আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের যে বক্তব্যটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে, সেটি হলো ‘ক্রসফায়ার’। এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘বন্দুকযুদ্ধ’।
যুদ্ধ হয় দুই পক্ষের মধ্যে। কিন্তু এখানে একপক্ষই যুদ্ধ সাজায়, নিশানা ঠিক করে এবং অস্ত্র ব্যবহার করে। আইনে ক্রসফায়ার বলে কিছু নেই। তবে আত্মরক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। যদিও আইন লঙ্ঘন করেই অতীতে ‘ক্রসফায়ার’ চলেছে যত্রতত্র। ফলে আইজি যখন ‘প্রয়োজনে’ ‘ক্রসফায়ার’ করার কথা বললেন, তখন সঙ্গত কারণেই প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইজির বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, সরকার এ বিষয়ে জিরো টলারেন্সের অবস্থানে আছে। অর্থাৎ তারা কোনো অবস্থায় ‘ক্রসফায়ার’ অনুমোদন করবেন না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আরেক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, আইজিপির বক্তব্যে সরকার বিব্রত। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মীদের আচরণে যে সরকার বিব্রত সে কথাটি তিনি বলেননি।
জনমনে প্রশ্ন জেগেছে, বিএনপির সরকারের ৮ মাসের মাথায় আইজিপিকে ‘ক্রসফায়ার’–এর কথা চিন্তা করতে হলো কেন? তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। খুলনায় পুলিশ দপ্তর থেকে রাতের বেলায় পুলিশ সদস্যদের একা না চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার কয়েক দিনের মাথায় আলী হোসেন ফকির আইজিপির দায়িত্ব নেন। সেক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা ভালো হলে যেমন তার কৃতিত্ব তিনি নিতে পারতেন, খারাপের দায়ভারও তাকে নিতে হবে। আইজিপি যে মন্তব্য কনরেছেন, তাতে তার অসহায়ত্বই প্রকাশ পেয়েছে। তিনি আরও যোগ করেছেন, “পুলিশ লাঠিপেটা করলে তাকে ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’ বলা হয়, আর নীরব থাকলে বলা হয় দুর্বল পুলিশ।”
আমরা যেমন পুলিশকে দুর্বল দেখতে চাই না তেমনি অপরাধ দমনের নামে কাউকে ধরে আনতে বললে বেধে আনবেন, সেটাও প্রত্যাশিত নয়। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতির জন্য চিহ্নিত অপরাধীদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণির নেতা–কর্মীও দায়ী। উদ্বেগের কথা হলো, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে সরকারি দলের বিভিন্ন পদাধিকারীর কাছ থেকে বাধা আসে। কেউ বলেন, ‘এরা আমার লোক।’ কেউ বলেন, ‘এরা তার লোক।’ এই অবস্থায় আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনির সদস্যদের পক্ষে ন্যায্যভাবে আইনের প্রয়োগ অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর এখনকার মতো জটিল সময়ে তো বটেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই ফ্যাসিবাদের লোক হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রবণতা কিছুটা কমলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। কোথাও কোথাও তাদের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নাজেহালও হয়েছেন। স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসবে, ক্ষমতাসীনেরা তত বেশি ‘আমার লোক ও তার লোক’ খুঁজতে থাকবেন।
২০০১ সালে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ করেই বিভিন্ন স্থানে দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি–দখলবাজি শুরু হয়। সরকার কোনোভাবেই মোকাবিলা করতে পারছিল না। এক পর্যায়ে অপারেশন ক্লিন হার্ট নামে যৌথ অভিযান চালাতে হয়। যার প্রধান লক্ষবস্তু ছিলেন সরকারি দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা–কর্মীরা। আজ র্যাব নামের বাহিনীটি (পরিবর্তিত নাম এসআরবি) প্রচুর বদনামের ভাগিদার হয়েছে, তার সূচনাও বিএনপির আমলে। আওয়ামী লীগ আমলে র্যাবের বাড়াবাড়ি মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞাও জারি করে। এর অর্থ এই নয় যে বিএনপির আমলে তারা ‘শান্তশিষ্ট সুবোধ বালক’ ছিল।
অতীতে কোনো সরকারই আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করতে চায়নি। তাদের প্রয়োজনীয় সমর্থনও দেয়নি। বরং সবাই বিকল্প বাহিনী গঠন করেছে। স্বাধীনতার পর যেমন রক্ষী বাহিনী গঠন করা হয়েছিল, তেমনি দুই হাজার দুই সালে র্যাব। এই সব বিকল্প বাহিনী গঠন করে মূলত সরকার পুলিশের প্রতি একধরনের অনাস্থা প্রকাশ করেছে। অওয়ামী লীগ আমলে ক্রসফায়ার নিয়ে পুলিশ ও র্যাবের মধ্যে প্রতিযোগিতাও লক্ষ্য করেছি।
এবারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ২০০১ ও ২০০২ এর মতো অতোটা নাজুক না হলেও খুব ভালো বলার সুযোগ নেই। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোধাও থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যকার কোন্দল–সংঘর্ষের খবর আসছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো নাটোরের ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনার সঙ্গে এমপি আবুদল আজিজের পুত্র নুরুজব্জামান মিন্টুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে তিন দিনের রিমান্ডেও নিয়েছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলামকে ১৪ অক্টোবর রাতে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে তার মৃত্যু হয়। শাকিল হত্যার ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছেলে নূরুজ্জামানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ সোমবার রাতেই তাকে আটক করে। পরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত ১ আগস্ট বাংলা জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়: গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় পৃথক ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৩৮ জন নেতা–কর্মী নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পূর্ববিরোধ, চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য ও অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সময়ে দেশে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত দুই মাসের পরিসংখ্যান নিলে এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে। ২০ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির একশ্রেণির নেতা–কর্মীর মধ্যে বেপরোয়া ভাব লক্ষ্য করছি। জন্ম থেকে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। জামায়াত ও এনসিপি নামে যে দুটি বিরোধী দল আছে, তারা বড় বড় কথা বললেও মাঠে বিএনপির সঙ্গে টিকতে পারছে না। অতএব স্থানীয় পর্যায়ে মারামারিটা হচ্ছে বিএনপির মধ্যেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মোট এক হাজার ৯১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত নিহত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৩৮ নেতা–কর্মীর মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের ৮ জন, ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন এবং তাঁতীদলের একজন রয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬১০টি ঘটনার মধ্যে ৫৭৩টিই ক্ষমতাসীন বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ অথবা বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন, জামায়াতের চারজন, আওয়ামী লীগের একজন এবং অন্যান্য দলের তিনজন রয়েছেন। এ সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৯৪টি ঘটনায় আহত হন এক হাজার ৫৮৫ জন এবং নিহত হন ২৪ জন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে সাতজন, বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন।
এই মুহূর্তে সরকারের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া। খাদ্যপণ্যের বাজারের উর্ধ্বগতি। বেকারত্ব। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা। আর কাজটি শুরু করতে হবে ‘আপনি আচরি ধর্ম’ ক্ষমতাসীনদের দিয়ে। অর্থাৎ আগে দলের লোক ঠিক করতে পারলে দেশও ঠিক হবে । আর যদি নাটোরের তো আত্মঘাত চলতে থাকে, তখন ক্রসফায়ার কেন এর চেয়ে বড় ওষুধও কাজে আসবে না।
লেখক: সম্পাদক, চরচা