যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আট মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটন সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। অন্যদিকে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এবার আক্রান্ত হলে তাদের প্রতিশোধ হবে আগের চেয়ে আরও বড়, আগ্রাসী ও ভিন্ন ধরনের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইরানে সম্ভাব্য হামলার বিভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করেছে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারে। তবে সামরিক পরিকল্পনা তৈরি হওয়া মানেই হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমন নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা রাখার কথা বলছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য হিল-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম ইরানে নতুন করে হামলার বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তুত রেখেছে। হোয়াইট হাউস অনুমোদন দিলে এসব পরিকল্পনা কার্যকর করা সম্ভব। পরিকল্পনাগুলো প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পেন্টাগনের বক্তব্য, প্রেসিডেন্টকে সামরিক বিকল্প তৈরি করে দেওয়া তাদের দায়িত্ব; ভবিষ্যতে কী অভিযান পরিচালিত হবে, তা নিয়ে তারা অনুমান করতে চায় না।
এই সামরিক প্রস্তুতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো, ইরানের কাছ থেকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ছাড় আদায় করতে ওয়াশিংটনের ব্যর্থতা। ইউরেশিয়া গ্রুপের ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি ব্রু দ্য হিল-কে বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে হামলা শুরু করতে পারে বলে তার মনে হচ্ছে। তার বিশ্লেষণে, নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতির ওপর যে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তা আরও বাড়ানোই ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনায় ছাড় দিতে এবং শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে বাধ্য করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ এবং সামরিক হামলার সম্মিলিত চাপে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হচ্ছে বলে মার্কিন প্রশাসন মনে করলেও, তেহরান এখন পর্যন্ত তার আলোচনার অবস্থান থেকে সরে আসেনি। ব্রুর মতে, ইরান কয়েক সপ্তাহ ধরে একই অবস্থানে অনড় রয়েছে এবং আলোচনায় উল্লেখযোগ্য নমনীয়তা দেখাচ্ছে না। ফলে ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতির অভাব নিয়ে হতাশা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সামরিক হামলা কেবল যুদ্ধের শুরু নয়, বরং আলোচনার টেবিলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার একটি উপায় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা আঞ্চলিক কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা হ্যারিসন মান দ্য হিল-কে বলেছেন, নতুন করে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি প্রধান পথ থাকতে পারে। প্রথমটি হলো, ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে আবার হামলা চালানো। দ্বিতীয়টি হলো, ইসরায়েলও অভিযানে যুক্ত হলে বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানা। মানের বক্তব্য অনুযায়ী, এপ্রিলের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের উপকূলীয় এলাকায় হামলা চালিয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরে বিমান অভিযান ছিল খুবই সীমিত। এর পেছনে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো এবং মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার আশঙ্কা এড়ানোর বিষয় থাকতে পারে।
তবে ইরানের বেসামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা পুলিশ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। মানের বক্তব্যে এই ধরনের হামলার সম্ভাবনা ইসরায়েলি বাহিনীর অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এমন অভিযান হলে ইরানের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন, জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা আঘাতের পরিধিও বিস্তৃত হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সক্রিয় পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। গত মাসে পেন্টাগন দাবি করেছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-শিল্পভিত্তি এবং ড্রোন সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এই দাবির পরও ইরানের হাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ, সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং পাল্টা আঘাত হানার অবশিষ্ট সক্ষমতা—দুটি আলাদা বিষয়। ইরান যদি তার অবশিষ্ট সামরিক শক্তি দিয়ে মার্কিন ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ কিংবা উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে নতুন সংঘাতের মূল্য আগের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
এই ঝুঁকির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে। দ্য হিল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনাসদস্য এবং প্রায় ২০টি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে।
দুটি বিমানবাহী রণতরির নেতৃত্বাধীন স্ট্রাইক গ্রুপ সেখানে অবস্থান করছে এবং তৃতীয় রণতরি ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টও সেন্টকমের এলাকায় যাওয়ার পথে রয়েছে। এ ছাড়া ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ডের নেতৃত্বে তিনটি যুদ্ধজাহাজে করে প্রায় চার হাজার মেরিন ও নৌসদস্য পাঠানো হয়েছে। এই অতিরিক্ত বাহিনী প্রেসিডেন্টকে সমুদ্রপথে অবরোধ কার্যকর করা, উভচর অভিযান পরিচালনা এবং অন্যান্য সামরিক বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে বড় সামরিক উপস্থিতি যেমন অভিযান চালানোর সক্ষমতা বাড়ায়, তেমনি সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে মার্কিন বাহিনীর ওপর পাল্টা হামলার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ রয়েছে। ট্রাম্প নাতাঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার কাছাকাছি জাগরোস পর্বতমালায় অবস্থিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন লক্ষ্য করে হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গ্রানাইটের প্রায় দুই হাজার ফুট গভীরে থাকা স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার বোমাও কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
ফলে এমন হামলা চালানো হলেও প্রত্যাশিত সামরিক ফল পাওয়া নিশ্চিত নয়। বরং হামলা ব্যর্থ হলে কিংবা স্থাপনাটির সক্ষমতা অক্ষত থাকলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
এদিকে তেহরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধ নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা উদ্বেগও বাড়ছে। জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক স্মারকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি অঞ্চলে মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রের চেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং কিছু প্রচেষ্টা উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে।
একই সঙ্গে সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অপ্রয়োজনীয় সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা দেখায়, সংঘাত কেবল ইরান ও ইসরায়েলের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই; উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
ব্রুর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানি নেতারা ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রকাশ্যেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল হামলা চালালে এবার প্রতিশোধ হবে আরও বড় ও আগ্রাসী। তেহরান মার্কিন ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ, তেল পাইপলাইন, শোধনাগার এবং উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিচ্ছে। পারস্য উপসাগরের সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার এবং প্রযুক্তি অবকাঠামোকেও সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে ব্রু উল্লেখ করেছেন। এমন হামলার হুমকি বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধের প্রভাব সামরিক স্থাপনা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি বাজার এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এরই মধ্যে তেলের বাজারে নতুন চাপ দেখা দিয়েছে। দ্য হিল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়, আর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ছিল প্রায় ১০২ ডলার। মে মাসের পর তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর এই প্রবণতা নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যও এমন পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যেও সামরিক চাপ ও সমঝোতার দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট। তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া-ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক বলেছেন, সপ্তাহান্তেই হামলা হতে পারে, আবার চুক্তিও সম্ভব। শুক্রবার ট্রাম্পও বলেছেন, নতুন করে ‘এপিক ফিউরি’ নামে অভিযান চালানো হতে পারে, অথবা ইরান সমঝোতায় আসতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে আলোচনা চলছে না। তার বক্তব্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময় সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকলেও সামরিক বিকল্প পরিত্যাগ না করার অবস্থান পরিষ্কার।