সুপারমার্কেট থেকে দুই শতাংশ চর্বিযুক্ত দুধের একটি বোতল কেনার সময় সাধারণত কেউ আন্তর্জাতিক রাজনীতির কথা ভাবেন না। ক্রেতার প্রত্যাশা থাকে, বোতলের গায়ে যা লেখা আছে, ভেতরের পণ্যও ঠিক তা-ই হবে। কিন্তু এই সাধারণ আস্থার পেছনেও রয়েছে আন্তর্জাতিক নিয়ম, মান নির্ধারণ এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের একটি বিস্তৃত কাঠামো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার শক্তি শুধু যুদ্ধ প্রতিরোধ, বিশ্বশান্তি কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মতো বড় অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অসংখ্য সাধারণ সিদ্ধান্তে।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বলতে দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনার নিয়ম, রীতিনীতি ও মানদণ্ডের সমষ্টিকে বোঝায়। এই নিয়মগুলোর অনেকগুলোই দৃশ্যমান নয়, কিংবা সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে না। অথচ পণ্য কেনাবেচা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং ভোক্তার অধিকার রক্ষায় এগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দুধের বোতলে চর্বির পরিমাণ দুই শতাংশ লেখা থাকলে ক্রেতা সেটি বিশ্বাস করতে পারেন, কারণ পণ্যের উপাদান পরিমাপ ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বীকৃত মানদণ্ড রয়েছে। আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলো এসব নিয়ম প্রতিষ্ঠা ও সমন্বয়ে ভূমিকা রাখে।
যেমন, আন্তর্জাতিক মান সংস্থা বা আইএসওর নির্ধারিত আইএসও ১২১১ এবং আইএসও ৮৯৬৮ মানদণ্ড দুধের চর্বি ও প্রোটিন পরিমাপের পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে। বিভিন্ন দেশের সরকার এসব মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করায় একটি দেশে উৎপাদিত পণ্য অন্য দেশের বাজারেও একই ধরনের তথ্যসহ বিক্রি করা সম্ভব হয়।
এর ফলে বোস্টন, বেইজিং কিংবা বার্লিন—যেখানেই কেউ দুধ কিনুন না কেন, চর্বির পরিমাণ নির্ধারণের পদ্ধতি একই আন্তর্জাতিক মানের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে। এতে ক্রেতা পণ্যের উপাদান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পান এবং নিজের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি চাহিদা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ বাণিজ্যিক সুবিধা। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে নিয়মের সমন্বয়, তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার একটি ব্যবস্থা। এই কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি ভোক্তার দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এ প্রসঙ্গে শ্যাম্পুর উদাহরণ দেওয়া যায়। ভারতের কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত শ্যাম্পু কানাডায় রপ্তানি করলে সেখানে বিক্রির জন্য পণ্যের উপাদান তালিকাভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। ফলে কানাডার ক্রেতা জানতে পারেন, তিনি ঠিক কী কিনছেন। কিন্তু একই পণ্য ভারতে গিয়ে কেনার সময় সেই উপাদানগুলো একইভাবে উল্লেখ করা নাও থাকতে পারে। এখানে আন্তর্জাতিক মানের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নিজস্ব আইন ও বিধিবিধানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পণ্যের তথ্য প্রকাশ, মান নির্ধারণ ও নিয়মের সমন্বয় ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ায়। উৎপাদক জানেন কোন নিয়ম অনুসরণ করতে হবে, আমদানিকারক পণ্যের তথ্য যাচাই করতে পারেন এবং ভোক্তা পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে ধারণা পান। এভাবেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার তুলনামূলকভাবে অদৃশ্য নিয়মগুলো বাণিজ্যকে সচল রাখতে সহায়তা করে।
তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বলতে কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী উদার বিশ্বব্যবস্থাকেই বোঝায় না। ইতিহাসে এর আগেও বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ছিল, যেগুলোর নিজস্ব নিয়ম ও সামাজিক প্রভাব ছিল। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান ও নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই ব্যবস্থার নিয়মগুলো সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর সমান অধিকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি; বরং ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর আধিপত্য বজায় রাখার জন্য কাজ করেছিল। উপনিবেশ বিস্তারকে বড় শক্তি হয়ে ওঠার অধিকার ও দায়িত্ব হিসেবে দেখা হতো।
জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনের দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম কীভাবে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে জাপান কোরিয়ায় পশ্চিমা ধাঁচের কারাগার ও আইনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড ও বেত্রাঘাতের ব্যবহার কমলেও কারাবাস ও জরিমানার ব্যবহার বেড়েছিল। অন্যদিকে, ব্রিটিশ ভারতের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস তাত্ত্বিকভাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও পরীক্ষার স্থান লন্ডনে নির্ধারণের মতো ব্যবস্থা ভারতীয়দের অংশগ্রহণ কঠিন করে তুলেছিল। অর্থাৎ, কোনো ব্যবস্থার নিয়ম বাহ্যিকভাবে নিরপেক্ষ মনে হলেও তার প্রয়োগে ক্ষমতাবান ও অধীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্য বজায় থাকতে পারে।
চীনের ছিং সাম্রাজ্যের ‘তিয়ানশিয়া’ ধারণাও ছিল ভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার উদাহরণ। এর অর্থ ‘স্বর্গের অধীনে সবকিছু’। এই ব্যবস্থায় চীনা সম্রাটকে কেন্দ্র করে একটি স্তরবিন্যস্ত রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, যেখানে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর অবস্থান নির্ধারিত হতো সম্রাটের ক্ষমতা ও প্রভাবের ভিত্তিতে।
এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মতো কঠোর ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। সাম্রাজ্যের শক্তি অনুযায়ী প্রান্তবর্তী অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কখনো দৃঢ়, কখনো দুর্বল হতো। এই ব্যবস্থার প্রভাব চীনের অভ্যন্তরীণ জীবনেও পড়েছিল। মানচু শাসকেরা হান সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের বৈধতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও বিবাহ নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন। শিনজিয়াংয়ে একই সম্প্রদায়ে হান ও অ-হান জনগোষ্ঠীর বসবাসও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো।
ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব মানেই সেটি ন্যায়সংগত বা সবার জন্য সমানভাবে উপকারী নয়। কোনো ব্যবস্থার নিয়ম মানুষের জীবনে সুবিধা তৈরি করতে পারে, আবার বৈষম্য ও নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে শুধু তার ঘোষিত আদর্শ দিয়ে বিচার করলে চলবে না; দেখতে হবে নিয়মগুলো বাস্তবে কার স্বার্থ রক্ষা করছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।
বর্তমান বিশ্বে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এই যুক্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রথম লক্ষণ হয়তো কোনো যুদ্ধ ঘোষণা হবে না; বরং মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যেসব নিয়ম ও মানদণ্ডের ওপর নির্ভর করে, সেগুলোর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ পেতে পারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের জায়গায় নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হলে পণ্যের তথ্য, বাণিজ্যিক স্বচ্ছতা এবং ভোক্তার আস্থার ধরনও বদলে যেতে পারে। ভবিষ্যতে চীন যদি আন্তর্জাতিক নিয়ম নির্ধারণে আরও বড় ভূমিকা নেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—বেইজিংয়ের
প্রভাবাধীন নিয়মের ওপর বিশ্বের মানুষ কতটা আস্থা রাখতে পারবে?
তাই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা দূরের কোনো কূটনৈতিক ধারণা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। দুধের বোতলে লেখা চর্বির পরিমাণের নির্ভরযোগ্যতা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বচ্ছতা—সবকিছুর পেছনে কাজ করে নিয়ম ও মানদণ্ডের একটি বিস্তৃত কাঠামো। সেই কাঠামো টিকিয়ে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার মধ্যে থাকা বৈষম্য ও ক্ষমতার অসমতা চিহ্নিত করাও জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের প্রভাব কেবল রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক কিংবা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; শেষ পর্যন্ত তা পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের বাজার, ভোগ, পছন্দ ও দৈনন্দিন জীবনে।
লেখক: টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো
(এই লেখাটি প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসির সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)