মানবমস্তিষ্কের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক জিনগত ত্রুটিযুক্ত স্নায়ুকোষ বা নিউরন অপসারিত হয়। জন্মের সময়ের কাছাকাছি এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক যেন নিজের কোষগুলোর গুণগত মান যাচাই করে অপ্রয়োজনীয় বা ত্রুটিপূর্ণ কোষ সরিয়ে দেয়। নেচার সাময়িকীতে গত ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত একটি গবেষণায় মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পর্কে এমনই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি বলছে, মস্তিষ্কের কোষের সংখ্যা নির্ধারণের পাশাপাশি কোন কোষগুলো টিকে থাকবে, তা নির্ধারণেও এই প্রক্রিয়ার ভূমিকা থাকতে পারে। এর তাৎপর্য শুধু মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার ও মৃগীরোগের মতো স্নায়বিক অবস্থার কারণ অনুসন্ধানেও এটি নতুন দিক দেখাতে পারে।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার-এর প্রতিবেদনে সাংবাদিক হেইডি লেডফোর্ড জানিয়েছেন, গবেষকেরা ২ হাজার ৩০০টিরও বেশি নিউরন বিশ্লেষণ করে ভ্রূণাবস্থায় মস্তিষ্কের কোষে জিনগত পরিবর্তনের ব্যাপক উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। গবেষণায় দেখা যায়, ভ্রূণের মস্তিষ্ক থেকে নেওয়া নমুনার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি নিউরনের ক্রোমোজোমের কয়েকটি অংশ যুক্ত হয়েছে অথবা হারিয়ে গেছে।
বিপরীতে, জন্মের পর শিশুদের মস্তিষ্কে এই ধরনের অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ নিউরনে। অর্থাৎ, ভ্রূণাবস্থা থেকে জন্ম-পরবর্তী সময়ের মধ্যে এ ধরনের জিনগত অস্বাভাবিকতাযুক্ত নিউরনের অনুপাত চার গুণেরও বেশি কমে যায়।
এই পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয়, মস্তিষ্কের বিকাশের সময় জিনগত ত্রুটিযুক্ত অনেক নিউরন স্বাভাবিকভাবেই অপসারিত হয়। লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোস প্রুকাকিস মনে করেন, যেসব নিউরন টিকে থাকে, তাদের জিনগত গঠন সম্ভবত তুলনামূলকভাবে বেশি অক্ষত থাকে। তবে এই পর্যবেক্ষণ থেকে এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, জিনগত ত্রুটিই কোনো নিউরন অপসারণের একমাত্র কারণ। তিনি অবশ্য এই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন না।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন চিলড্রেনস হাসপাতালের শিশু-স্নায়ুজিনতত্ত্ববিদ ডায়ান শাওয়ের মতে, এই আবিষ্কার মস্তিষ্কে নিউরনের সংখ্যা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ভ্রূণাবস্থায় কোন নিউরনগুলো টিকে থাকার সুযোগ পায়, তা বোঝার নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এর আগে ইঁদুরের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রাথমিক বিকাশের সময় একটি আণবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহু মস্তিষ্ককোষের মৃত্যু ঘটে। নতুন গবেষণাটি মানুষের মস্তিষ্কেও কোষ বাছাই ও অপসারণের একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার প্রমাণ সামনে এনেছে।
শাও ও তার সহকর্মীরা ১৪ সপ্তাহের গর্ভকালীন ভ্রূণ থেকে শুরু করে ৯০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। তাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল সেরিব্রাল কর্টেক্সে, যা স্মৃতি, শেখা ও চেতনাসহ মস্তিষ্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত। গবেষকেরা পৃথক নিউরনের জিনগত উপাদান পরীক্ষা করে ক্রোমোজোমের অংশবিশেষের সংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাসের ঘটনা শনাক্ত করেন। এ ধরনের পরিবর্তনকে বলা হয় ‘কপি নাম্বার ভ্যারিয়েশন’ বা সিএনভি।
ভ্রূণের মস্তিষ্কে এই পরিবর্তন এত ব্যাপক ছিল যে, গবেষকেরা প্রথমে ফলাফলগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন। তারা বছরের পর বছর ধরে বিষয়টি যাচাই করেন এবং ভিন্ন পদ্ধতিতে একক কোষের জিনগত বিশ্লেষণ করেও একই ধরনের ফল পান। এতে পর্যবেক্ষণটির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। তবে গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত:
মস্তিষ্ক কীভাবে শনাক্ত করে কোন নিউরনকে অপসারণ করতে হবে?
গবেষকেরা একটি সম্ভাব্য সূত্র পেয়েছেন। যেসব নিউরনে সিএনভির মাত্রা বেশি, সেসব কোষে অন্য নিউরনের সঙ্গে সংযোগ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জিনের কার্যক্রমেও অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে। কিংস কলেজ লন্ডনের স্নায়ুবিজ্ঞানী অস্কার মারিনের ধারণা, মস্তিষ্ক হয়তো সঠিকভাবে সংযোগ স্থাপন করতে না পারা নিউরনগুলোকে সরিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে জিনগতভাবে স্বাভাবিক কোনো নিউরনও যদি যথাযথ সংযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেটিও অপসারিত হতে পারে। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের এই বাছাইপ্রক্রিয়া শুধু জিনগত ত্রুটি শনাক্ত করার ব্যবস্থা নয়, বরং স্নায়ুকোষের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করার একটি উপায়ও হতে পারে।
নিউইয়র্কের ওয়েইল কর্নেল মেডিকেল কলেজের স্নায়ুবিজ্ঞানী নাতালিয়া ডি মার্কো গার্সিয়ার মতে, এই গুণগত যাচাইব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। প্রয়োজনীয় কোষ অতিরিক্ত অপসারিত হলে মস্তিষ্কের কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত নিউরন নাও থাকতে পারে। আবার যেসব কোষ অপসারিত হওয়া প্রয়োজন, সেগুলো টিকে থাকলে মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগের বিন্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে মস্তিষ্ক কীভাবে সংগঠিত হবে এবং তার বিভিন্ন অংশ কীভাবে কাজ করবে, তার ওপর এই প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়তে পারে।
এই আবিষ্কার অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। জিনগত গবেষণায় ইতিমধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, কিছু ক্ষেত্রে ক্রোমোজোমের অংশবিশেষের সংখ্যা পরিবর্তনের সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক থাকতে পারে। শাও ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের কোষ বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে অটিজমসহ বিভিন্ন স্নায়ুবিকাশগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে চান। তবে বর্তমান গবেষণা থেকে বলা যায় না যে, এই প্রক্রিয়ার ত্রুটিই অটিজমের কারণ। এটি সম্ভাব্য সম্পর্ক অনুসন্ধানের একটি নতুন ক্ষেত্র মাত্র।
প্রুকাকিস গবেষণাটিকে যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করলেও মনে করেন, এ বিষয়ে জ্ঞানের পরিধি এখনো সীমিত। তার মতে, পরবর্তী গবেষণায় ডোপামিন উৎপাদনকারী নিউরনের মতো অন্যান্য স্নায়ুকোষও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব কোষ পারকিনসনস রোগের বিকাশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কিত।
গবেষণাটি দেখায় যে মানবমস্তিষ্কের বিকাশ শুধু নতুন নিউরন তৈরি করার বিষয় নয়; কোন নিউরনগুলো টিকে থাকবে, কোনগুলো বাদ পড়বে এবং কীভাবে কার্যকর স্নায়বিক সংযোগ গড়ে উঠবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের আগে-পরে বিপুলসংখ্যক জিনগত অস্বাভাবিকতাযুক্ত নিউরনের অনুপাত কমে যাওয়ার পর্যবেক্ষণ মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ গুণমান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে। তবে এই ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি, এর ব্যর্থতার পরিণতি এবং বিভিন্ন স্নায়বিক অবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। আপাতত এই আবিষ্কার মস্তিষ্কের বিকাশের এক জটিল রহস্যের দরজা খুলেছে, যার পূর্ণ তাৎপর্য নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতের গবেষণায়