ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতা যেন এক নিয়মিত চিত্র হয়ে উঠেছে। প্রতিপক্ষ কিংবা ভেন্যু—কোনোটিই যেন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। ম্যাচ দেশে, জিম্বাবুয়েতে বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে যেখানেই হোক না কেন, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বড় স্কোর করার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছেন না। টপ অর্ডার থেকে মিডল অর্ডার, এমনকি লোয়ার অর্ডারেও নেই প্রত্যাশিত অবদান। ফলে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের ব্যাটিং নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
ব্যাটিংয়ের এই দুরবস্থার সর্বশেষ উদাহরণ - আফগানিস্তানের বিপক্ষে আজ ত্রিদেশীয় সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। কার্যত সেমিফাইনালে পরিণত হওয়া এই লড়াইয়ে মাত্র ১৬০ রানে গুটিয়ে গেছে বাংলাদেশের ইনিংস। অথচ সংযুক্ত আরব আমিরাতের কন্ডিশনে আগে ব্যাটিং করে বড় সংগ্রহ গড়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় সেটা আর সম্ভব হয়নি।
ত্রিদেশীয় সিরিজে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ২০০ রান করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। ছবি: আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড
২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১৪টি ওয়ানডে খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে মাত্র চারবার ২৫০ রানের বেশি করতে পেরেছে দলটি। আর ২৫০ রানের নিচে অলআউট হয়েছে ছয়বার। এর মধ্যে চারবার ২০০ রানের নিচে থেমেছে ইনিংস। বাকি চার ম্যাচে রান তাড়া করতে হয়েছে বাংলাদেশকে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫০ রানের কম। অর্থাৎ, চলতি বছর এখন পর্যন্ত আগে ব্যাটিং করে বড় সংগ্রহ গড়া বা বড় লক্ষ্য তাড়া করে জেতার পরীক্ষায় খুব একটা সফল হতে পারেনি বাংলাদেশ।
প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, আফগানিস্তান কিংবা জিম্বাবুয়ে—কারও বিপক্ষেই বড় সংগ্রহ গড়তে পারছে না বাংলাদেশ। কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে ব্যাটসম্যানদের দ্রুত রান তোলার প্রবণতাও কমেছে।
কয়েক বছর ধরেই ওয়ানডেতে অন্য দলগুলো যেখানে অনায়াসে ৩০০ বা তার বেশি রান করছে, এমনকি টি-টোয়েন্টিতেও ৩০০ রানের দিকে ছুটছে, সেখানে বাংলাদেশের জন্য ওয়ানডেতেই ২০০ রানও এখন বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজে প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৭১ রান করেছিল। জবাবে বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় ১৭২ রানে। পরের ম্যাচে আগে ব্যাট করে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৯৪ রান করে ১৫৮ রানের বিশাল ব্যবধানে জেতে আফগানিস্তান। এটা থেকে স্পষ্ট, প্রথম ইনিংসে ব্যাট করাটা এখানে সহজ। তবে বাংলাদেশ সেখানেও বাজেভাবে ব্যর্থ।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে আজ শুরুতেই চাপে পড়ে বাংলাদেশ। মাত্র ২৮ রানের মধ্যে তানজিদ হাসান, সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন ও তাওহিদ হৃদয় সাজঘরের পথ ধরেন। সেখান থেকে পারভেজ হোসেন (৭০) ও সাইফ হাসান (৪১) কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। তবে সেটা যথেষ্ট হয়নি।
প্রথম ম্যাচে হারের পর আজ এই হতশ্রী ব্যাটিংয়ের পরও অবশ্য এখনো বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠার একটা সুযোগ আছে। সেটার জন্য আফগানিস্তানকে ১২০ রানের আগেই আটকে দিতে হবে।
২০২৬ সালে ৪ বার ২০০ রানের কমে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। ছবি: আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড
তবে বাংলাদেশ এই সিরিজে ফাইনালে উঠতে পারুক বা না পারুক, ৫০ ওভারের ক্রিকেটে দল ধারাবাহিকভাবে বড় স্কোর না গড়তে পারায় ব্যাটিং নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে ব্যাটিং কোচ হিসেবে মোহাম্মদ আশরাফুলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তার সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে কিছু ইতিবাচক পারফরম্যান্স থাকলেও ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যানদের অবস্থা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।
ব্যাটসম্যানরা এতটাই খারাপ করছেন যে, প্রথম ম্যাচের পর সামগ্রিক ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন পেসার তাসকিন আহমেদও। ব্যাটসম্যানরা প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারায় দলকে ভুগতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
২০২৭ বিশ্বকাপ শুরুর আর এক বছর বাকি। আগামী বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে হতে যাওয়া সেই বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশকে তাই ঘন ঘন অধিনায়ক বা কোচ পরিবর্তনের দিকে না তাকিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাটিং পরিকল্পনা তৈরির বিকল্প নেই। সেটা না করতে পারলে বিশ্বকাপে ভরাডুবির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।