আবহাওয়ার পূর্বাভাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নতুন এক অগ্রগতি দুর্যোগ মোকাবিলা, কৃষি উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এত দিন আবহাওয়াবিদেরা মনে করতেন, দুই সপ্তাহের বেশি সময়ের আবহাওয়ার পূর্বাভাস নির্ভরযোগ্যভাবে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষকেরা এমন একটি মেশিন লার্নিং পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যা দুই থেকে ছয় সপ্তাহের আবহাওয়ার পূর্বাভাসের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক লেখক অমিত মালেওয়ার অনলাইনে লেখা এক প্রতিবেদনে এই অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছেন।
এই উদ্ভাবনের গুরুত্ব বুঝতে হলে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ঘটে যাওয়া শীতকালীন দুর্যোগের কথা স্মরণ করা প্রয়োজন। পরপর তিনটি তীব্র শীতকালীন ঝড়ে রাজ্যটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ তাপ, খাবার ও পানির সংকটে পড়েন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ২৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ পরে স্বীকার করে, কয়েক দিন আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকলে প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের ব্যবস্থা জোরদার করা এবং দুর্বল অবকাঠামো সুরক্ষিত করার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারত। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, দুর্যোগের পূর্বাভাস শুধু আবহাওয়ার তথ্য নয়; যথাসময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মানুষের জীবন রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
প্রচলিত আবহাওয়ার পূর্বাভাসব্যবস্থা মূলত বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রের গতিবিধি সম্পর্কে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে। এসব মডেল আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু সময় যত বাড়ে, প্রাথমিক তথ্যের সামান্য ভুলও তত বড় হয়ে ওঠে। বায়ুমণ্ডলের বিশৃঙ্খল প্রকৃতি, মডেলের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং পূর্বাভাসের পদ্ধতিগত ত্রুটি মিলিয়ে দুই সপ্তাহের পর নির্ভুলতা দ্রুত কমে যায়। আবহাওয়াবিজ্ঞানে এই সময়সীমাকে প্রায়ই ‘পূর্বাভাসের অনিশ্চয়তার অঞ্চল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এডওয়ার্ড লরেঞ্জের বিশৃঙ্খলা তত্ত্বও আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের সীমাবদ্ধতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এমআইটির গবেষকেরা এই সমস্যার সমাধানে প্রচলিত মডেল বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা তৈরি করেননি। বরং বিদ্যমান মডেলের পূর্বাভাসের ভুল শনাক্ত ও সংশোধনের জন্য এর সঙ্গে একটি মেশিন লার্নিং স্তর যুক্ত করেছেন। গবেষক জুডাহ কোহেন ও তার সহযোগী লেস্টার ম্যাকি এই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেছেন। তাদের তৈরি পদ্ধতিটি অতীতের পূর্বাভাস এবং বাস্তবে পর্যবেক্ষণ করা আবহাওয়ার পার্থক্য বিশ্লেষণ করে। এরপর সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস সংশোধন করে। অর্থাৎ, মডেলটি শুধু আবহাওয়ার সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি হিসাব করে না; আগের ভুলগুলো থেকেও শেখে।
এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রচলিত পক্ষপাত-সংশোধন বা বায়াস কারেকশনের তুলনায় বেশি অভিযোজনক্ষম। সাধারণ সংশোধনপদ্ধতি অনেক সময় পূর্বাভাসকে দীর্ঘমেয়াদি গড় মানের কাছাকাছি নিয়ে আসে। কিন্তু নতুন মেশিন লার্নিং পদ্ধতিটি চরম আবহাওয়ার ঘটনাসংক্রান্ত পূর্বাভাস উন্নত করার লক্ষ্যেও কাজ করে। ফলে বন্যা, তীব্র শৈত্যপ্রবাহ কিংবা তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এর তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘমেয়াদি গড় আবহাওয়ার তথ্য দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা যথেষ্ট নির্ভুলভাবে বোঝা যায় না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের (ইসিএমডব্লিউএফ) মডেলের সঙ্গে যুক্ত করে পদ্ধতিটি পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বের অগ্রগণ্য আবহাওয়া পূর্বাভাসকেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরীক্ষায় নতুন পদ্ধতিটি দুই থেকে ছয় সপ্তাহের পূর্বাভাসের দক্ষতা দ্বিগুণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাপমাত্রা, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের বিভিন্ন পূর্বাভাসের ক্ষেত্রেও উন্নতির কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ফলাফলে বায়ুচাপের ৯১ শতাংশ, তাপমাত্রার ৯২ শতাংশ এবং বৃষ্টিপাতের ৯৮ শতাংশ পূর্বাভাস-লক্ষ্যে উন্নতি দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনটি জানিয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নতুন পদ্ধতিতে তৈরি পূর্বাভাস দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়াগত গড়ের তুলনায় ভালো ফল দেখিয়েছে। এত দিন দুই থেকে ছয় সপ্তাহের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে এই গড় মানকে ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন বলে বিবেচিত হতো। কোহেনের মতে, কৃষি ও জ্বালানি খাতের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের গড় আবহাওয়ার পূর্বাভাস উন্নত হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ, তবে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো সম্পর্কে উন্নত পূর্বাভাস সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় সুফল বয়ে আনতে পারে।
কৃষি খাতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কৃষকেরা বৃষ্টিপাত, খরা কিংবা তাপমাত্রার সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে কয়েক সপ্তাহ আগে জানতে পারলে বীজ বপন, সার প্রয়োগ ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এতে অনুপযুক্ত সময়ে কৃষিকাজের কারণে ক্ষতির ঝুঁকি কমানো এবং উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। কেনিয়ার আবহাওয়া দপ্তর ইতিমধ্যে বর্ষার পূর্বাভাস উন্নত করতে এই মডেল ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তীব্র শীতের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়া কিংবা তাপপ্রবাহে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যবহার বৃদ্ধি—দুই পরিস্থিতিই বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। কয়েক সপ্তাহ আগে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলে জ্বালানি মজুত, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থা প্রস্তুত করা সহজ হবে। একইভাবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য চরম আবহাওয়ার আগে জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল প্রস্তুত রাখতে পারবে।
এই উদ্ভাবনের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, প্রতিবেদনে বর্ণিত মডেলটি উন্মুক্ত উৎসের এবং তুলনামূলক কম ব্যয়ে ব্যবহারযোগ্য। গবেষণার কাজে সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করা হলেও চূড়ান্ত ব্যবস্থাটি চালানোর জন্য সুপারকম্পিউটার অপরিহার্য নয়। ফলে শুধু উন্নত অর্থনীতির দেশ নয়, সীমিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোর আবহাওয়া দপ্তর এবং স্থানীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোরও এটি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, উন্নত পূর্বাভাস মানেই নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বায়ুমণ্ডলের বিশৃঙ্খল প্রকৃতি এবং চরম আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। ছয় সপ্তাহ আগের পূর্বাভাসকে নির্ভুল ঘোষণা হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা হিসেবে ব্যবহার করাই যুক্তি সঙ্গত। বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্য, পর্যবেক্ষণ-তথ্যের মান এবং স্থানীয় পরিস্থিতিতে মডেলটি কতটা কার্যকর, তা যাচাই করাও প্রয়োজন।
এমআইটির এই গবেষণা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। এর তাৎপর্য শুধু কয়েক সপ্তাহ বেশি সময়ের পূর্বাভাস দেওয়া নয়, বরং প্রচলিত মডেলের সীমাবদ্ধতা কমিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কার্যকর তথ্য সরবরাহ করা। যদি বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো, কৃষি উৎপাদন পরিকল্পনা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এআইয়ের এই অগ্রগতি সেই আগাম প্রস্তুতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।