পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতাকে শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদ, শুধু রাষ্ট্রীয় দমন, কিংবা শুধু পাহাড়ি-বাঙালি বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস, ভূমির মালিকানা, জাতিগত পরিচয়, নিরাপত্তা-ভাবনা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার জটিল সংকট। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—দীর্ঘদিনের সংঘাত, শান্তিচুক্তি এবং নানা উন্নয়ন উদ্যোগের পরও কেন অঞ্চলটি নির্দিষ্ট বিরতিতে বার বার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রচলিত বয়ানের বাইরে গিয়ে একটি ক্রিটিক্যাল অ্যানালাইসিস প্রয়োজন, যা প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত নানা পক্ষের মতামতের বাইরের একটি যুক্তিগ্রাহ্য চিত্র উপস্থাপন করে। অর্থাৎ, যে অবস্থানটি সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের কাছে অস্বস্তিকর, সেটিকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করতে হবে। এর উদ্দেশ্য কোনো পক্ষকে নির্দোষ বা দোষী ঘোষণা করা নয়। বরং প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্য, স্বার্থ, ভুল এবং দায়কে একই বিশ্লেষণী কাঠামোয় সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে সমস্যাটির কার্যকারণ খুঁজে বের করা।
ইতিহাসের অসমাপ্ত হিসাব
পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান সংকট বুঝতে হলে ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক স্বাতন্ত্র্য, পাকিস্তান আমলের কাপ্তাই বাঁধ ও উদ্বাস্তু সমস্যা, স্বাধীনতার পর সাংবিধানিক পরিচয় ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং পরবর্তী সশস্ত্র সংঘাতের ইতিহাস বিবেচনায় নিতে হয়। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। যার ফলে ভূমি ও জীবিকার ক্ষতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাষ্ট্র-সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। স্বাধীনতার পর পাহাড়ি নেতাদের জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও স্বায়ত্তশাসনের দাবির সঙ্গে রাষ্ট্রের জাতীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্বের ধারণার সংঘাত তীব্র হয়। এর পরিণতিতে দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাত হয় এবং অবশেষে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি।
কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া আর সংঘাতের রাজনৈতিক-সামাজিক ভিত্তি দূর হওয়া এক বিষয় নয়। চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে মতভেদ, ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তিতে জটিলতা, আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যকারিতা, নিরাপত্তা উপস্থিতি এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। ফলে শান্তিচুক্তি সংঘাতের অবসানের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করলেও তা সব পক্ষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর রাজনৈতিক বন্দোবস্তে পরিণত হয়নি।
নিরাপত্তা-যুক্তি কি অমূলক?
রাষ্ট্রের অবস্থানকে তার সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিতে উপস্থাপন করলে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তসংলগ্ন একটি কৌশলগত অঞ্চল। এখানে সশস্ত্র গোষ্ঠী, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং আন্তঃগোষ্ঠী সংঘর্ষের অভিযোগ ও ঘটনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-উদ্বেগকে বাস্তব করে তোলে। ২০২৪ সালে বান্দরবানে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা এবং তার পরবর্তী নিরাপত্তা অভিযান দেখিয়েছে, সমস্যাটি কেবল অতীতের ইতিহাসে আটকে নেই। একাধিক গবেষণাও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও আন্তঃসম্প্রদায়িক অবিশ্বাসকে চলমান নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরবর্তীতে চলতি অক্টোবরে সাজেকে পর্যটকদের জিম্মি করার ঘটনাটিকেও নিরাপত্তা সমস্যার আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। অতএব, নিরাপত্তা-উদ্বেগকে নিছক অজুহাত বলে উড়িয়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। নাগরিকের জীবন রক্ষা, অস্ত্রের অবৈধ প্রবাহ বন্ধ করা এবং সাধারণ মানুষকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত রাখার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়াও বাস্তবসম্মত নয়।
কিন্তু পাল্টা প্রশ্নটি আরও জরুরি: নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদ্ধতিই যদি স্থানীয় মানুষের একটি অংশের মধ্যে অনাস্থা বাড়ায়, তাহলে সেই নিরাপত্তা কতটা টেকসই? কারণ, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা আর জনগণের আস্থা অর্জন এক জিনিস নয়। নিরাপত্তা অভিযান কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি দমন করতে পারে, কিন্তু গভীর সামাজিক দূরত্ব, ভূমি বিরোধ, রাজনৈতিক বঞ্চনা ও ন্যায়বিচারের সংকটের বিকল্প হতে পারে না। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অপরাধের দায় প্রমাণ ছাড়া পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর চাপালে বিচ্ছিন্নতাবাদী বয়ান আরও গ্রহণযোগ্য হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, সশস্ত্র সংগঠনের অপরাধকে জাতিগত অধিকারের আন্দোলনের নামে আড়াল করাও সমানভাবে ক্ষতিকর। সুতরাং, নিরাপত্তা-নীতি কার্যকর করতে হলে অপরাধীকে লক্ষ্যবস্তু করতে হবে, পরিচয়কে নয়। তাছাড়া আইন এমনভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যা জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের শর্ত মান্য করে।
মাহফুজ পারভেজ। ছবি: সংগৃহীত
পাহাড়ি রাজনীতির ভেতরেও কি সংকটের উৎস নেই?
দ্বিতীয় প্রশ্নটি নির্দেশিত হয় পাহাড়ি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংগঠনগুলোর দিকে। প্রায়ই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একক রাজনৈতিক ইচ্ছা ও অভিন্ন স্বার্থের অঞ্চল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বমসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সামাজিক অবস্থান ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এক নয়। একই জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। শান্তিচুক্তির বিরোধিতা, চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে ভিন্ন অবস্থান এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা সংঘাতের রাজনীতিকে জটিল করেছে।
যদি কোনো সংগঠন নিজেকে একটি জনগোষ্ঠীর একমাত্র প্রতিনিধি দাবি করে, তবে প্রশ্ন উঠবে—ভিন্নমতাবলম্বী পাহাড়ি নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার কোথায়? চাঁদাবাজি, অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ যে পক্ষের বিরুদ্ধেই উঠুক, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি জনগণের নিরাপত্তার পরিবর্তে তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে তার রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তবে এই যুক্তির অপব্যবহারও ঠেকাতে হবে। কিছু সশস্ত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ড দিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বা শান্তিচুক্তির দাবি অস্বীকার করা যায় না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতা রাষ্ট্রের চুক্তিগত দায় মুছে দেয় না; আবার রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কোনো সংগঠনকে সহিংসতার অবাধ অনুমতিও দেয় না।
বাঙালি বসতি, ভূমি ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতি
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোর একটি ভূমি। ভূমি এখানে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি পরিচয়, পূর্বপুরুষের স্মৃতি, জীবিকা ও সামাজিক কর্তৃত্বের ভিত্তি। অতীতের পুনর্বাসন ও জনবসতি পরিবর্তনের নীতির ফলে ভূমির মালিকানা এবং জনমিতিক ভারসাম্য নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তা প্রজন্মান্তরে অবিশ্বাসকে টিকিয়ে রেখেছে। জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ২০২২ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ঘাটতি, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির অসম্পূর্ণতা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে অগ্রগতির অভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
এখানে প্রশ্ন হতে পারে: রাষ্ট্র কি ভূমি ও জনসংখ্যার বিরোধকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখতে পারে? আবার অন্য প্রশ্নটিও জরুরি: বসতি স্থাপনকারী বাঙালি পরিবারগুলোর বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যেককে কি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় নীতির জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা যায়?
দুটির উত্তরই সতর্কতার দাবি রাখে। কোনো জনগোষ্ঠীকে সামষ্টিক অপরাধী বানানো অন্যায়; একই সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ভূমির দাবি উপেক্ষা করাও ন্যায়সংগত নয়। বসতি স্থাপনকারী বাঙালি পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমি-অধিকার পুনর্বিবেচনা পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ যাচাই, কার্যকর ভূমি কমিশন, ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি এবং উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য আপিলের ব্যবস্থা।
শান্তিচুক্তি কেন শান্তির নিশ্চয়তা হয়ে উঠল না?
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি ছিল সশস্ত্র সংঘাত থেকে রাজনৈতিক সমাধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত। আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ—এসব প্রশ্নে অগ্রগতির ঘাটতি শান্তিপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করেছে।
এখানে রাষ্ট্রের পক্ষে যুক্তি হতে পারে, চুক্তির সব বিধান বাস্তবায়ন প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে সময়সাপেক্ষ; নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও বিবেচ্য। কিন্তু ‘জটিলতা’ যদি দশকের পর দশক রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার ব্যাখ্যা হয়ে থাকে, তাহলে তা আর যথেষ্ট যুক্তি নয়। একইভাবে, চুক্তির বিরোধিতাকারী পক্ষগুলোর আপত্তি শুনতে হবে, কিন্তু তাদের আপত্তিকে চুক্তি বাস্তবায়ন অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দেওয়ার অঘোষিত ভেটোতে পরিণত করা যায় না।
আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য হলো, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে কিছু রাজনৈতিক ও সশস্ত্র শক্তি নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার সুযোগ পায়। নিরাপত্তাকেন্দ্রিক প্রশাসন, স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো কিংবা সশস্ত্র সংগঠন—কোনো পক্ষই যদি অস্থিতিশীলতার মধ্যে সুবিধা পায়, তবে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রণোদনা দুর্বল হতে পারে। এটি কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণিত সর্বজনীন অভিযোগ নয়; বরং সংঘাত বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: কারা শান্তি থেকে লাভবান হবে, আর কারা বিদ্যমান অস্থিরতায় নিজেদের ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা করে?
অস্থিরতার চক্র ভাঙবে কীভাবে?
পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা বারবার ফিরে আসে, কারণ এখানে সংকটের উপসর্গ সামাল দেওয়ার উদ্যোগ তুলনামূলক দৃশ্যমান হলেও সংঘাতের রাজনৈতিক ভিত্তি ও শিকড় উপড়ে সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার পন্থা ও ধারাবাহিকতা অত্যন্ত দুর্বল। একটি সহিংস ঘটনা ঘটে; নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়; পাল্টা অভিযোগ ও প্রতিশোধের আশঙ্কা বাড়ে; জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস গভীর হয়; তারপর পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও মূল বিরোধ অমীমাংসিত থেকে যায়। পরবর্তী কোনো ঘটনা আবার সেই জমে থাকা ক্ষোভকে উসকে দেয়। এই চক্র ভাঙতে অন্তত পাঁচটি পদক্ষেপ জরুরি:
এক. শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ: কোন বিধান কখন, কোন প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করবে—তা প্রকাশ করতে হবে এবং অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
দুই. ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর স্বাধীনতা: ভূমি কমিশনকে প্রয়োজনীয় বিধি, জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দিয়ে কার্যকর করতে হবে। অভিযোগ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা এবং ন্যায়সংগত আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিন. নিরাপত্তা ও জবাবদিহির সমন্বয়: সশস্ত্র গোষ্ঠীর অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে; একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী বা বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
চার. অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ: পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভেতরের বহুমত, নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং বাঙালি বাসিন্দাদের বৈধ উদ্বেগ—সবকিছুকে আলোচনায় আনতে হবে। কোনো একটি সংগঠন বা গোষ্ঠীকে পুরো অঞ্চলের একমাত্র কণ্ঠ ধরে নেওয়া যাবে না।
পাঁচ. শুধু উন্নয়ন নয়, অধিকারসম্মত উন্নয়ন: সড়ক, পর্যটন, বিদ্যুৎ বা অবকাঠামো উন্নয়ন তখনই শান্তির সহায়ক হবে, যখন স্থানীয় মানুষের ভূমি, জীবিকা, পরিবেশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও মানুষের মর্যাদা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে একদিকে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের ফল, অন্যদিকে রাষ্ট্রের একতরফা নিপীড়নের ফল বলে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। এখানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-দায়িত্ব বাস্তব, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা বাস্তব, ভূমি ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ক্ষোভও বাস্তব। এসবের কোনো একটিকে অস্বীকার করে টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রেখেই পার্বত্য জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয়, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব। বরং এ কাজ যত সফল হবে, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তত শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে এ কথা মনে রাখা দরকার যে, শুধু নিজের পছন্দের পক্ষের যুক্তি শুনলেই সত্যের কাছে পৌঁছানো যায় না। বরং সত্যের সন্ধানে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে হবে, পাহাড়ি নেতৃত্বকে প্রশ্ন করতে হবে, সশস্ত্র সংগঠনকে প্রশ্ন করতে হবে, বসতি স্থাপন ও ভূমি-রাজনীতির ইতিহাসকেও প্রশ্ন করতে হবে। কিন্তু প্রশ্নের লক্ষ্য কোনো জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করা নয়, সত্যের সন্ধান ও সমস্যার সমাধান। লক্ষ্য হওয়া উচিত, পাহাড়ে এমন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করা, যেখানে কারও নিরাপত্তা অন্যের অধিকার হরণের ওপর নির্ভর করবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তির পরীক্ষা সেখানেই নিহিত।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।