বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের সাথে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বাসার নিচে দেখা করেন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। এর কয়েক মিনিট পরে দুজন যার যার মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে যান। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। গতকাল বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি। পাওয়া যায়নি তাহসিফের মরদেহটিও।
দ্বীপের সঙ্গে মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফের বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে।
দ্বীপ চরচাকে জানান, তারা মধ্যরাত পর্যন্ত একসাথে ছিলেন। তারপর দুজন আলাদা হন। দ্বীপ তার বাসায় চলে যান। পরে রাত দেড়টার দিকে তাহসিফ তার মা কে মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠান, “মা আমি আসছি”। এরপর তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার পর দ্বীপ কোথায় গিয়েছিলেন, সেই প্রশ্নটিই বারবার ঘুরে ফিরে আসছে।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল বুধবার সকালে তারা উত্তরা থানায় যান। সেখানে কর্মকর্তারা তাদের আশ্বাস দেন, ছেলে ফিরে আসবে। পরে বিকেল ৪টার দিকে তার মরদহ উদ্ধার করা হয়।
তাহসিফ সাউরি সুরতহাল করেন টঙ্গি নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজুর রহমান। সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাহ্যিকভাবে গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও শরীরের সব কিছু স্বাভাবিক ছিল। তবে পেট ফোলা ছিল।
বন্ধুর কথা ও সিসিটিভিতে সময়ের অমিল
তাহসিফের বন্ধু শাহরিয়ার দ্বীপ সাংবাদিকদের জানান, তাহসিফের সাথে তার দেখা হয় সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে। তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা হওয়ায় সেটি পরীক্ষা করেন দীপ। এরপর তারা মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে যান। উত্তরার একটি ওয়ার্কশপে মোটরসাইকেলটি দেখিয়ে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্টে ফিরে আসেন।
দ্বীপ বলেন, “এখান থেকে আবার আমরা রুয়াপ কমার্সিয়াল প্রজেক্ট মার্কেটে কুকরুক্কু রেস্টুরেন্টে যাই এবং সেখান থেকে সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার বের হয়ে আলাদা বাইকে বাসায় ফিরি।”
তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে তাহসিফ করবী বিল্ডিংয়ের পার্কিং এ আসেন। তার সাথে হাত মেলান নিচে দাঁড়িয়ে থাকা শাহরিয়ার দ্বীপ। তাহসিফ তার সাথে কথা বলে সাড়ে ছয়টায় মোটরসাইকেলটি ঠেলে ঠেলে বের করেন।
তবে দ্বীপ জানান, তাহসিফ বয়সে তার বড় হলেও তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বসুলভ।
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম চরচাকে জানিয়েছেন, তাহসিফ সম্প্রতি নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেই কাজ দেখাশোনা করতেন দ্বীপ। দ্বীপ ও তাহসিফের দুজনের পরিবারের মধ্যও সুসর্ম্পক রয়েছে।
মোটরসাইকেল কোথায়?
তাহসিফের বন্ধু শাহরিয়ার দ্বীপের তথ্য মতে, তারা দুজন আলাদা আলাদা মোটরসাইকেলে করে ফিরছিলেন। তবে তাহসিফের মেরদেহ উদ্ধারের পর এখনো তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির কোনো খোঁজ মেলেনি।
উত্তর খান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান চরচাকে বলেন, “এখনো পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি। মামলা করলে আমরা তদন্ত শুরু করব। আর না হলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।
মোটরসাইকেল উদ্ধার হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কোনো কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।”
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের উত্তরা জোনের উপ-কমিশনার মো. ইলিয়াস কবির বলেন, “আমরা ছায়া তদন্ত করছি। তবে এখনো মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।”
বাবা বলছেন হত্যা
তাহসিফ বন্ধুর সাথে দেখা করার আগে তার মায়ের সাথে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন এমনটি জানিয়ে তাহসিফ সাউরির বাব এনায়েতুল করিম চরচাকে বলেন, “আমার ছেলের স্ট্রং পার্সোনালিটি ছিল। সে আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। সরকার সুষ্ঠু তদন্ত করলে সঠিক ঘটনা বের হয়ে আসবে।”
এনায়েতুল করিম বলেন, তার ছেলের সাথে কারো কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। তিনি বলেন, “কিছুদিন আগে তাহসিফ বাইক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বেডরেস্টে ছিল।”
তাহসিফের খালাত বোন মোশফেকা জাহান ঘটনাটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। তিনি সেখানে বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও শেয়ার করার কারণে তাহসিফকে দিনের পর দিন মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে। অবসরে পাঠানোর পরও গোয়েন্দারা তাকে নিয়মিত অনুসরণ করতেন এমনটি তাহসিফ তাকে জানিয়েছিলেন।”