ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজয়ের পর ফ্লাভিও বলসোনারো গোপনে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছেন। বিবিসি ব্রাজিল ও বিবিসি মুন্দোকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পৌঁছেছেন তিনি। সেখানে তিনি তার ছোট ভাই এদুয়ার্দোর সঙ্গে দেখা করেছেন।
বলসোনারোর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার ঘটনা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। নির্বাচনে পরাজয়ের পরদিনই তার পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট। অর্থ পাচারের তদন্তে সংশ্লিষ্টতার কারণে তার ভ্রমণ নথি নিয়ে এই নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি তা জমা দেননি। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তাকে ও তার পরিবারকে ভিসা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি ইতালির নাগরিক হওয়ায় ওই দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন এবং ব্রাজিলে ভিসা নিয়েই ছিলেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
এই ঘটনা কেবল একজন পরাজিত রাজনীতিকের দেশত্যাগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে লুলা সরকারের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। যুক্তরাষ্ট্র যদি বলসোনারোকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের মতো সুবিধা দেয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে ও তার পরিবারকে ভিসা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে। তার বাবা ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হারের পর অভ্যুত্থানের চেষ্টা করার অপরাধে দণ্ডিত হয়েছিলেন। সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েই ফ্লাভিও এবারের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলার কাছে তার পরাজয় ঘটে। প্রথম দফায় পিছিয়ে থাকার পর লুলার এই প্রত্যাবর্তন দক্ষিণ আমেরিকার রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী,এর মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকায় টানা সাতটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থীদের জয় থামিয়ে দিলেন লুলা। তাই এই ফলাফল শুধু ব্রাজিলের ক্ষমতার পালাবদল নয়, অঞ্চলটির রাজনৈতিক প্রবণতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প ও লুলার মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ রয়েছে। লুলা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছেন। এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বলসোনারোর প্রার্থিতাকে সমর্থন না করলেও, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর পর্দার আড়ালে ব্রাজিলে তার অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বাধীন দপ্তরের এই ভূমিকা দুই দেশের রাজনৈতিক দূরত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এর আগে বলসোনারো ও তার ভাই এদুয়ার্দো তদবিরের পর ব্রাজিলের দুটি বৃহত্তম মাদক চক্রকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্র। এদুয়ার্দো ২০২৫ সালের শুরুর দিক থেকে টেক্সাসে বসবাস করছেন এবং জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পেয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে জইর ও ফ্লাভিওর সঙ্গে বৈঠক করতে দুবার প্রতিনিধি পাঠানোর চেষ্টা করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ব্রাজিলের কর্তৃপক্ষ সেই উদ্যোগ আটকে দেয়। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ব্রাজিলের শীর্ষ কূটনীতিকের ভিসা বাতিল করে। এসব ঘটনা দেখায়, ফ্লাভিওর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার বিষয়টি দুই দেশের বিদ্যমান বিরোধ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
বলসোনারোর দেশত্যাগের পেছনে আইনি তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনা করা আদালতের নথি অনুযায়ী, অনলাইন জুয়া ও বাণিজ্যসংক্রান্ত একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্রাজিলীয় আইনজীবীর সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়ে তদন্ত চলছে। অন্য একটি তদন্তে তার বাবাকে নিয়ে জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের অর্থায়নও প্রশ্নের মুখে। এ প্রকল্পের জন্য তিনি বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন এমন এক ব্যাংকারের কাছ থেকে, যিনি একটি বড় দুর্নীতি কেলেঙ্কারির কেন্দ্রে রয়েছেন। তবে বলসোনারোর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের কোনোটিতেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। এমনকি তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়নি। তিনি তদন্তগুলোকে রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে বর্ণনা করেছেন এবং কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন।
ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট সোমবার তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি নির্দেশ মানার কথা বলেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন, ব্রাজিল ছেড়ে যাওয়ার কথা তিনি কখনো ভাবেননি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট জমা না দেওয়ায় কর্তৃপক্ষ তার ব্রাজিলীয় ভ্রমণ নথি বাতিল করে। তার ইতালীয় নাগরিকত্বও রয়েছে। ফলে তার দেশত্যাগের ঘটনায় আইনি এখতিয়ার, নাগরিকত্ব এবং সম্ভাব্য বিদেশি সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কেউ কেউও জানতেন না তিনি কোথায় আছেন। এমনকি তার নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থাপক রোজেরিও মারিনো সাংবাদিকদের বলেন, বলসোনারোর আকস্মিক দেশত্যাগের খবর শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
বলসোনারোর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সিনেটর হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হলে সংসদীয় দায়মুক্তি হারাবেন তিনি। তখন তদন্তের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলে তিনি ব্রাজিলের ডানপন্থী বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত থাকবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রে তার সমর্থকেরা ইতিমধ্যেই তাকে নির্বাসন থেকে ব্রাজিলের ডানপন্থী বিরোধী শক্তির নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাব্য ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন।