স্লোগান ঘিরে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় একটি প্রশ্ন সামনে আসে। আর তা হলো, সমস্যা স্লোগানের উচ্চারণে, নাকি অপব্যবহারে? কারণ, রাজনীতির মাঠ-ময়দানে উচ্চারিত একটি স্লোগান কখনো কেবল কয়েকটি শব্দের সমষ্টি নয়: ইতিহাস, আবেগ, পরিচয়, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং কখনো কখনো মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘জয় বাংলা’ তেমনই একটি স্লোগান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এটি ছিল প্রতিরোধ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় মুক্তির রণধ্বনি। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে লড়াইরত মানুষের কাছে স্লোগানটি ছিল সাহস ও ঐক্যের প্রকাশ।
কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরের দৃশ্যমান সত্য হলো, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—‘জয় বাংলা’ বললেই কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে কেন? আবার একই সঙ্গে এমন প্রশ্নও আছে যে, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী যদি এই স্লোগানকে ব্যবহার করে নিজেদের অপরাধ, দুর্নীতি কিংবা কর্তৃত্ববাদী রাজনীতিকে আড়াল করতে চান, তাহলে সেটি কি গ্রহণযোগ্য?
ফলে স্লোগান ও গ্রেপ্তার নিয়ে একটি চাপা-বিতর্ক বেশ জমে ওঠেছে। মূল বিতর্ক হলো, সমস্যা কি স্লোগানে, নাকি স্লোগানের রাজনৈতিক ব্যবহার ও অপব্যবহারে?
একটি বহুত্ববাদী, অংশগ্রহণমূলক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র যদি শব্দের ভিত্তিতে নাগরিককে অপরাধী চিহ্নিত করতে শুরু করে, তাহলে একসময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। আবার রাজনৈতিক দল যদি জাতীয় ইতিহাসের প্রতীককে নিজেদের একচ্ছত্র সম্পত্তি বানিয়ে ফেলে, তাহলে জাতীয় ঐক্যের জায়গায় দলীয় বিভাজন তৈরি হয়।
‘জয় বাংলা’: ইতিহাসের সম্পদ, কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়
‘জয় বাংলা’ শব্দবন্ধের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতায় ‘জয় বাংলা’ শব্দের প্রথম ব্যবহারের কথাও জানা যায়। শব্দবন্ধটিকে বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে শক্তিশালী রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়, যা স্লোগানটিকে ঐতিহাসিক মর্যাদা দেয়।
তবে একটি ঐতিহাসিক সত্য মনে রাখা দরকার: কোনো রাজনৈতিক দল একটি স্লোগানকে জনপ্রিয় করেছে বা দীর্ঘদিন ব্যবহার করেছে বলেই সেটির ওপর তার একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। ‘জয় বাংলা’ দলীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয় সীমানার চেয়ে অনেক বড়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক, সাধারণ নাগরিক এবং পরবর্তী প্রজন্ম—সবারই এই ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে: স্লোগানের ঐতিহাসিক উৎস ও রাজনৈতিক ব্যবহার এক বিষয় আর তার নাগরিক ও জাতীয় তাৎপর্য আরেক বিষয়। কোনো স্লোগান একটি দলের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হতে পারে, কিন্তু তাতে তার সর্বজনীন ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিলুপ্ত হয় না। তাই ‘জয় বাংলা’কে কেবল দলীয় সম্পত্তি হিসেবে দেখা যেমন ইতিহাসকে সংকুচিত করে, তেমনি বিশেষ দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে স্লোগানটির ঐতিহাসিক মর্যাদা অস্বীকার করাও যুক্তিসংগত নয়।
স্লোগান কি অপরাধের প্রমাণ?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই বিতর্ককে আরও জরুরি করে তুলেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানের পর ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের অভিযোগে স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর আদালত তাদের জামিন আবেদন নাকচ করেন। অন্যদিকে, ২৬ মার্চ সুনামগঞ্জে স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা ও গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।
এই ঘটনাগুলো থেকে সরাসরি বলা যাবে না যে প্রত্যেক গ্রেপ্তারের একমাত্র কারণ স্লোগান। কোথাও নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম, কোথাও বিশৃঙ্খলা বা অন্য অপরাধের অভিযোগও পুলিশের বক্তব্যে এসেছে। কিন্তু এখানেই আইনের শাসনের মৌলিক প্রশ্ন: অভিযোগের ভিত্তি কি সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, নাকি কোনো বেআইনি রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা কিংবা কেবল একটি স্লোগান উচ্চারণ? এক্ষেত্রে অভিযোগের স্বচ্ছ প্রমাণ না থাকলে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে এবং নাগরিক স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্তও তৈরি হতে পারে। এতে এমন প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ থাকবে—রাষ্ট্র কি নাগরিকের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত আইনভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা নেবে?
ধর্মীয় স্লোগান ও দ্বিমুখী রাজনৈতিক নৈতিকতা
স্লোগান ও গ্রেপ্তার বিতর্কের আরেকটি দিক ধর্মীয় স্লোগান। অতীতে ধর্মীয় স্লোগান, ইসলামি ইমেজের ব্যবহার, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত প্রকাশের অভিযোগে মানুষকে হয়রানি ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় স্লোগানকে উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের সঙ্গে একাকার করে দেখার প্রবণতা দেখা গেছে। আবার ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কিংবা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টাও রাজনীতির ইতিহাসে রয়েছে।
এখানে নীতিগত অবস্থানটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। ধর্মীয় স্লোগান উচ্চারণ করলেই কেউ জঙ্গি বা অতি-পবিত্র হয়ে যায় না। আবার ‘জয় বাংলা’ বললেই কেউ ফ্যাসিবাদী বা গণতন্ত্রের রক্ষক হয়ে যায় না। আসল বিষয় হওয়া উচিত: ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের অপরাধকে সমর্থন করা যেমন নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ব্যবহার করে কর্তৃত্ববাদ, দুর্নীতি, দমন-পীড়ন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করাও সমানভাবে নিন্দনীয়। বস্তুতপক্ষে, স্লোগান মানুষের বিশ্বাস, আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করতে পারলেও তা কোনো ব্যক্তির নৈতিক চরিত্রের সনদ নয়। ধর্মীয় পরিচয় অপরাধের দায়মুক্তি দেয় না, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও রাজনৈতিক অপরাধের দায়মুক্তি দেয় না। একইভাবে, কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক স্লোগানের সঙ্গে অতীতে অপরাধী বা কর্তৃত্ববাদী শক্তির সম্পর্ক থাকলেও সেই স্লোগান উচ্চারণকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে ঢালাও অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কারণ, ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি হলো, ব্যক্তির দায় ব্যক্তির কাজ দিয়ে নির্ধারিত হবে, তার উচ্চারিত শব্দ বা অনুমিত রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে নয়।
স্লোগানের মালিকানা নিয়ে রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতা হলো—প্রায়-প্রতিটি দলই জাতীয় ইতিহাস, ধর্মীয় আবেগ ও সাংস্কৃতিক প্রতীককে নিজেদের রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে চায়। কিছু দল ‘জয় বাংলা’কে দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ধর্মীয় স্লোগানকে নিজেদের আদর্শিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে জাতীয় ও ধর্মীয় প্রতীক অনেক সময় দলীয় মালিকানার বিষয় এবং দলীয় প্রতিযোগিতার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু রাজনৈতিক কৌশলের সমস্যা নয়, জাতীয় চেতনারও সংকট। যে স্লোগান মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি করার কথা, সেটিই যদি দলীয় বিভাজনের চিহ্ন হয়ে ওঠে, তাহলে তার ঐতিহাসিক ও নৈতিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত, বিভক্ত, ভঙ্গুর ও আক্রান্ত হয়।
প্রসঙ্গত, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এটি সত্য। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় এর তাৎপর্য দলীয় গণ্ডি অতিক্রম করেছিল এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম কোনো একটি দলের একক সম্পত্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, শ্রেণি, পেশা ও বিশ্বাসের মানুষ অংশ নিয়েছেন। অতএব, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্লোগানকে দলীয় পরিচয়ের বাইরে জাতীয় ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসংগত। তাছাড়া, আওয়ামী লীগের প্রতি যে সমালোচনা ও প্রশ্ন সর্বাধিক, তা হলো, যে স্লোগানকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক বলা হয়, সেটিকে দীর্ঘদিন দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা হয়েছিল কেন? কোনো নাগরিক ‘জয় বাংলা’ বললে তাকে আওয়ামী লীগের সমর্থক ধরে নিয়ে ‘সাত খুন মাফ‘ করে দেওয়া যেমন ভুল, তেমনি কোনো আওয়ামী লীগবিরোধী ব্যক্তি স্লোগানটি উচ্চারণ করলে তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অযৌক্তিক।
একই প্রশ্ন ধর্মীয় স্লোগানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় স্লোগান উচ্চারণ করলেই তিনি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা উগ্রবাদী মতাদর্শের অনুসারী হয়ে যান না। কারণ, ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ এবং ধর্মের নামে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এক জিনিস নয়।
গণতন্ত্রে স্লোগান নিয়ন্ত্রণের সীমা কোথায়?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে যা খুশি বলার অবাধ অনুমতি নয়। কেউ যদি স্লোগানের আড়ালে সহিংসতার উসকানি দেয়, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ায়, হামলা সংগঠিত করে, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কিংবা আইনত নিষিদ্ধ সংগঠনের অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে রাষ্ট্রের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু স্লোগানের শব্দগুলো অপছন্দনীয়, রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর কিংবা কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে সম্পর্কিত—এগুলো একা গ্রেপ্তারের যথেষ্ট ভিত্তি হতে পারে না।
এখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও আইনের শাসনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে রাখা দরকার। প্রথমত, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক মতাদর্শ বা পরিচয় নয়, তার সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। কেবল একটি স্লোগান উচ্চারণের কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে এটাও ব্যাখ্যা করতে হবে—কোন সুনির্দিষ্ট আইন ভঙ্গ হয়েছে, কী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং সেই অপরাধের প্রমাণ কী?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক, বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করেও আইন দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের সুযোগও রেখেছে। অর্থাৎ, স্বাধীনতা যেমন সীমাহীন নয়, তেমনি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতাও সীমাহীন নয়।
‘জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল কি না, সেটিও আলাদা আইনি প্রশ্ন। ২০২০ সালে হাইকোর্ট স্লোগানটিকে জাতীয় স্লোগান ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ সেই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। ফলে বর্তমান আইনি অবস্থায় এটিকে আদালতের কার্যকর আদেশে ঘোষিত জাতীয় স্লোগান হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। তবে এই আইনি অবস্থান স্লোগানটি উচ্চারণের সাংবিধানিক স্বাধীনতা বা ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নিজে থেকে বাতিল করে না। অর্থাৎ, জাতীয় স্লোগানের সরকারি মর্যাদা এবং নাগরিকের স্লোগান উচ্চারণের স্বাধীনতা দুটি পৃথক বিষয়। একটিকে অন্যটির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
‘ফ্যাসিবাদবিরোধিতা’ কি নতুন অসহিষ্ণুতার বৈধতা?
গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক দমন, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ সেই পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করেছে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিলেই তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার বাতিল হয়ে যায় না।
একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ ও সীমাবদ্ধ হতে পারে। অপরাধে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণের পরিবর্তে তার স্লোগান, অতীত রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগকে অপরাধের বিকল্প প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
এখানে বর্তমান সরকারের সামনে একটি নৈতিক পরীক্ষা রয়েছে। অতীতে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিবাদ করেছে, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি সেই একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে পরিবর্তনের অর্থ কী? আওয়ামী লীগ আমলে ধর্মীয় স্লোগানকে সন্দেহের চোখে দেখার যে অভিযোগ ছিল, তার বিপরীতে এখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে সন্দেহের চোখে দেখা হলে সেটিও একই ধরনের অসহিষ্ণুতার প্রকাশ হতে পারে। কারণ, রাজনৈতিক প্রতিশোধ গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচার নামে পরিচিত হয় না এবং অতীতের অন্যায়কে নতুন অন্যায়ের অনুমতিপত্র বানানো যায় না।
তাহলে করণীয় কী?
প্রথমত, জাতীয় ও ধর্মীয় স্লোগানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের একটি সমানাধিকারভিত্তিক নীতি থাকা প্রয়োজন। ‘জয় বাংলা’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ কিংবা ধর্মীয় স্লোগান—কোনোটিই কেবল উচ্চারণের কারণে অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় প্রতীক ও ঐতিহাসিক স্মৃতির দলীয় একচেটিয়াকরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। আবার ধর্মীয় বিশ্বাসও কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের একচেটিয়া কর্তৃত্বাধীন নয়।
তৃতীয়ত, স্লোগানের আড়ালে সহিংসতা, বিদ্বেষ, দুর্নীতি কিংবা অপরাধ সংগঠিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু স্লোগান উচ্চারণ এবং অপরাধ সংঘটনকে এক করে দেখা যাবে না।
চতুর্থত, গ্রেপ্তার ও মামলা পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, কাউকে কোন অপরাধের অভিযোগে আটক করা হচ্ছে। আদালতকে অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাজনৈতিক চাপ বা জনতার আবেগ যেন আইনি প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ না করে।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের কর্মীদেরও এই শিক্ষা দেওয়া—কোনো জাতীয় বা ধর্মীয় স্লোগান ব্যবহার করে অন্যের মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। স্লোগানের স্বাধীনতা যেমন নিজের জন্য দাবি করা হবে, তেমনি প্রতিপক্ষের জন্যও স্বীকার করতে হবে।
স্লোগানের শব্দ নয়, অপরাধের বিচার হোক
একটি সভ্য রাষ্ট্রে স্লোগান নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, রাজনৈতিক সমালোচনা হতে পারে, ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু স্লোগান উচ্চারণকে অপরাধের সমার্থক বানানো বিপজ্জনক। ‘জয় বাংলা’ বললেই কেউ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রকৃত ধারক হয়ে যান না। আবার ‘জয় বাংলা’ বলার কারণে কেউ অপরাধীও হয়ে যান না। একইভাবে, ধর্মীয় স্লোগান উচ্চারণ করলেই কেউ ধার্মিকতার আদর্শিক প্রতিনিধি হয়ে যান না, আবার তাকে জঙ্গি বলারও সুযোগ থাকে না।
একাত্তরে ধর্মের নাম ব্যবহার করে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধকে সমর্থন করেছিল, তাদের বিচার করতে হবে তাদের অপরাধের জন্য। আর মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ব্যবহার করে যারা দুর্নীতি, দমন-পীড়ন ও কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেছে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে তাদের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য। কোনো স্লোগান কাউকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না; আবার কোনো স্লোগান নিজেই অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না।
ঐতিহাসিক ঘটনাক্রমে ও রাজনৈতিক পরম্পরায় স্লোগান মানুষের কণ্ঠে জন্ম নেয়। ফলে স্লোগানের ঐতিহাসিক অর্থ কোনো দলের দপ্তরে বন্দি থাকে না। জাতীয় স্লোগানকে দলীয় সম্পত্তি বানানো যেমন সংকীর্ণতা, তেমনি রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণে তা উচ্চারণ নিষিদ্ধ করার চেষ্টা অসহিষ্ণুতা। একইভাবে, ধর্মীয় স্লোগানকে সহিংসতার ঢাল বানানো যেমন অনৈতিক, তেমনি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশকে অপরাধের সঙ্গে একাকার করাও অন্যায়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষের কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণ করা নয়: মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অপরাধের বিচার হোক, অপরাধীর বিচার হোক—স্লোগানের নয়।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষের কণ্ঠ স্তব্ধ করার মধ্যে নিহিত নয়, বরং নিজের অপছন্দের কণ্ঠকেও আইনের সুরক্ষার মধ্যে রাখার সক্ষমতায় নিহিত। ‘জয় বাংলা’ হোক কিংবা ধর্মীয় কোনো স্লোগান—কোনোটিই যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র অথবা দলীয় কর্তৃত্বের হাতিয়ার না হয়। বাংলাদেশের জন্য স্লোগানের যুদ্ধ নয়, প্রয়োজন নাগরিক অধিকারের সংস্কৃতি। প্রয়োজন স্লোগান বা শব্দ নয়, অপরাধের বিচার।
লেখক: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।