লিখনপদ্ধতি ও লিপির উৎপত্তি অস্পষ্ট থেকে গেছে, তবে বাক্ ও ভাষার উৎপত্তি তো একেবারেই অজানা। এর কারণ হলো, আদিমতম ভাষার কোনো ভৌত প্রমাণ অবশিষ্ট নেই। সম্ভবত এই ভাষা আফ্রিকাতেই প্রচলিত ছিল, যা হলো হোমো স্যাপিয়েন্সের (আধুনিক মানুষের) উৎপত্তিস্থল। অন্যদিকে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় মাটির ফলকে খোদাই করা চিহ্ন—যা লিখনপদ্ধতির প্রাচীনতম পরিচিত রূপ—আজও টিকে আছে; এগুলো খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচারের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, এর ফলে পণ্ডিতদের জন্য বাক ও ভাষার উৎপত্তি নিয়ে অনুমান করার অনেক অবকাশ তৈরি হয়েছে। প্রাচীন যুগের চিন্তাবিদ—যেমন প্লেটো থেকে শুরু করে অনেকেই এই প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছেন যে, ভাষার উৎপত্তি কি প্রাকৃতিকভাবে হয়েছে, নাকি এটি পুরোপুরি মানুষের সৃষ্টি। ঊনবিংশ শতাব্দী নাগাদ নৃতত্ত্ববিদরা পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব সত্ত্বেও এই বিষয় নিয়ে ক্রমাগত আলোচনা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।
নৃবিজ্ঞানী ক্রিস নাইট ও জেরোম লুইস তাদের ‘দ্য রেভোলিউশনারি অরিজিনস অফ ল্যাঙ্গুয়েজ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ১৮৬৬ সালে প্যারিস লিঙ্গুইস্টিক সোসাইটির গঠনতন্ত্রে এই বিষয়টি নিয়ে যেকোনো ধরনের আলোচনা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তখন পরিস্থিতি এমন ছিল যে, “ভাষার উৎপত্তি নিয়ে কোনো তত্ত্ব দেওয়ার সাহস করলে তাকে খামখেয়ালি বা পাগলাটে বলে গণ্য করা হতো।” তা সত্ত্বেও, “মাঝে মাঝে কোনো একজন সাহসী ও প্রথাবিরোধী চিন্তাবিদ নিজের সুনাম হারানোর ঝুঁকি নিয়েও এই বিতর্কটিকে পুনরায় উসকে দেওয়ার চেষ্টা করতেন।”
ভাষাবিজ্ঞান
সেই সময় থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে পরিচিত—যদিও বিতর্কিত—প্রয়াসগুলো এসেছে ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কির কাছ থেকে, যার সূচনা হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। লেখকরা নাইট-এর লেখা ‘ডিকোডিং চমস্কি’ (২০১৬) বইটির ওপর ভিত্তি করে তার অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
১৯৮৭ সালে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড প্রবলেমস অফ নলেজ’ গ্রন্থে চমস্কি মন্তব্য করেছিলেন: “ভাষার উৎপত্তি নিয়ে গবেষণার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যেখানে অনুসন্ধান করা হয়েছে যে কীভাবে এটি বানর বা অন্যান্য প্রাণীর ডাক থেকে বিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে।” তবে তার মতে, এই ধরনের অনুসন্ধান হলো “সম্পূর্ণ সময় নষ্ট”।
এর কারণ হিসেবে তিনি লিখেছেন, ভাষা এমন এক নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা “প্রাণীদের যেকোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা”। চমস্কির ধারণা অনুযায়ী, যদিও মানুষের অঙ্গভঙ্গিগুলো প্রাণীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে বিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের ভাষার ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রযোজ্য নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির সপক্ষে একটি একাডেমিক গবেষণার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ১৯৭৩ সালে শুরু হয়েছিল। গবেষণার বিষয় ছিল ‘নিম চিমস্কি’ নামের একটি শিম্পাঞ্জি—যার নামটিতে নোয়াম চমস্কির নামের সঙ্গে একটি কৌতুকপূর্ণ মিল রাখা হয়েছিল। নিম তার তত্ত্বাবধায়ক মানুষদের কাছ থেকে খাবার বা অন্যান্য পুরস্কার পাওয়ার উদ্দেশ্যে কয়েক ডজন হাতের ইশারা ব্যবহার করতে শিখেছিল।
তবে সে আমেরিকান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে বা কোনো ভাষা বলতে শেখেনি। নাইট ও লুইসের তথ্য অনুযায়ী, নিমের করা ইশারার দীর্ঘতম ক্রমটি ছিল অনেকটা এরকম: “কমলা দাও আমাকে, দাও খেতে কমলা, আমি খাই কমলা, দাও আমাকে খেতে কমলা, দাও আমাকে, তুমি।”
চমস্কির মতে, মানব ভাষার উদ্ভব হয়েছিল হঠাৎ—একটিমাত্র জিনগত পরিবর্তনের ফলে; ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বা দীর্ঘস্থায়ী, অভিযোজনমূলক সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নয়। অন্য কথায়, লেখকদের যুক্তি হলো—ভাষাকে “প্রাকৃতিক জগতের একটি অত্যন্ত কৌতূহল উদ্দীপক ও রহস্যময় দিক” হিসেবে অভিহিত করে এবং একে “প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে অনুসন্ধানযোগ্য” বিষয় হিসেবে ঘোষণা করার মাধ্যমে, চমস্কি ভাষাবিজ্ঞানের চর্চাকে নৃবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন।
তবে তারা আরও যোগ করেন, “এমন কোনো পরিমাপক যন্ত্র, আতশ কাঁচ, দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা অন্য কোনো সরঞ্জাম নেই, যা দিয়ে একটি শব্দের অর্থকে ধরা বা বোঝা সম্ভব।” তাহলে প্রচলিত বিজ্ঞান কীভাবে ভাষাকে নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে পারে?
সামাজিক উৎস
চমস্কির দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করে, নাইট এবং লুইস তাদের নিজস্ব তত্ত্বের সমর্থনে বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক—উভয় ধরনের প্রমাণের এক জটিল সমন্বয় তুলে ধরেছেন। এই প্রমাণগুলো মূলত প্রাগৈতিহাসিক এবং বর্তমান আফ্রিকার প্রেক্ষাপট থেকে নেওয়া হয়েছে। যেখানে লুইস তিন দশক ধরে শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণা করেছেন—যাদের মধ্যে মধ্য আফ্রিকার ‘বায়াকা’ জনগোষ্ঠী অন্যতম।
লেখকদের মতে, “কোনো অনুমানকে বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য হতে হলে, তা থেকে অবশ্যই এমন ভবিষ্যদ্বাণী উঠে আসতে হবে যা পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব।” যেহেতু সুদূর অতীতের ঘটনাগুলোর কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া সম্ভব নয়, তাই বিজ্ঞানীদের “বিভিন্ন ইঙ্গিতপূর্ণ সূত্র থেকে পরীক্ষার পদ্ধতি তৈরি করতে হয়।” এর মধ্যে রয়েছে: “জাদুকরী মিথ বা পৌরাণিক কাহিনীর পুনরাবৃত্ত কাঠামো, দীক্ষা-অনুষ্ঠান, শিকারিদের পালনীয় নিষেধ বা ট্যাবু, ঋতুস্রাব সংক্রান্ত বিধিনিষেধ, চন্দ্র ও সূর্যের প্রভাব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যেমন লালচে গেরুয়া রঙের ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত অলঙ্কার, যা প্রতীকী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ।” তাদের এই কৌতূহলোদ্দীপক—যদিও কিছুটা অসংলগ্ন বা দীর্ঘায়িত—বইটিতে এই সমস্ত সূত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
যদিও নৃতাত্ত্বিকেরা প্রায়শই এমন ধারণা দিয়েছেন যে, বাকশক্তি ও ভাষার উদ্ভব হয়েছে শিকার বা যুদ্ধবিগ্রহ থেকে, নাইট ও লুইস এই দুটি তত্ত্বকে খণ্ডন করেছেন। বনাঞ্চলে শিকারের সময় পুরুষ শিকারি-সংগ্রাহকরা “উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন”, যাতে প্রাণীদের নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করা যায়। এর পরিবর্তে, গরিলা, অ্যান্টিলোপ, চিতাবাঘ বা হাতির মতো প্রাণীদের উপস্থিতি সম্পর্কে একে অপরকে সতর্ক করতে তারা ইশারা-ভাষা ব্যবহার করেন।