উন্নত জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য পরিচিত অস্ট্রেলিয়ায় খাদ্য অনিশ্চয়তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটিতে গত এক বছরে প্রায় ৩৬ লাখ পরিবার পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় এক লাখ। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ এখন শুধু নিম্নআয়ের মানুষ নয়, মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী পরিবারগুলোর ওপরও পড়ছে।
ফুডব্যাংক অস্ট্রেলিয়ার প্রকাশিত ‘হাঙ্গার রিপোর্ট ২০২৬’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত সোমবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার প্রতি তিন পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার গত ১২ মাসে কোনো না কোনো ধরনের খাদ্য অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।
খাদ্য অনিশ্চয়তা বলতে শুধু না খেয়ে থাকা বোঝায় না। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করতে না পারা, পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত সস্তা বিকল্প বেছে নিতে বাধ্য হওয়া কিংবা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও এর অন্তর্ভুক্ত।
জরিপে বলা হয়েছে, খাদ্য অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া পরিবারগুলোর ৬৯ শতাংশ গত এক বছরের মধ্যেই প্রথমবার এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা পেয়েছে। অর্থাৎ নতুন নতুন পরিবারও এই সংকটের মুখে পড়ছে।
চাকরি থাকলেও বাড়ছে আর্থিক চাপ
ফুডব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, বার্ষিক ৩৩ হাজার ৮০০ থেকে ৯০ হাজার ৯৯৯ অস্ট্রেলীয় ডলার আয় করা পরিবারগুলোর ৩৭ শতাংশ গত এক বছরে খাদ্য অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে ২৩ শতাংশ গুরুতর খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
ফুডব্যাংক অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী কাইলিয়া টিঙ্ক জানিয়েছেন, বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন ও অন্য অপরিহার্য খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে খাবারের বাজেটে কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
তার মতে, আর্থিক চাপ বাড়লে পরিবারগুলো প্রথমে বাসস্থান, জরুরি বিল এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের খরচকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে খাবারের জন্য বরাদ্দ অর্থের ওপর চাপ পড়ে।
জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী পরিবার প্রধানদের ৪৮ শতাংশ খাদ্য অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ভাড়াটিয়া পরিবারগুলোর মধ্যে এই হার ৫১ শতাংশ। বিপরীতে সম্পূর্ণ নিজস্ব বাড়িতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে এই হার ১২ শতাংশ।
সন্তান রয়েছে এমন পরিবারগুলোর ৪৫ শতাংশ এবং একক অভিভাবকের পরিবারগুলোর ৬০ শতাংশ গত এক বছরে খাদ্য অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা পেয়েছে।
খরচ সামলাতে কেনাকাটার অভ্যাস বদলাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরাও
অস্ট্রেলিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসী পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনেও।
সিডনিতে পরিবার নিয়ে বসবাসরত বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রাহা জাফরিন পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করেন। তার স্বামী পূর্ণকালীন চাকরিজীবী। ছয় বছরের সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে বাসা ভাড়া, বাজার এবং সন্তানের প্রয়োজনীয় খরচ সামলাতে হচ্ছে তাদের।
অস্ট্রেলিয়ার একটি সুপারমার্কেট। দেশটিতে ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামলাতে কেনাকাটার অভ্যাস বদলাচ্ছে অনেক পরিবার। ছবি: নভোনীল রহমান
রাহা জাফরিন এই প্রতিবেদকে জানান, গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে তার পরিবারের জন্য সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছে বাসা ভাড়া বৃদ্ধি।
সন্তানের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনা ও অন্য প্রয়োজনের খরচও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় তাদের পারিবারিক বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাহা জাফরিন জানান, আয় কিছুটা বাড়লেও বাসাভাড়া ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খরচ বৃদ্ধির কারণে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি হিসাব করে সংসার চালাতে হচ্ছে।
বাজারের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেনাকাটার অভ্যাসেও পরিবর্তন এনেছেন তিনি। আগে প্রয়োজনের বাইরে বিভিন্ন পণ্য কেনা হলেও এখন শুধু প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। খাবার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত কেনাকাটাও কমিয়ে দিয়েছেন।
একই পণ্য কোন দোকানে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, তা যাচাই করে কেনাকাটা করেন তিনি। প্রয়োজনের বাইরে খরচ কমানো এবং অপচয় এড়িয়ে চলাই এখন তার পরিবারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায়।
রাহা জাফরিনের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কীভাবে একটি প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবার নিজেদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আনছে। নিয়মিত আয় থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে তাদের এখন আগের তুলনায় বেশি পরিকল্পনা করে চলতে হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির কেন্দ্রস্থলে রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার প্রধান কার্যালয়ের পাশ দিয়ে পথচারীদের সঙ্গে ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন এক কর্মী। ৭ মার্চ ২০১৭। ফাইল ছবি: রয়টার্স
অতিরিক্ত আয়ের সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানির খরচও
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ শুধু বাসা ভাড়া ও নিত্যপণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
রাহা জাফরিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার স্বামী পূর্ণকালীন চাকরির পাশাপাশি উবার ইটসে খাবার সরবরাহের কাজ করেন। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত এই কাজের পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে।
রাহার অভিজ্ঞতায়, আগে কোনো কোনো সময় লিটারপ্রতি প্রায় ১ ডলার ৩০ সেন্টে পেট্রল কেনা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে কোথাও কোথাও দাম আড়াই ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ফলে খাবার সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত গাড়ির জ্বালানির পেছনে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত কাজ থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ পরিবহন খরচেই চলে যাচ্ছে।
বাসা ভাড়া, বাজার, স্বাস্থ্যবিমা ও সন্তানের খরচের পাশাপাশি জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ও পরিবারের সামগ্রিক বাজেটে চাপ তৈরি করছে।
অস্ট্রেলিয়ার আঞ্চলিক এলাকাতে সংকট আরও গুরুতর
ফুডব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার আঞ্চলিক এলাকাগুলোতে গুরুতর খাদ্য অনিশ্চয়তার হার বড় শহরগুলোর তুলনায় বেশি।
আঞ্চলিক এলাকায় প্রায় ২৩ শতাংশ পরিবার গুরুতর খাদ্য অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা পেয়েছে। অন্যদিকে বড় শহরগুলোতে এই হার ১৮ শতাংশ।
খাদ্যপণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং সীমিত আয়ের কারণে অনেক পরিবারকে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খাবারের বাজেট নিয়েও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সরকারি সহায়তা
খাদ্যসংকট মোকাবিলায় চলতি অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার অতিরিক্ত ৭ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার জরুরি সহায়তা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে।
ফুডব্যাংক এই অর্থায়নকে স্বাগত জানালেও জানিয়েছে, শুধু সাময়িক খাদ্যসহায়তা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সব শিশুর জন্য বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর সকালের খাবার নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে তিন হাজার ৬৪৯টি বিদ্যালয়ে ফুডব্যাংকের সকালের খাবার সরবরাহের কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি তিনটি পরিবারের একটি খাদ্য অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া দেশটির ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রাহা জাফরিনের অভিজ্ঞতা এই অর্থনৈতিক চাপের আরেকটি বাস্তব দিক সামনে এনেছে। নিয়মিত চাকরি ও অতিরিক্ত আয়ের চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও বাসা ভাড়া, বাজার, সন্তানের প্রয়োজন ও পরিবহন ব্যয় সামলাতে অনেক পরিবারকে দৈনন্দিন খরচ নতুন করে পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।