সড়ক দুর্ঘটনার খবর নেই—এমন একটা দিন সাংবাদিকতা জীবনে বেশ বিরল। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে কোনো না কোনো সড়ক দুর্ঘটনার খবর আসে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এখন আর আমাদের মনে সেভাবে রেখাপাত করে না। সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যু এখন পরিণত শুধুই আর কিছু সংখ্যায়।
এই দেশ সড়ক দুর্ঘটনার দেশ। ‘সড়কে মৃত্যুর মিছিল’—এটা আমাদের দেশের বহুল প্রচলিত একটি বাক্য। সাংবাদিকেরা এই বাক্য প্রায়ই তাদের লেখায় ব্যবহার করেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি যেকোনো বিচারেই গভীর এক জনস্বাস্থ্য সংকট এবং অবশ্যই মানবসৃষ্ট বিপর্যয়।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ এবং বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) বিশ্লেষণ ও উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা সড়কে মৃত্যুর মিছিলের সবচেয়ে বড় দায় চালকের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ ও অদক্ষতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি। মোটরসাইকেলের বেপরোয়া চালনা সড়ক দুর্ঘটনার একটা বড় কারণ। এ ছাড়াও সড়কের প্রকৌশলগত ত্রুটি।
পরিসংখ্যান যা বলছে
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ মানুষের বিপরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার আনুমানিক হার ১৮.৬। এই হিসাবকে ধরে বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮জন মানুষ মারা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি প্রতিবেদনে বলছে, বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৯৩ শতাংশই ঘটে বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে ৫ বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ২৯ বছরের তরুণ বয়সী জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ এই সড়ক দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা আরআরআইয়ের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৬৬ জন মানুষ মারা যায়। স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে ১০৪ জন মানুষ।
সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যুর হার কী প্রতি বছর বাড়ছে?
২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কাল নিয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক হিসাবে দেখা যায়, এই ৭ বছর বাংলাদেশের সড়কে বছরে গড় মৃত্যু ৮ হাজার ২৬৫ জন। সামগ্রিকভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী বা উচ্চপর্যায়ে থাকলেও এটি বছরওয়ারি একটানা বাড়ে নি। মাঝে কিছু পতন ও উত্থান লক্ষ্য করা যায়। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর কারণে দীর্ঘসময় সাধারণ ছুটি ও লকডাউন থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে ওই বছর মৃত্যু কিছুটা কমে ৬,৬৮৬ জনে নামে। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর ২০২১ সালে মৃত্যু আবার বেড়ে ৭,৮০৯ জনে পৌঁছায় এবং ২০২২ সালে তা রেকর্ড প্রায় ৯,৯৫১ জনে গিয়ে ঠেকে। ২০২৩ সালে মৃত্যু কিছুটা কমে ৭,৯০২ জনে নামে। ২০২৪ সালে ৮,৫৪৩ জন এবং ২০২৫ সালে তা বেড়ে আবার ৯,১১১ জনে পৌঁছায়। যাত্রী কল্যাণ সমিতির ডেটা প্রমাণ করে যে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ও সংখ্যা উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
মূল কারণ কী?
বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার ৭০ শতাংশেরও বেশির পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী চালকের বেপরোয়া আচরণ ও অদক্ষতা। দেশের বিপুলসংখ্যক গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘ হেলপার’ থেকে ‘কন্টাক্টর’ এবং পরবর্তীতে সরাসরি চালক বনে যাওয়ার সংস্কৃতি বিদ্যমান।
চালকের বেপরোয়া আচরণের আরও কিছু ব্যাপার উঠে এসেছে বুয়েটের গবেষণায়। যেমন এই রুটে একাধিক বাস কোম্পানির মধ্যে ট্রিপ সংখ্যা ও যাত্রী তোলার বেপরোয়া প্রতিযোগিতা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়াও দূরপাল্লার চালকদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকা এবং একটানা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা গাড়ি চালনার ফলে মনোযোগের মারাত্মক বিচ্যুতি ঘটে, যা বড় ধরণের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার জন্ম দেয়।
গতির নেশায় অসচেতনতা
আমাদের দেশে চালকদের মধ্যে অতিরিক্ত গাড়ি চালানোর একটা প্রবণতা আছে। এটা তো সত্য যে গতির মাত্রা যতো বেশি হয়, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ততটাই। আঘাতের তীব্রতা ও মৃত্যুর শঙ্কাও ততটাই বেড়ে যায়। গতি বাড়িয়ে চালালে যে সমস্যা তা হলো গাড়ি যখন অতিরিক্ত গতিতে থাকে তখন অনাকাঙ্খিত বাধা দেখলে চালকের ব্রেক কষার সুযোগ অনেক কমে যায়। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান মহাসড়কে গতির সর্বোচ্চ পরিমাণ হচ্ছে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। ডিজিটাল নজরদারি ও তদরকির অভাবে চালকেরা এই গতি বাড়িয়ে চালান। তখন একটু অসাবধানতাতেই ব ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে।
সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের দায় কতটা?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ধরন বদলে দিয়েছে মোটরসাইকেলের ব্যাপক ব্যবহার। তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে বেপরোয়া গতিতে বাইক চালানো, সিগন্যাল অমান্য করা এবং মানহীন হেলমেট পরা বা একেবারেই হেলমেট না পরার প্রবণতা দেখা যায়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও এআরআই-এর তথ্য বলছে মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রায় ৪০%-এর বেশিই মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী। গত ৬ বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় ১১৯ শতাংশ। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিহত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশের বেশি প্রাণ হারিয়েছে মোটরসাইকেলের যাত্রী হিসেবে বা চালক হিসেবে বেপরোয়া গতির কারণে।
রাস্তার প্রকৌশল ত্রুটি কতটা দায়ী?
শুধু চালককে দোষ দিয়ে কাঠামোগত দুর্বলতা এড়ানো সম্ভব নয়। বুয়েটের এআরআই দীর্ঘকাল ধরে বলে আসছে, বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামোগত নকশাতেই রয়েছে মারাত্মক সব ত্রুটি। এই ত্রুটিগুলোকে মোটাদাগে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলোর মধ্যে আছে:
ব্ল্যাক স্পট
দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে রয়েছে অসংখ্য বিপজ্জনক বাঁক, ব্লাইন্ড কার্ভ ও অপরিকল্পিত সংযোগ সড়ক। এসব স্থানে চালকদের দৃশ্যমানতা কমে যায়, ফলে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটে।
মিক্সড ট্রাফিক
একই সড়কে দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের পাশাপাশি ধীরগতির তিন চাকার নসিমন, করিমন, সিএনজি ও ইজিবাইক চলাচলের কারণে গতির সামঞ্জস্য থাকে না। মহাসড়কে বিভাজক না থাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করে।
নিরাপত্তা নিরীক্ষার অভাব
সরকারি সড়ক নেটওয়ার্কের বিশাল অংশের কোনো নিয়মিত রোড সেফটি অডিট হয় না। অডিট হলেও নকশাগত ত্রুটি দূর করার সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়।
পরিস্থিতির উন্নতি হবে কীসে?
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, ডব্লিউএইচও বলছে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিক্ষিপ্ত উদ্যোগের বদলে প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেমন মহাসড়কে গতিসীমা নিশ্চিত করতে অটোমেটেড স্পিড ক্যামেরা, স্পিড গভর্নর এবং ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ খুবই জরুরি।
এছাড়াও ভুয়া লাইসেন্স বন্ধ করা এবং পেশাদার চালকদের জন্য বাধ্যবাধকতামূলক বৈজ্ঞানিক রিফ্রেশার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা অতি জরুরি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মহাসড়কের সমস্ত ‘ব্ল্যাক স্পট’ দ্রুত চিহ্নিত করে দূর করা উচিত। সাথে ধীরগতির যানের জন্য পৃথক ‘সার্ভিস লেন’ নিশ্চিত করা এবং ডিভাইডার বসানো দরকার। তাছাড়া জাতীয় মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত বাইক চলাচল বন্ধ করার পাশাপাশি মানহীন হেলমেটের ব্যবহারও বন্ধ করা দরকার। সেই সাথে গতিসীমা শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমেও সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা যায়।
উপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে সড়ক দুর্ঘটনা আসলে শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু চালকের আচরণে পরিবর্তন, ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের সাথে গতির লাগাম টানা এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে না পারলে সড়কে মৃত্যুর মিছিল শুধু বাড়বেই।