বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরা সরকারের কাছ থেকে যেকোনো ধরনের আইনি সহায়তার অধিকার রাখেন। কিন্তু কেউ যদি বিদেশের আইনে গ্রেপ্তার বা বিচারের মুখোমুখি হন তাহলে কী হবে?
সম্প্রতি সৌদি আরবে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ও তাদের সর্বোচ্চ দণ্ড কার্যকর হওয়ার পর এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, দুজন বাংলাদেশি নাগরিকের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সময় সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস কি কিছুই জানত না? দুই বাংলাদেশি নাগরিক সৌদি আরবের বাংলাদেশি দূতাবাসের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পাননি বলেই অভিযোগ আছে। এমনকি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, যখন কোনো বাংলাদেশি নাগরিক অন্য কোনো দেশের আইন ভঙ্গ করে বিচারের মুখোমুখি হবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো দণ্ড দেওয়া হবে, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তেমন কিছুই করার থাকে না।
কিন্তু এমন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিককে যেকোনো ধরনের আইনি সহায়তা কি বাংলাদেশ সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিতে পারে না? এটা ঠিক যে অন্য কোনো দেশের আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অধিকার হয়তো বাংলাদেশ সরকারের নেই, কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন নাগরিককে যেকোনো ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারটি বাংলাদেশের আইনেই আছে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনের ২৭ নম্বর ধারায় বলা আছে, ‘অভিবাসী কর্মী এবং অভিবাসনের নামে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের যুক্তিসঙ্গত আইনগত সহায়তা পাইবার অধিকার থাকিবে।’
একই আইনের ২৯ নম্বর ধারায় বিদেশে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক বিপদে পড়লে তাকে সহায়তা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বলা আছে। ৯ নম্বর ধারায় নারী কর্মীদের সহায়তার কথা বলা আছে।
আইনি সহায়তা অধ্যাদেশ ২০০০, যেটিতে ২০২৬ সালে সংশোধন আনা হয়েছে, তার ৭(১) (ঙ) ধারায় বলা আছে একটি আইনি উপদেষ্টা পরিষদ বিদেশে কর্মরত ও অভিবাসী নাগরিকদের প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা প্রদান করবেন।
সৌদি আরবে দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের দূতাবাস কিছুই জানত না বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। বিদেশের একটি আদালতে বাংলাদেশের দুজন নাগরিকের বিচার হলো, মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো, সেই রায় কার্যকরও হয়ে গেল। অথচ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ আগাম খবর পায়নি! তাহলে বিদেশে বিপদে পড়া একজন বাংলাদেশির পাশে আমাদের রাষ্ট্র আসলে কীভাবে দাঁড়ায়? আদৌ দাঁড়ায়?
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানা গেছে, দুই নাগরিকের বিচার হয়েছে তাআজির নামের একটি আইনে। ইসলামি বিচারব্যবস্থায় তাআজির এমন এক ধরনের শাস্তি, যেখানে বিচারকের বিবেচনার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র বাধ্যতামূলক শাস্তি নয়। কিন্তু আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়নি। তাই বিকল্প শাস্তি বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, সেটা জানা যায়নি।
এ অবস্থায় দুই নাগরিকের বিচার হচ্ছে, এটা যদি বাংলাদেশ দূতাবাস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানতে পারত, তাহলে কী তাদের শাস্তি লঘূ করা, আইনজীবী নিয়োগ, আপিল ইত্যাদি করতে পারত কি না, সেটা খতিয়ে দেখা জরুরি।
দুই বাংলাদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে সৌদি আরব বাংলাদেশকে কিছু জানায়নি। তাদের বিচার হচ্ছে কী অপরাধে, বিচার প্রক্রিয়া, কী শাস্তি, এমনকি দণ্ড কার্যকর হয়ে যাওয়ার সময়ও বাংলাদেশ সরকারকে কিছু জানায়নি তারা। এটা ভিয়েনা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন এই মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাকে কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার জানাতে হয়। তিনি অনুরোধ করলে তার দেশের কনস্যুলেটকে অবহিত করতে হয়। কনস্যুলার কর্মকর্তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করতে পারেন।
দুই বাংলাদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে এর কিছুই হয়নি—এটা নিশ্চিত। দুই নাগরিকের নিথর দেহ দেশে আসার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
অতীতে অন্য দেশের নাগরিকেরা সৌদি আরবে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেও নিজ দেশের সহায়তায় দণ্ড মওকুফ করেছেন—এমন নজির খুব বিরল নয়।
২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার একজন নারী গৃহকর্মীর সর্বোচ্চ দণ্ড মওকুফ করিয়েছিল দেশটির সরকার।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিদেশের মাটিতে আইন মেনে চলার ব্যাপারে বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। কিন্তু সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের ব্যাপারে সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ ছিল কি না, এত বড় ঘটনা কেউ জানতে পারল না কেন, সে বিষয় কিছুই বলেননি।