নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে নতুন একটি প্রস্তাব সামনে এসেছে। শীর্ষ আইন বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে সংসদের উচ্চকক্ষকে যুক্ত করার একটি নতুন ধারণা দিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আলোচনায়।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে লিখিত মতামত চেয়েছে বিশেষ কমিটি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে শেষ হবে না। উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান এবং সরকারি ও বিরোধীদলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, তা আলোচনা হয়েছে। উচ্চকক্ষের স্পিকার হিসেবে উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি করে তাকে দায়িত্ব দেওয়ার বিকল্প প্রস্তাবও রয়েছে।
গত ৪ অক্টোবর সংবিধান সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এ রকম মতামত এসেছে। এটা বিবেচনা করা যায়। তবে আরও প্রস্তাব এলে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে সেগুলো তুলে ধরবে। সবার বক্তব্য ছিল বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা প্রয়োজন।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের কাঠামো নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে আসে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আপিল বিভাগের রায়ে ব্যবস্থাটি পুনর্বহাল হয়।
একপর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়টি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পায়। ২০২৫ সালে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালে একমত হলেও সরকার গঠন ও প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্ন প্রস্তাব দেয়। কমিশন দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে সমন্বিত প্রস্তাব উপস্থাপন করে।
ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব বনাম নতুন ধারণা
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের জন্য কয়েকটি ধাপের প্রস্তাব দেয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধীদলের একজন প্রতিনিধিকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠনের কথা বলা হয়।
কমিটি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে প্রধান উপদেষ্টা পদে যোগ্য ব্যক্তিদের নাম চাইবে। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সমঝোতা না হলে পরবর্তী ধাপ অনুসরণের প্রস্তাব ছিল।
সনদের ৯ নম্বর ধাপে বাছাই কমিটিতে বিচার বিভাগের দুজন প্রতিনিধি যুক্ত করার কথা বলা হয়। তাদের একজন আপিল বিভাগের এবং অন্যজন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হবেন। তাদের মনোনয়নের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাবও ছিল।
১০ নম্বর ধাপে বর্ধিত সাত সদস্যের কমিটির গোপন ভোটে ‘র্যাঙ্কড চয়েস’ বা পছন্দের ক্রমানুসারে ভোটের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের কথা বলা হয়।
এছাড়া, ১২ নম্বর ধাপে প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন সম্ভব না হলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুসরণের প্রস্তাব ছিল। তবে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা হতে পারবেন না।
১৩ নম্বর ধাপে প্রধান উপদেষ্টার পদ শূন্য হলে আগে নির্ধারিত পছন্দের তালিকা থেকে পরবর্তী ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়।
অন্যদিকে, নতুন প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার ধারণা এসেছে। উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধীদলের সম্মতির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন, সমঝোতা না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ এবং পদ শূন্য হলে বিকল্প নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট ধাপ রাখা হয়েছিল। বিপরীতে, নতুন ধারণায় উচ্চকক্ষের স্পিকারকে সরকারপ্রধান করার কথা বলা হলেও প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন ও উপদেষ্টা নিয়োগের বিস্তারিত প্রক্রিয়া এবং বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বিএনপির আগের প্রস্তাবে কী ছিল
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির আগের প্রস্তাবে কয়েকটি বিকল্প ধাপ ছিল। প্রথমে রাষ্ট্রপতি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একজন যোগ্য ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেবেন।
এতে সমঝোতা না হলে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে নিয়ে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব ছিল। পরবর্তী ধাপে আরও রাজনৈতিক প্রতিনিধিকে যুক্ত করে সমঝোতার চেষ্টা করার কথা বলা হয়। সব পর্যায়ে সমঝোতা ব্যর্থ হলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধানে ফিরে যাওয়ার বিকল্পও বিএনপির প্রস্তাবে ছিল। দলটির প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে পর্যায়ক্রমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
নতুনের সঙ্গে বিএনপির আগের প্রস্তাবের মিল-অমিল
দুই প্রস্তাবেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার বিষয়টি রয়েছে। তবে গঠনপ্রক্রিয়ায় পার্থক্য আছে। বিএনপির আগের প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং সমঝোতা না হলে ধাপে ধাপে বিকল্প কমিটি গঠনের কথা ছিল।
নতুন ধারণায় উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি সরকারি ও বিরোধীদলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে অন্য উপদেষ্টা নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
নতুন প্রস্তাবে উচ্চকক্ষের স্পিকার নির্বাচনের পদ্ধতি, প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে সমঝোতা না হলে করণীয় এবং উপদেষ্টাদের নির্বাচনপ্রক্রিয়া বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
নতুন প্রস্তাব নিয়ে বিশেষ কমিটির অবস্থান
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের নতুন পদ্ধতি নিয়ে বিশেষ কমিটিতে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রস্তাব ও মতামত বিবেচনা করে সেগুলো কমিটির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের লিখিত মতামতও চাওয়া হয়েছে।
ফলে উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার ধারণা চূড়ান্ত প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, উচ্চকক্ষের স্পিকার হিসেবে উপরাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব দেওয়ার বিকল্প বিবেচনায় থাকবে কি না এবং উপদেষ্টা নিয়োগের পদ্ধতি কী হবে- এসব বিষয় এখনো নির্ধারিত হয়নি।