
সাদা ছড়ি হাতে, পথটা কি নিরাপদ?
একদিন রিকশায় করে বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি নামলাম। আমার বাস ধরতে হবে। কিন্তু রিকশাচালক আমাকে এমন এক জায়গায় নামিয়ে দিলেন, যেখান থেকে ঠিক কোন দিকে গেলে বাসস্ট্যান্ড পাব, বুঝতে পারছিলাম না। হাতে আমার সাদা ছড়ি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে দাফন করার লোক পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে রাতের আঁধারে তার বোন ও মেয়ে কবর খোঁড়ার কাজটি করছেন টর্চের আলোয়।
প্রথমবার পরিবারের লোকজন দাফনের ব্যবস্থা করলে ‘উত্তেজিত জনতা’ কবর ভরাট করে দেন। এই উত্তেজিত জনতা কারা? প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সাংবাদিকেরা বলেছেন, উত্তেজিত জনতার নামে জামায়াতের কর্মীরাই মানিক পশারীর কবর খুঁড়তে বাধা দিয়েছেন।
আমাদের সমাজে সাধারণত পুরুষেরাই কবর খোঁড়া তথা দাফনকাফনের কাজটি করে থাকেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। ‘উত্তেজিত জনতার’ ভয়ে আশপাশের পুরুষ আত্মীয়রাও এগিয়ে আসেননি। তার মৃত্যুর খবর পিরোজপুরে পৌঁছানোর পরই জামায়াতের কর্মী ও সমর্থকেরা শহরের বিভিন্ন স্থানে টহল দেন। তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেন।
একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এই অসম্মান কেন? আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপির নেতারা জোরে শোরে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ ও লালন করার কথা বলছেন। একাত্তরের গুপ্ত শক্তি সম্পর্কে দেশবাসীকে হুঁশিয়ার করেও দিয়েছেন। কিন্তু যখন তারা একজন মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দিল, তখন বিএনপি নেতারা একটি কথাও বললেন না। নীরব থাকলেন।
কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন সঠিক ও সাহসী ভূমিকাই রেখেছে। মানিক পশারী একজন গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। তারা তাকে যথাযথ সম্মান দেখিয়েছে গার্ড অব অনার দিয়ে।
বিএনপির নেতারা পেছনে ফিরে তাকালে জানতে পারতেন, একাত্তরে পিরোজপুরে পাকিস্তানি বাহিনীকে কারা সহায়তা করেছেন। কারা পুলিশ সুপার ফজলুর রহমানকে (লেখক হুমায়ূন আহমেদ ও মুহাম্মদ জাফর ইকবালের বাবা) হত্যা করেছেন। কারা মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করা ভাগিরথীকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জহিরুল হক অবশ্য দাফনের ঘটনায় বাধা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, “মানিক পশারীর দাফনের বিষয়ে আমাদের কোনো বাধা ছিল না। তবে দাফনের ব্যাপারে আমাদের কোনো সহযোগিতাও ছিল না। কাদের ছত্রচ্ছায়ায় এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় দাফন হয়েছে, তা আমরা কিছুই জানি না।”
তার ভাষ্য, অনুযায়ী যদি জামায়াতে ইসলামী মানিক পশারীর দাফনে বাধা না দিয়ে থাকে, তাহলে প্রথমবার খোঁড়া কবরে কেন তাকে দাফন করা গেল না? কেন রাতের আঁধারে দ্বিতীয়বার কবর খুঁড়তে হলো? কাদের ভয়ে মানিক পশারীকে জন্মভূমি ছেড়ে গোপালগঞ্জে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হলো চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর?
উল্লেখ্য, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রাষ্ট্রপক্ষের মামলার বাদী মানিক পশারী পলাতক থাকা অবস্থায় শনিবার দুপুরে গোপালগঞ্জে তার মেয়ের বাড়িতে মারা যান। তার লাশ বেলা ২টার দিকে পিরোজপুরে নিয়ে আসা হয়। তাকে নিজ বাড়ি পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের উদ্দেশ্যে বেলা ২টার দিকে কবর খোঁড়া হলেও বিকেল ৪টায় ‘উত্তেজিত কিছু জনতা’ এসে কবরস্থানটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়। মানিক পশারীর ভগ্নিপতি মোহাম্মদ চান মিয়া বলেন, “মানিক পশারী আজ দুপুরে মারা যাওয়ার খবর পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পারিবারিক কবরস্থানে কবর খোঁড়া হয়েছিল। বিকেলে কিছু উত্তেজিত জনতা এসে কবরটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দিয়ে যায়।”
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) রাধেশ্যাম সরকার জানান, শনিবার রাত দেড়টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামে নিজ বাড়ির কবরস্থানে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন। তিনি অবশ্য বলেননি, কজন পুরুষ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানিক পশারীকে পিরোজপুরে গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে শনিবার উত্তেজনা সৃষ্টি করে জামায়াতের নেতা–কর্মীরা। তারা তাকে এখানে দাফন না করার দাবি জানান। এ সময় পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের অবস্থান নিতে ও সমবেত হতে দেখা যায়।
পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন মানিক পশারী। তার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জামাতার বাড়িতে ছিলেন। দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, “আমরা বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছি, যাতে কেউ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে জামায়াতের ওপর দায় চাপাতে না পারে।” তাহলে প্রশ্ন, দাফন করতে বাধা দেওয়ার মতো অপ্রীতিকর কাজটি কারা করলেন?
দিনভর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, প্রথমে খোঁড়া কবরটি সাঈদীর সমর্থকরা মাটি ফেলে ভরাট করে ফেলে। এ নিয়ে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর অর্থ, যারা শান্তি রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তারাই মানিক পশারীর দাফনে বাধা দিয়েছেন। কোনো ধর্মপ্রাণ মানুষ একজন মুসলমানের শেষ কৃত্যে বাধা দিতে পারেন না।
মানিক পশারীর দাফন নিয়ে বাধা ও উত্তেজনাকর ঘটনার পর রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে খুব বেশি প্রতিবাদ দেখিনি। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলও নীরব ছিল। তবে কেউ কেউ প্রতিবাদ করেছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ২৬ অক্টোবর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি বলেন, সাধারণত কারও মৃত্যু হলে এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কবর খোঁড়া ও দাফনের কাজে সহযোগিতা করেন। কিন্তু মানিক পশারীর ক্ষেত্রে তার পরিবারকে দীর্ঘ সময় উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল, মাইকিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে পিরোজপুরে মানিক পশারীকে দাফন করতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
তাসনিম জারার মতে, মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, তা যাচাই করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আদালত রয়েছে। কিন্তু দাফনে বাধা দিয়ে এমন বিতর্কের মীমাংসা করার উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, মৃত্যুর পর মানুষের বিচার আল্লাহর হাতে—এমন বিশ্বাস বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ।
পোস্টে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তার বক্তব্য, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদার কথা বলার পাশাপাশি শোকাহত পরিবার এবং মৃত ব্যক্তির প্রতি আচরণেও সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। বিরোধী দলে থাকতেই যদি কারও পারিবারিক কবরস্থানে দাফনে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পেলে কী করা হবে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে বাধার দেওয়ার প্রতিবাদে ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঢাকার পুরানা পল্টন এলাকায় মশাল মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যৌথভাবে এই কর্মসূচির আয়োজন করে। তারা স্লোগান তুলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের অপমান সইবে না রে এই দেশ’, ‘আমার মাটি আমার মা, পাকিস্তান হবে না’।
বাংলার মাটি বাংলার মানুষেরই থাক। একাত্তরে যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, তারাও যথাযথ সম্মান পাক, এটাই সময়ের দাবি।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

সাদা ছড়ি হাতে, পথটা কি নিরাপদ?
একদিন রিকশায় করে বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি নামলাম। আমার বাস ধরতে হবে। কিন্তু রিকশাচালক আমাকে এমন এক জায়গায় নামিয়ে দিলেন, যেখান থেকে ঠিক কোন দিকে গেলে বাসস্ট্যান্ড পাব, বুঝতে পারছিলাম না। হাতে আমার সাদা ছড়ি।

মবলাভারের দেশে মব কমবে কীসে!
কখনও পিটিয়ে মেরে ফেলার ডাক দেওয়া হচ্ছে। কখনও পিটিয়ে মেরেই ফেলা হচ্ছে। কখনও শুধু মেরে ফেলেই শান্ত হওয়া হচ্ছে না, বরং মৃত ব্যক্তির লাশকেও আগুনে পোড়ানো হচ্ছে। আমাদের দেশে এই ধারাবাহিকতায় নতুন যে সংযুক্তি সেটি হলো, একেবারে সমাবেশ করে প্রকাশ্যে মব করার হুমকি দেওয়া!

কার সঙ্গে কার আঁতাত
আমরা ভেবেছিলাম, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আঁতাতের রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আঁতাত মানে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। আঁতাত মানে প্রকাশ্যে এক কথা বলে তার বিপরীতে কাজ করার রাজনীতি। উদ্বেগের কথা হলো নির্বাচিত সরকারের আট মাসের মাথায়, রাজনৈতিক আঁতাতের কথাটি জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।

চড়ের মহিমা ও বিপদ
চড় জিনিসটা বড় অদ্ভুত। এক টুকরো হাতের তালু, কয়েক আউন্স রাগ, সামান্য সাহস আর এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত—ব্যস, ইতিহাস তৈরি! কেউ চড় মেরে বীর, কেউ চড় খেয়ে শহীদ, কেউ আবার চড়ের ভিডিও ভাইরাল করে রাতারাতি তারকা।