্রীকরণের দিকে, চীন তখনকার তুলনায় অনেক দুর্বল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প কোনো বৈশ্বিক শক্তি-জোট গঠনের সক্ষমতাও ছিল না। এই পরিস্থিতিকে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তুলেছিলেন।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ তাই মার্কিন আত্মবিশ্বাসের জন্য একটি মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে। প্রায় ২ হাজার মার্কিন সামরিক বিমান এবং মিত্রদের আরও প্রায় ৬০০ বিমান যুদ্ধে অংশ নেয়। ছয় সপ্তাহের বিমান অভিযানে এক লাখের বেশি উড্ডয়ন এবং বিপুল পরিমাণ বোমা ব্যবহার করা হয়। স্থল অভিযান শুরু হওয়ার পর মাত্র ১০০ ঘণ্টার মধ্যে কুয়েত মুক্ত হয়। প্রায় সাত লাখ মার্কিন সেনা অভিযানে অংশ নিলেও মার্কিন প্রাণহানি ছিল ৩০০-এর কম। এই দ্রুত ও সুস্পষ্ট সামরিক বিজয় ওয়াশিংটনের মনে এমন একটি ধারণা তৈরি করে যে ভিয়েতনামের ছায়া আর নেই। ১৯৯১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট বুশ ঘোষণা করেছিলেন, “ঈশ্বরের কৃপায়, আমরা চিরতরে ভিয়েতনাম সিনড্রোম দূর করতে পেরেছি।”
কিন্তু এখানেই আল-আরিয়ানের বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তার মতে, ১৯৯১ সালের বিজয় মার্কিন সামরিক শক্তির বাস্তব সক্ষমতার পাশাপাশি একটি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও তৈরি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারার সক্ষমতাকে ধীরে ধীরে একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতার সঙ্গে এক করে ফেলেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই আত্মবিশ্বাস আরও গভীর হয়। একক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, ডলার, সামরিক জোট, ন্যাটো, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের প্রভাব অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছায়। কিন্তু এই একমেরু মুহূর্তই শেষ পর্যন্ত এক ধরনের ‘ইউনিপোলার ট্র্যাপ’ তৈরি করে।
তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নিজের অনুগত একটি বিশেষ বাহিনী তৈরি করেছেন। ছবি: রয়টার্স
আফগানিস্তান ও ইরাক সেই ভুল ধারণার বাস্তব মূল্য দেখায়। ৯/১১-এর পর আফগানিস্তানে দুই দশকের সামরিক অভিযান ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চেষ্টার শেষে ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী চলে যায় এবং তালেবান আবার কাবুলের ক্ষমতায় ফিরে আসে। ইরাকে ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পতন ঘটে। কিন্তু পরবর্তী দখলদারিত্বে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, ইরাক ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত বাগদাদে ইরানের প্রভাব আরও বাড়ে। অর্থাৎ শত্রুর সরকার ফেলে দেওয়া সম্ভব হলেও সেই দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজের পছন্দমতো সাজিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ভিয়েতনামের মূল শিক্ষা এখানেই আবার ফিরে আসে—যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব রাজনৈতিক ফলাফলের নিশ্চয়তা নয়।
এরপর বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামোও বদলাতে শুরু করে। চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, রাশিয়া পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও সক্রিয়ভাবে চ্যালেঞ্জ করছে এবং গ্লোবাল সাউথের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে ১৯৯১ সালের মতো পরিস্থিতি আর নেই। তখন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এককভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম নির্ধারণ করতে পারত; এখন তাকে একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও নানা আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে হিসাব করতে হয়। ভারত, তুরস্ক ও ব্রাজিলের মতো মধ্যম শক্তিগুলোও একক কোনো শিবিরে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ না থেকে বহু-পক্ষীয় বা বহু-সমন্বয়ভিত্তিক কূটনীতি অনুসরণ করছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে গাজার ঘটনাও যুক্ত হয়েছে। আল-আরিয়ানের বিশ্লেষণে, গাজা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু একটি মানবিক বা আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি মার্কিন বৈশ্বিক বৈধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটও তৈরি করেছে।
লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতিকে বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একাধিক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। লেখকের যুক্তি হলো, এর ফলে গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশের কাছে ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ নিয়ে দ্বৈত মানদণ্ডের ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া বা ইরানের মতো প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে যে আন্তর্জাতিক নীতির কথা বলে, মিত্রদের ক্ষেত্রে তা একইভাবে প্রয়োগ করে না। এই রাজনৈতিক পটভূমিও হরমুজ সংকটকে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক অবস্থান ছিল শক্তির দিক থেকে অত্যন্ত সুবিধাজনক। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ইরান বেশ কিছু কৌশলগত ধাক্কা খেয়েছিল। হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব ও সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতনে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ দুর্বল হয়েছিল এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সক্ষমতা ইরানের ভেতরে গভীরভাবে প্রবেশ করেছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রচলিত সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে হচ্ছিল। কিন্তু সাত মাসের যুদ্ধ দেখিয়েছে, কৌশলগতভাবে দুর্বল প্রতিপক্ষও ভিন্ন ধরনের সুবিধা কাজে লাগাতে পারে।
এই যুদ্ধের মূল্যও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কম নয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে পেন্টাগনের হিসাবে সরাসরি মার্কিন সামরিক ব্যয় প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এর মধ্যে উন্নত অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরেই ২৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের হিসাবে অন্তত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৮৩০-এর বেশি আহত হয়েছে। একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট, থাড ও টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসার ব্যাপারে সতর্কতা ছিল। ফলে যুদ্ধের ব্যয় শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি মার্কিন সামরিক সক্ষমতার মজুত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ওপরও চাপ তৈরি করছে।
সামরিক মহড়া চলাকালীন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
ইরানের সবচেয়ে বড় সুবিধা এখানে তার সামরিক সমতা নয়, বরং ভূগোল। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় এই সরু জলপথের গুরুত্ব এত বেশি যে এর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলেই তার প্রভাব সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পড়ে। প্রথম ৩৯ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়; শুধু যুক্তরাষ্ট্রই ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এত বিপুল হামলার পরও ইরান আত্মসমর্পণ করেনি। বরং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত চালিয়েছে।
এরপর অর্থনৈতিক চাপ ও নৌ অবরোধও কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি। এপ্রিলে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতি চাপে ফেলতে নৌ অবরোধ আরোপ করে। কিন্তু তেহরান আত্মসমর্পণ করেনি। জুনে একটি সাময়িক সমঝোতা হলেও তিন সপ্তাহের মধ্যে তা ভেঙে যায়। জুলাইয়ে আবার যুদ্ধ শুরু হয় এবং অবরোধ পুনর্বহাল করা হয়। আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে সেই চাপও কার্যত থমকে যায়। সেপ্টেম্বর নাগাদ হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব দৈনিক প্রায় ১২৫টি বড় জাহাজ থেকে মাত্র কয়েকটিতে নেমে আসে। লেখকের ভাষায়, এটিই ‘হরমুজ সিনড্রোম’—যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, বিপুল ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু প্রতিপক্ষকে নিজের রাজনৈতিক শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে না।
এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অসম যুদ্ধের অর্থনীতি। একটি তুলনামূলক সস্তা ড্রোনকে একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান ধ্বংস করতেই হবে—এমন নয়। যদি সেই ড্রোন প্রতিরক্ষাকারী পক্ষকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে বাধ্য করে, বাণিজ্যিক বিমান চলাচল ব্যাহত করে বা সামুদ্রিক বিমার খরচ বাড়িয়ে দেয়, তাহলেই তার কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরণ হতে পারে। একইভাবে একটি বিশাল বিমানবাহী রণতরী বহর সমুদ্রের নির্দিষ্ট এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, কিন্তু কোনো বেসরকারি জাহাজ কোম্পানি বা বিমা প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ পাঠাতে বাধ্য করতে পারে না। এখানেই প্রচলিত সামরিক শক্তির সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তব আচরণের পার্থক্যটি প্রকট হয়ে ওঠে।
হরমুজ সংকট তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সামরিক দ্বন্দ্ব নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত চিন্তাভাবনাকেও বদলে দিচ্ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার ইরানের প্রতিবেশী এবং চীন তাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে তারা শুধু ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। এর উদাহরণ হিসেবে লেখক ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর দিকে এগিয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে মিসর বা ইরানের মতো আরও শক্তিকে যুক্ত করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও লেখায় তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় বলা ঠিক হবে না—লেখাটিও তা দাবি করে না। ইরান ভয়াবহ মানবিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত সামরিক শক্তি। পরিবর্তন ঘটেছে অন্য জায়গায়: ওয়াশিংটন তার সামরিক শক্তিকে রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করার সক্ষমতা হারাচ্ছে বা অন্তত তার সীমা প্রকাশ্যে দৃশ্যমান হচ্ছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাহাজে-জাহাজে সামরিক প্রতিযোগিতায় জিততে পারেনি, আকাশও দখল করতে পারেনি; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের আঞ্চলিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার খরচ এত বেশি করে তুলেছে যে সেই খরচ আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কতটা দীর্ঘ সময় বহন করতে পারবে—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এই জায়গাতেই ভিয়েতনাম ও হরমুজের মধ্যে সবচেয়ে গীর সাদৃশ্য। ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করেনি, কিন্তু মার্কিন শক্তির সীমা বিশ্ববাসীর সামনে দৃশ্যমান করে দিয়েছিল। বর্তমান ইরান যুদ্ধও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বাতিল করছে না; বরং দেখিয়ে দিচ্ছে, সেই শ্রেষ্ঠত্বের রাজনৈতিক ব্যবহার কতটা সীমিত। ১৯৯১ সালের মতো আন্তর্জাতিক পরিবেশ এখন আর নেই। চীন তখন বিচ্ছিন্ন ও তুলনামূলক দুর্বল ছিল; এখন সে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র। রাশিয়া সক্রিয়ভাবে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে। ভারত, তুরস্ক ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো একক কোনো পরাশক্তির শিবিরে আবদ্ধ না থেকে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও আগের তুলনায় বেশি খণ্ডিত।
সামি আল-আরিয়ানের বিশ্লেষণের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক তাই ‘কে জিতল’—এই সরল প্রশ্নের বাইরে গিয়ে শক্তির প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ এবং তার সামরিক শক্তির সঙ্গে অন্য কোনো দেশের সরাসরি তুলনা করা কঠিন। কিন্তু একুশ শতকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি মানে শুধু বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র বা সামরিক ঘাঁটি নয়। শক্তি মানে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক আচরণ প্রভাবিত করার ক্ষমতা, মিত্রদের আস্থা ধরে রাখা, আন্তর্জাতিক বৈধতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক ঝুঁকি বহন করার সক্ষমতা এবং সামরিক বিজয়কে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার সামর্থ্য। হরমুজের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, এই বৃহত্তর অর্থে মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির মাত্র ২১ মাইলের সরু জলপথটি যেন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। কয়েক দশক ধরে মার্কিন সামরিক শক্তির ছায়ায় এই জলপথকে অনেক বেশি নিরাপদ ও প্রশস্ত বলে মনে হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংকট দেখিয়েছে, সামরিক আধিপত্য সব সময় অর্থনৈতিক প্রবাহ, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, বিমা ঝুঁকি এবং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রকে একবার এই সত্য শিখিয়েছিল; ১৯৯১ সালের বিজয় সেই শিক্ষা আড়াল করেছিল; আফগানিস্তান ও ইরাক তা আবার সামনে এনেছিল। এখন হরমুজ সেই একই প্রশ্নকে আরও তীব্রভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি কমে গেছে—এমন সরল সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিশ্ব বদলে গেছে, এবং সেই বদলে যাওয়া বিশ্বে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব আর এককভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির শর্ত নির্ধারণের সমার্থক নয়। লেখাটির শেষ উপলব্ধি তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: যে হরমুজকে এতদিন মার্কিন শক্তির কারণে কার্যত প্রশস্ত ও নিরাপদ মনে হতো, এখন সেই একই সরু জলপথ মনে করিয়ে দিচ্ছে—শক্তিশালী হওয়া আর সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো করাতে পারা এক বিষয় নয়।