চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগেই বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ হিসেবে অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলের। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ শুরুর তিন দিন আগে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অন্তর্বর্তীকালীন হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করবেন সিনিয়র সহকারী কোচ হিসেবে এত দিন কাজ করা মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন।
কিন্তু একটি টেস্ট সিরিজ শুরুর মাত্র তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে দেশের ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টারখ্যাত আশরাফুলকে কেন সরিয়ে দিল বিসিবি? কেন সকালে অনুশীলনেও তাকে কিছু না জানিয়ে রাতে হুট করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঘোষণা দিল বোর্ড? এর পেছনে ক্রিকেটের বাইরের অনেক কারণ রয়েছে বলেও খবর ভাসছে বাতাসে।
প্রথমত, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দেশি কোচদের নিয়ে যে ব্যাপক প্রচারণা চলছিল, সেখানে কিছুটা হলেও ভাটা পড়ল। কেননা, কোচিংয়ে তেমন বড় কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও আশরাফুলকে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ শুরুর কয়েকদিন আগে ব্যাটিং কোচের চাকরি হারিয়েছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। ছবি: সংগৃহীত
আশরাফুলের সময়ে বাংলাদেশের টেস্ট দল বেশ ভালো পারফরম্যান্স করেছে। জয় ধরা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও। তবে সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষ করে ওয়ানডেতে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিংয়ের চিত্র ছিল খুবই খারাপ। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যর্থতার জেরেই চাকরি হারাতে হয়েছে তাকে।
সবশেষ সংযুক্ত আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজে খেলা দুই ম্যাচের একটিতেও বাংলাদেশ ২০০ রান করতে পারেনি। প্রথম ম্যাচে ১৭২ রানে অলআউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ দল গুটিয়ে যায় ১৬০ রানে। এর পরই এসেছে আশরাফুলকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা।
জাতীয় দলের কোচ হওয়ার আগে আশরাফুলের কোচিং ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ অভিজ্ঞতা ছিল বিপিএলের রংপুর রাইডার্সের ব্যাটিং পরামর্শক হিসেবে কাজ করা। সেখান থেকে অনেকটা চমক জাগিয়েই গত বছর আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড তাকে ব্যাটিং কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়। তার সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত। তামিম ইকবালের বোর্ডও তাকে বিশ্বকাপ পর্যন্ত রাখতে আগ্রহী ছিল।
তবে বিশ্বকাপের আগে ওয়ানডেতে একের পর বাজে পারফরম্যান্স বিসিবিকে চিন্তায় ফেলেছে। বাংলাদেশ দলের চলতি বছর খেলা ১৬টি ওয়ানডের মধ্যে ছয়টিতেই ২৫০ রানের কম করেছে এবং চারটি ম্যাচে ২০০ রানও করতে পারেনি। ব্যাটিংয়ের এই করুণ চিত্রের জন্য অনেকেই অনভিজ্ঞ কোচ আশরাফুলকে বড় দায়ী মনে করেন। কারণ, তার সঙ্গে দলের কয়েকজন ক্রিকেটারের মনোমালিন্য ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন বক্তব্যও রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় দলের এক ক্রিকেটার চরচাকে জানিয়েছেন, “আশরাফুল ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের কোনো মনোমালিন্য বা বোঝাপড়ার সমস্যা কখনোই ছিল না। ক্রিকেটার হিসেবে আমরা তাকে অনেক সম্মান করি। এই প্রজন্মের অধিকাংশ ক্রিকেটারই আশরাফুল ভাইয়ের ব্যাটিং দেখে বেড়ে উঠেছে। তবে কোচ হিসেবে তিনি ক্রিকেটারদের পরের ধাপে কতটা নিয়ে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সবার মধ্যেই সন্দেহ ছিল। এই কারণেই ফিল সিমন্স আর সালাহউদ্দিন স্যারের কাছে সমস্যা নিয়ে সবাই যায়। এখানে তার কোনো সমস্যা নেই। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই লেভেলের জন্য তিনি এখনো প্রস্তুত নন।”
আরেকটি সূত্র থেকে চরচা জানতে পেরেছে, বিদেশি কোচদের তুলনায় ভাষাগত কোনো জটিলতা না থাকলেও আশরাফুলের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে অধিকাংশ খেলোয়াড়েরই একধরনের অনীহা ছিল বলে জানা গেছে। রংপুর রাইডার্স বা বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারদের দলে সুযোগ দিতে বিশেষ চেষ্টা করতেন বলেও অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন সাপোর্ট স্টাফ।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব সামলাবেন মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। ছবি: বিসিবি
ব্যাটিং কোচ হিসেবে আশরাফুলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি দলও ভালো করতে না পারায় বিসিবি হয়তো মনে করেছে, তাকে আর দায়িত্বে রাখা ঠিক হবে না।
তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। টেস্ট সিরিজের ঠিক আগে কেন তাকে ছাঁটাই করতেই হলো? ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যানরা ব্যর্থ হয়েছেন, কোচ হিসেবে এতে আশরাফুলের দায় অবশ্যই আছে। কিন্তু কোচ তো আর মাঠে নেমে খেলে দেবেন না। অতীতেও বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বাজে ব্যাটিংয়ের পর ব্যাটিং কোচদের ঠিক এভাবেই বিদায় করেছে বিসিবি। তবে তাতে কাজের কাজ তেমন হয়নি। এবার ফলাফল কেমন হয়, সেটা সময়ই বলে দেবে।
আশরাফুলের এভাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ছিটকে যাওয়ার পর একটি প্রশ্নই জোরালো হচ্ছে—ধীরে ধীরে কি দেশি কোচদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে বিসিবি?
সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে একজন সহকারী কোচকে। পাশাপাশি জোরালো গুঞ্জন রয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ব্যাটসম্যান হাশিম আমলা বা পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ ইউসুফের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের খ্যাতিমান দুজনের যেকোনো একজনকে পরবর্তী ব্যাটিং কোচ হিসেবে নিয়োগ দিতে কাজ করছে বিসিবি।
এর মধ্যে আমলার দিকেই নাকি বোর্ডের বেশি মনোযোগ। কারণ, আগামী বছর আফ্রিকায় ওয়ানডে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। তিন ফরম্যাটেই ব্যাটসম্যান হিসেবে আমলার সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি উপমহাদেশের কন্ডিশনেও তিনি ভালো করেছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বও ক্রিকেটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে বিসিবি।
এর মধ্য দিয়ে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বিশ্বকাপের আগে বিদেশি কোচদের ওপরই ভরসা করতে চাইছে বিসিবি।
তবে কি আশরাফুলকে দিয়ে যার শুরু, বিশ্বকাপের আগে সেখানে যোগ হবে আরও স্থানীয় কোচের নাম?