অ্যাপলের প্রথম ভাঁজযোগ্য (ডুয়ো) আইফোন বাজারে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই পর্দায় ফাটল দেখা দেওয়ার অভিযোগ কোম্পানিটির জন্য বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকটে ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব অভিযোগকে ইতিমধ্যে ‘ক্র্যাকগেট’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। প্রায় দুই দশকের আইফোন ইতিহাসে নকশার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত নতুন এই ডিভাইসের সূচনাতেই এমন সমস্যা দেখা দেওয়ায় অ্যাপলের পণ্যের গুণগত মান, প্রকৌশলগত সক্ষমতা এবং নতুন প্রধান নির্বাহী জন টার্নাসের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিবেদক মাইকেল অ্যাকটনের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ হাজার ডলারের বেশি দামের আইফোন ডুয়ো বাজারে আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন দেশের ব্যবহারকারীরা এর ভেতরের পর্দায় ফাটলের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ফোনটি খুললে পর্দার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিচে একই ধরনের অনুভূমিক ফাটল দেখা যাচ্ছে বলে এসব পোস্টে দাবি করা হয়েছে। তবে সমস্যাটি কতসংখ্যক ফোনে ঘটেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অ্যাপলও সমস্যাটি স্বীকার করেছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, অল্পসংখ্যক আইফোন ডুয়োতে ভেতরের ডিসপ্লে-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা গেছে। যেসব ব্যবহারকারী এ ধরনের সমস্যায় পড়বেন, তাদের অ্যাপলকেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফোন পাল্টে নিতে বলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোম্পানিটি ভাঁজযোগ্য ফোন প্রত্যাহারের কোনো ঘোষণা দেয়নি। অ্যাপল সাধারণত কোনো পণ্যের সমস্যার ক্ষেত্রে সার্ভিস বা প্রতিস্থাপন কর্মসূচির মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করে থাকে।
এই পরিস্থিতির গুরুত্ব শুধু একটি নতুন ফোনের প্রযুক্তিগত ত্রুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যাপলের ব্যবসায়িক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হলো পণ্যের নির্ভরযোগ্যতা, উন্নত নির্মাণমান এবং ব্যবহারকারীদের আস্থা। বিশেষ করে যে পণ্যের দাম ২ হাজার ডলারের বেশি, তার কাছ থেকে ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই উচ্চমানের স্থায়িত্ব প্রত্যাশা করেন। ফলে অল্পসংখ্যক ডিভাইসেও যদি একই ধরনের ত্রুটি দেখা যায়, তাহলে সমস্যাটির কারণ ও সমাধান সম্পর্কে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া কোম্পানিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী জন টার্নাসের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। গত মাসে টিম কুকের স্থলাভিষিক্ত হওয়া টার্নাসকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, তিনি কোম্পানির পণ্য উদ্ভাবনের ধারায় নতুন গতি আনবেন। আইফোন ডুয়ো সেই প্রত্যাশারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু নতুন পণ্যের নকশায় বড় পরিবর্তন আনার পরপরই নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তার নেতৃত্বের শুরুতেই চাপ তৈরি হয়েছে।
ভাঁজযোগ্য ফোনের ক্ষেত্রে পর্দার স্থায়িত্ব একটি বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। প্রচলিত স্মার্টফোনের পর্দা স্থির কাঠামোর ওপর বসানো থাকে। কিন্তু ভাঁজযোগ্য ফোনে পর্দা ও কবজার মধ্যে এমন সমন্বয় প্রয়োজন, যাতে বারবার খোলা ও বন্ধ করার পরও ডিসপ্লে অক্ষত থাকে। প্রতিবেদনে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশনের (আইডিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো জেরোনিমো বলেছেন, অ্যাপলের মতো উন্নত প্রকৌশল ও সরবরাহব্যবস্থার কোম্পানিরও ভাঁজযোগ্য ফোন তৈরির ক্ষেত্রে শেখার বড় পর্ব অতিক্রম করতে হয়। তার মতে, অনলাইনে প্রকাশিত ফাটলের ছবিগুলোর মধ্যে সাদৃশ্য ইঙ্গিত দিতে পারে যে কবজার মাপ ও সহনসীমা অথবা ভাঁজ করার সময় পর্দার কাঠামোগত সমর্থনে কোনো দুর্বলতা রয়েছে।
অ্যাপলের নকশা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন—এমন একজন সাবেক ডিসপ্লে প্রকৌশলীও বলেছেন, অল্পসংখ্যক ফোনে এমন ত্রুটি থাকতে পারে, যা নিয়মিত পরীক্ষায় শনাক্ত করা কঠিন। কোনো নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যাচের ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ থেকেও সমস্যাটি সৃষ্টি হতে পারে। এসব সম্ভাবনা যাচাই করতে হলে অ্যাপলকে আক্রান্ত ডিভাইস পরীক্ষা করে দেখতে হবে, ত্রুটিটি নকশাগত, উৎপাদনগত, নাকি নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রাংশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
একজন সাবেক ডিসপ্লে প্রকৌশলীও বলেছেন, অল্পসংখ্যক ফোনে এমন ত্রুটি থাকতে পারে, যা নিয়মিত পরীক্ষায় শনাক্ত করা কঠিন। ছবি: অ্যাপল ডটকম
অ্যাপলের জন্য প্রতিযোগিতামূলক চাপও রয়েছে। কোম্পানিটি স্যামসাংয়ের প্রথম গ্যালাক্সি ফোল্ড বাজারে আসার সাত বছর পর ভাঁজযোগ্য ফোনের বাজারে প্রবেশ করেছে। টার্নাসের বক্তব্য অনুযায়ী, অ্যাপল তাড়াহুড়ো করে নিম্নমানের পণ্য বাজারে আনতে চায়নি। বরং মসৃণ ভেতরের পর্দা ও টেকসই কবজার জটিল প্রকৌশলগত সমস্যা সমাধানে সময় নিয়েছে। কিন্তু বাজারে আসার পরই পর্দা ফেটে যাওয়ার অভিযোগ উঠলে সেই প্রস্তুতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। স্যামসাংও সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নিজেদের তুলনামূলক পাতলা ও হালকা ভাঁজযোগ্য ফোনের প্রচার শুরু করেছে।
এদিকে নতুন আইফোনের সরবরাহেও বিলম্ব হচ্ছে। অ্যাপল জানিয়েছে, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি চাহিদার কারণে কিছু ক্রেতাকে ফোন পেতে আগামী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। একই বছরের আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সের ক্ষেত্রেও কিছু এটিঅ্যান্ডটি গ্রাহক স্থায়ীভাবে মোবাইল নেটওয়ার্ক হারানোর সমস্যায় পড়েছিলেন। সে ক্ষেত্রে অ্যাপল সফটওয়্যার সংশোধনের মাধ্যমে অন্য ডিভাইসে সমস্যাটি ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর ব্যবস্থা নেয়।