মঙ্গল গ্রহের অতীত সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে সাহারা মরুভূমি থেকে উদ্ধার করা ৪১০ কোটি বছরের পুরনো একটি বিরল উল্কাপিণ্ড। ‘টেঘাজা ০০১’ নামের এই শিলাখণ্ডে এমন কিছু খনিজ ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দেয়, মঙ্গলের জন্মলগ্নে গ্রহটির পরিবেশ বর্তমানের মতো শীতল ও শুষ্ক ছিল না। বরং তখন সেখানে তরল পানির প্রবাহ, অপেক্ষাকৃত ঘন বায়ুমণ্ডল এবং পৃথিবীর মতো কিছু পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকতে পারে। আবিষ্কারটি শুধু মঙ্গলের প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস জানার জন্য নয়, গ্রহটিতে কখনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেই অনুসন্ধানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর বিজ্ঞানীরা এই আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেটিওরিটিকসের পরিচালক ও কিউরেটর কার্ল এজি সাহারা থেকে পাওয়া কয়েকটি উল্কাপিণ্ডের নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়ে টেঘাজা ০০১-এর অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেন। এর গঠন, খনিজ উপাদান ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য আগে পরীক্ষা করা মঙ্গলের উল্কাপিণ্ডগুলোর তুলনায় আলাদা ছিল। বিশেষ করে এর অক্সিজেন আইসোটোপের বৈশিষ্ট এবং ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইডের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এজির নেতৃত্বে গবেষকেরা নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রন মাইক্রোপ্রোব এবং সেন্টার ফর স্টেবল আইসোটোপসের অক্সিজেন আইসোটোপ বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নমুনাটি পরীক্ষা করেন। এতে এমন কিছু খনিজ পরিবর্তনের চিহ্ন পাওয়া যায়, যা মঙ্গলের প্রাচীন পরিবেশে তরল পদার্থের সংস্পর্শের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইডের উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, পৃথিবীতে এই যৌগের উৎপত্তির সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে জীবাণুর কার্যকলাপের সম্পর্ক রয়েছে। মঙ্গলে এর উপস্থিতি নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কারণও সেটি। তবে এই খনিজ পাওয়া যাওয়ার অর্থ মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল, এমন নয়। বরং এটি এমন পরিবেশের সম্ভাব্য প্রমাণ, যেখানে প্রাণের বিকাশের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত।
গবেষণাটির আরেকটি বড় সাফল্য হলো উল্কাপিণ্ডটির বয়স নির্ধারণ। নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি ও ক্যালটেকের বিজ্ঞানীরা নমুনাটিতে অতি ক্ষুদ্র জিরকন স্ফটিক শনাক্ত করেন। ইউরেনিয়াম-লেড পদ্ধতিতে এসব স্ফটিকের বয়স নির্ধারণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, শিলাখণ্ডটি অন্তত ৪১০ কোটি বছরের পুরনো। ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর গবেষকদের মতে, এটি এখন পর্যন্ত শনাক্ত করামঙ্গল গ্রহের সবচেয়ে প্রাচীন আগ্নেয় শিলা।
এই বয়সের গুরুত্ব বুঝতে হলে মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। গ্রহটির অধিকাংশ পরিচিত উল্কাপিণ্ডের বয়স প্রায় ২০ কোটি বছর। সেগুলো মঙ্গলের তুলনামূলক সাম্প্রতিক ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপের নমুনা। অন্যদিকে টেঘাজা ০০১ তৈরি হয়েছিল গ্রহটির গঠনপর্বের একেবারে শুরুর দিকে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি একাধিক ধরনের শিলার মিশ্রণ নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট ধরনের শিলার নমুনা। ফলে মঙ্গলের প্রাচীন ভূত্বক ও অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাওয়ার বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের মতে, মঙ্গলের ইতিহাসের প্রি-নোয়াচিয়ান যুগের সঙ্গে এই উল্কাপিণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৪৫০ কোটি থেকে ৪১০ কোটি বছর আগের এই সময়কে গ্রহটির সবচেয়ে প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তখন মঙ্গলে সম্ভবত আজকের তুলনায় ঘন বায়ুমণ্ডল ছিল, গ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্রও সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে গ্রহটির পৃষ্ঠ কিছুটা সুরক্ষিত ছিল। পাশাপাশি সেখানে তরল পানির অস্তিত্ব এবং আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপের মাধ্যমে জলতাপীয় পরিবেশ তৈরির সুযোগ ছিল।
এজির মতে, মঙ্গলে যদি কখনো পৃষ্ঠে ব্যাপকভাবে প্রাণের বিকাশ ঘটে থাকে, তাহলে সেই সম্ভাবনা অনুসন্ধানের জন্য প্রি-নোয়াচিয়ান যুগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ওই সময়ের পরিবেশ প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশের জন্য তুলনামূলক অনুকূল হতে পারে। তবে টেঘাজা ০০১-এর আবিষ্কার প্রাণের অস্তিত্বের প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেয় না। এটি মূলত এমন একটি প্রাচীন পরিবেশের অস্তিত্বের পক্ষে নতুন ভূতাত্ত্বিক ও রাসায়নিক তথ্য হাজির করেছে, যেখানে প্রাণের বিকাশ সম্ভব ছিল।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উল্কাপিণ্ডটি মঙ্গলের ঠিক কোন অঞ্চল থেকে এসেছে, তা শনাক্ত করার চেষ্টা। এর রাসায়নিক ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য মঙ্গলের অন্য পরিচিত উল্কাপিণ্ডের সঙ্গে মেলে না।
বিজ্ঞানীরা কক্ষপথ থেকে সংগৃহীত মঙ্গলের দূর অনুধাবনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য কয়েকটি উৎসস্থল চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে গ্রহটির প্রাচীন দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে উৎসস্থল এখনো নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এই অনুসন্ধান ভবিষ্যতে মঙ্গলে রোভার, ল্যান্ডার কিংবা নমুনা সংগ্রহের অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, টেঘাজা ০০১ যদি মঙ্গলের এমন কোনো অঞ্চল থেকে এসে থাকে, যেখানে এখনো কোনো রোভার অনুসন্ধান চালায়নি, তাহলে সেই অঞ্চল নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভান্ডার হতে পারে। সেখানে অভিযান পরিচালনা করা গেলে মঙ্গলের প্রাচীন ভূত্বক, পানির ইতিহাস এবং সম্ভাব্য প্রাণবান্ধব পরিবেশ সম্পর্কে আরও সরাসরি তথ্য পাওয়া সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর স্টিভ কারের লেখা এবং রবার্ট এগানের সম্পাদনায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণাটি সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো ছাড়াও নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি, ক্যালটেক, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং ইউনিভার্সিটি অব মেইনের বিজ্ঞানীরা অংশ নিয়েছেন।
সব মিলিয়ে টেঘাজা ০০১-এর আবিষ্কার মঙ্গল সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে—গ্রহটি সব সময় বর্তমানের মতো শীতল ও শুষ্ক ছিল না। তার জন্মলগ্নে সেখানে পানি, আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এবং তুলনামূলক ঘন বায়ুমণ্ডলসহ ভিন্ন এক পরিবেশ থাকতে পারে। পৃথিবীর মতো পরিবেশের কিছু বৈশিষ্ট্যও তখন বিদ্যমান ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাত্র একটি উল্কাপিণ্ড থেকেই মঙ্গলের ৪১০ কোটি বছর আগের পরিবেশ সম্পর্কে এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য অসাধারণ ঘটনা। এমন নমুনা আবার পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। তাই এই আবিষ্কার শুধু অতীতের মঙ্গলকে বোঝার নতুন জানালা খুলে দেয়নি, ভবিষ্যতে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।