সাত বছর আগে বিপিএলে অভিষেক ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন আলিস আল ইসলাম। এরপর সময়ের সঙ্গে প্রশ্নটা আরও জোরালো হয়েছে–ঠিক কেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুযোগ দিচ্ছে না? কারণ, পারফরম্যান্স বরাবরই ছিল তার পক্ষে। তবুও অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০২৬ সাল পর্যন্ত।
ঘরোয়া ক্রিকেটে সাদা বলের সংস্করণে, আরও স্পষ্ট করে বললে টি-টোয়েন্টিতে, অনেকটা সময় ধরেই ধারাবাহিকভাবে ভালো বোলিং করে আসছেন রহস্য স্পিনার আলিস। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে ৫৯ ম্যাচে ওভারপ্রতি মাত্র সাড়ে ৬ রান দেওয়া একজন বোলারকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুযোগ দেওয়ার দাবিটা তাই যৌক্তিকই ছিল।
এশিয়ান গেসস ক্রিকেট ইভেন্ট দিয়ে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল আলিসের। ছবি: বিসিবি
তবে বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলে একটা গুঞ্জন সব সময়ই ছিল–আলিসের ভালোর জন্যই নাকি তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলাতে বিলম্ব করছে বিসিবি। কিন্তু কেন
কারণ, মাত্র দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পরই সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশনের জন্য রিপোর্টেড হয়েছেন ২৯ বছর বয়সী আলিস। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের পর আম্পায়াররা আইসিসির কাছে তার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
আইসিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আলিসের নির্দিষ্ট কোনো ডেলিভারিকে সন্দেহজনক বলা হয়নি।
আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, এখন তাকে বায়োমেকানিক্যাল ল্যাবে বোলিং অ্যাকশনের পরীক্ষা দিতে হবে। তবে পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল না আসা পর্যন্ত আলিস বোলিং চালিয়ে যেতে পারবেন।
বোলিং অ্যাকশন রিপোর্ট হওয়ার পর একজন বোলারকে সাধারণত ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে আইসিসি অনুমোদিত পরীক্ষাগারে গিয়ে বায়োমেকানিক্যাল পরীক্ষা দিতে হয়।
বোলিং অ্যাকশন নিয়ে বায়োমেকানিক্যাল পরীক্ষা দিতে হবে আলিস আল ইসলামকে। ছবি : ফেসবুক
সেই পরীক্ষায় যদি দেখা যায়, বল ডেলিভারির সময় বোলারের কনুইয়ের বাঁক ১৫ ডিগ্রির মধ্যে রয়েছে, তাহলে তার খেলা ও বোলিং চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা থাকবে না।
আর পরীক্ষায় যদি কনুইয়ের বাঁক ১৫ ডিগ্রি অতিক্রম করে এবং অ্যাকশনটি অবৈধ প্রমাণিত হয়, তাহলে? সে ক্ষেত্রে ওই বোলার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বোলিং করা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিষিদ্ধ হবেন। অ্যাকশন শুধরে আবার পরীক্ষা দিয়ে পাস করার পরই কেবল তিনি বোলিংয়ে ফিরতে পারবেন। তবে ম্যাচ খেলা চালিয়ে যেতে পারবেন বিশেষজ্ঞ ব্যাটার হিসেবে।
বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশেও অতীতে কয়েকজন বোলার সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশনের জন্য রিপোর্টেড হয়েছেন। আব্দুর রাজ্জাক থেকে শুরু করে তাসকিন আহমেদ, আরাফাত সানি কিংবা বছর দুয়েক আগে কাউন্টি ক্রিকেট খেলার সময় সাকিব আল হাসানও সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন। তবে তারা সবাই পরীক্ষা দিয়ে ফিরে এসেছেন এবং আবারও বোলিং করেছেন।
তাই আলিসকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, আলিস আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলতে নামলেই তাঁর বোলিং অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে–এমন একটা আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল।
আলিস যখনই বিপিএল কিংবা অন্য কোনো ঘরোয়া টুর্নামেন্টে ভালো করেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ব্যক্তিরা তখনই তাকে জাতীয় দলে নেওয়ার আলোচনা শুরু হলে একটা কথাই বলেছেন–আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে না খেলাটাই নাকি আলিসের ক্যারিয়ারের জন্য ভালো।
তাদের আশঙ্কা ছিল, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলতে গিয়ে বোলিং অ্যাকশন নিয়ে সমস্যায় পড়লে সেটি আলিসের ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্যারিয়ারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আলিসের বোলিং অ্যাকশনে এমন কী রয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার আগেই সন্দেহ তৈরি হয়েছিল?
কারণ, আলিসের বোলিং অ্যাকশন নিয়ে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সমস্যা ধরা পড়েছে। ২০১৯ সালের বিপিএলে প্রথমবার অ্যাকশন সন্দেহজনক হওয়ার পর আট মাস ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন তিনি। এরপর ২০২৫ সালে ফের তাঁর অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তবে সেসব পেছনে ফেলে দুর্দান্ত বোলিং করে চলতি বছর এশিয়ান গেমসের টি-টোয়েন্টি দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ পান আলিস। তবে ওয়ানডে অভিষেকের পরই খেলেন বড় ধাক্কা।
কিন্তু এই পুরো বিষয়টি নিয়ে বিসিবির কি আরও সতর্ক হওয়ার সুযোগ ছিল না? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলতে নেমে অল্প সময়ের মধ্যেই আম্পায়ারদের নজরে চলে এসেছেন আলিস। যে আশঙ্কার কথা আগে থেকেই আলোচনায় ছিল, সেটিই এবার সামনে এসেছে। আর এখানেই বিসিবির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
পাকিস্তানের সাবেক লেগ স্পিনার ও জাতীয় দলের স্পিন কোচ মুশতাক আহমেদের সঙ্গে আলিসকে বিভিন্ন সময়ে কাজ করতে দেখা গেছে। সেখানে আলিসের বোলিং অ্যাকশন নিয়ে কতটা নিবিড়ভাবে কাজ করা হয়েছে?
আলিস যে মাপের বোলার, তাতে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করবেন, এ নিয়ে সন্দেহ ছিল সামান্যই। মূল চিন্তার জায়গা ছিল তার অ্যাকশন। সে ক্ষেত্রে যথাযথভাবে প্রস্তুত না করেই মাঠে নামানো হয়ে থাকলে, সেটি বোর্ডের পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
বায়োমেকানিক্যাল ল্যাবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ফিরলেও আলিসকে ঘিরে প্রশ্নের শেষ হবে না। বরং তখন সামনে আসবে আরও বড় একটি প্রশ্ন—আগের মতো কার্যকর বোলিং করতে পারবেন তো তিনি?
কারণ, বোলিং অ্যাকশনে পরিবর্তন এলে অনেক সময় সেই বোলারের কার্যকারিতাতেও প্রভাব পড়ে। অ্যাকশন পরিবর্তনের পর আগের মতো ছন্দ ও কার্যকারিতা ফিরে পেতে বেশ সময় লেগে যেতে পারে। বছরের পর বছর একটি নির্দিষ্ট অ্যাকশনে বোলিং করার পর নতুন অ্যাকশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া মোটেও সহজ নয়।
আলিসের জন্যও চ্যালেঞ্জটা এখানেই। বায়োমেকানিক্যাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আগের সেই কার্যকর বোলিংয়েই ফিরবেন, নাকি বোলিং অ্যাকশনের পরিবর্তন তাঁর রহস্যময় স্পিনের ধার কমিয়ে দেবে? নাকি সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে আবারও নিজের ঘূর্ণিতে ব্যাটারদের নাস্তানাবুদ করবেন আলিস আল ইসলাম?
উত্তরটা সময়ই বলে দেবে।