ইসলামি শরিয়াহর বিধান লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের শেয়ার কিনেছে এইচএসবিসি।
গাজায় চলমান গণহত্যা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ এবং দক্ষিণ লেবাননের দখলদারির মধ্যে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক এইচএসবিসি তাদের ইসলামিক গ্লোবাল ইকুইটি ইনডেক্স ফান্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলের সামরিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে এই অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তারা অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদান থেকে শুরু করে সামরিক কাজে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম তৈরি করে।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে প্রায় ৭৪ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে এক বছর আগে একটি ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি হওয়ার পর থেকে নিহত হয়েছে দেড় হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। ২৩ লাখ মানুষের এই ভূখণ্ড ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
এইচএসবিসির ফান্ডের এই বিনিয়োগ বেশ কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে–ইসলামি আইন মেনে চলে বলে প্রচারিত অর্থ কি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করা যায়?
এইচএসবিসির ইসলামিক গ্লোবাল ইকুইটি ইনডেক্স ফান্ড কী?
৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদের এইচএসবিসির এই ইসলামিক তহবিল মূলত মুসলিম বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয়, যা ইসলামি অর্থায়নের নীতির ভিত্তিতে বাছাই করা ইক্যুইটি বা শেয়ারে বিনিয়োগ করে।
তহবিলটির বিষয়ে ব্যাংকের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এটি ‘বিনিয়োগের মুনাফা এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের জন্য উন্নত ফলাফল–উভয়ই নিশ্চিত করে’। ওয়েসবাইটে তাদের ইসলামি ফান্ডের দর্শনকে ‘সমাজের উন্নতি সাধনকারী নৈতিক বিনিয়োগ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এতে এমন ব্যবসা ও আর্থিক কার্যক্রম বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা শরিয়াহ অনুযায়ী নিষিদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয়। এ বিষয়ে একটি ধর্মীয় কমিটির তদারকিও থাকার কথা।
এইচএসবিসি জানিয়েছে, ইসলামি নীতিগুলোর সাথে সঙ্গতি নিশ্চিত করতে তাদের একটি স্বাধীন ইসলামি কমিটি রয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান দুজন মুসলিম স্কলার বা আলেম নিয়ে গঠিত।
ইসলামিক ফান্ডের বিনিয়োগ পরিচালনার নিজস্ব ভাবনায় এইচএসবিসি বলেছে, তারা নিশ্চিত করে যে ‘কোনো কোম্পানির নিষিদ্ধ রাজস্বের উৎসের ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা নেই, যেমন অস্ত্রসংশ্লিষ্ট পণ্য বা পরিষেবা বিক্রি’।
ইসলামি অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটন বিজনেস স্কুলের প্রভাষক ওয়াহিউ জাতমিকো আল জাজিরাকে বলেন, “এইচএসবিসির পরিচলনব্যবস্থা, স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের নৈতিক প্রত্যাশা সামাল দেওয়ার পদ্ধতির সমালোচনা করার যথেষ্ট জোরালো ভিত্তি রয়েছে।” তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের ঘোষিত বিধিনিষেধ এবং প্রতিবেদন অনুযায়ী করা বিনিয়োগগুলোর মধ্যে আপাত বিরোধ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো এর ঘোষিত বিধিনিষেধ এবং প্রতিবেদনে আসা বিনিয়োগের মধ্যে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব।”
জাতমিকো আল জাজিরাকে আরও বলেন, “পুরো ইসলামি অর্থায়ন শিল্পের জন্য এটি একটি শিক্ষা হওয়া উচিত। ‘শরিয়াহ’ লেবেলের একটি নির্দিষ্ট অর্থ থাকা উচিত; এটি ভিন্নভাবে বিনিয়োগ করা এবং ইসলামি শরিয়াহর উচ্চতর নৈতিক উদ্দেশ্যগুলো অনুধাবন করার প্রত্যাশা বহন করে।”
এইচএসবিসির একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে আল জাজিরাকে বলেছেন, “আমরা বুঝি যে এই ধরনের তহবিলগুলো যেন বিনিয়োগকারীদের মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে, তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “আমরা আমাদের গ্রাহকদের যেকোনো উদ্বেগকে গুরুত্বের সাথে নিই এবং এই দৃষ্টিভঙ্গিটি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এখনো পূরণ করছে কি না, তা মূল্যায়ন করতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টাদের সাথে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করব। আমরা এই পর্যালোচনাটি দ্রুত করার এবং গ্রাহকদের যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে জানানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।”
কোন কোম্পানিগুলোতে এইচএসবিসি বিনিয়োগ করেছে?
চলতি বছরের প্রথমার্ধে এইচএসবিসির ইসলামিক তহবিলের কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর যুদ্ধের সাথে যুক্ত অন্তত পাঁচটি কোম্পানির শেয়ার কিনেছে ব্যাংকটি।
যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক মিডল ইস্ট আই এবং মার্কিন সাময়িকী হাইফেন প্রথম এই শেয়ার কেনার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্যালানটির
যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক কোম্পানি প্যালানটির টেকনোলজিস ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীকে সমর্থনের কারণে পর্যালোচনার মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কোম্পানিটি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে ‘যুদ্ধ-সম্পর্কিত মিশন’ সমর্থনে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণা দেয় এবং দেশটির প্রতি সংহতি জানাতে তেল আবিবে তাদের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক করে।
হাইফেন গত সপ্তাহে তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, এইচএসবিসির তহবিল এই মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টের ৩৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার কিনেছে।
প্যালানটির-এর সফটওয়্যার বড় আকারের তথ্য বা ডেটা একীভূত করে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তথ্য বিশ্লেষণ এবং অপারেশনাল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
গত বছরের জুনে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্যালানটির ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে তাদের সহায়তা বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কোম্পানিটির ব্যবহৃত প্রেডিক্টিভ পলিসিং প্রযুক্তি সরবরাহ করার ‘যুক্তিসঙ্গত কারণ’ ছিল, যা তথ্য বিশ্লেষণ করে লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি করে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলার প্রথম দিনে মিনাব শহরের একটি স্কুলে বিমান হামলায় ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ (যার বেশির ভাগই শিশু) নিহত হয়। ওই হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার জন্য প্যালানটির-এর সিস্টেমের ওপর নির্ভর করেছিল বলে জানা গেছে।
আরটিএক্স
মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আরটিএক্স-এর ৩৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের শেয়ার কিনেছে এইচএসবিসির তহবিল।
আরটিএক্স করপোরেশন হলো একটি মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি যার ব্যবসার মধ্যে রয়েছে রেইথিয়ন, যা ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক প্রযুক্তির একটি বড় প্রস্তুতকারক।
রেইথিয়নের মাধ্যমে করপোরেশনটি আয়রন ডোম বিমান-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপাদান এবং তামির ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য ইসরায়েল সরকার-মালিকানাধীন রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস কোম্পানির সাথে অংশীদারত্ব করে।
রেইথিয়ন এবং ইসরায়েলি কোম্পানিটি যৌথভাবে ডেভিডস স্লিং নামে আরেকটি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। রেইথিয়ন মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র এবং এমআইএম-১০৪ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও তৈরি করে, যা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। পাশাপাশি দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মোতায়েন করা এফ-সিরিজের জেটের যন্ত্রাংশও সরবরাহ করে তারা।
এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ফিলিস্তিনের গাজা ভূখন্ড। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
অ্যানালগ ডিভাইসেস
গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার মধ্যে ইসরায়েলের বৃহত্তম বেসরকারি অস্ত্র প্রস্তুতকারক এলবিট সিস্টেমস-এ যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছে এমন একটি মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি অ্যানালগ ডিভাইসেস-এর ২০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার কিনেছে এইচএসবিসি।
অ্যানালগ এমন ইলেকট্রনিক উপাদান তৈরি করে যা নজরদারি ব্যবস্থা, বিমান এবং সুনির্দিষ্ট নির্দেশিত অস্ত্রশস্ত্রে ব্যবহৃত হয়।
গত বছরের জুলাইয়ে আইরিশ অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিচ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যানালগ ডিভাইসেস ইন্টারন্যাশনাল (কোম্পানিটির আয়ারল্যান্ডে নিবন্ধিত সহযোগী প্রতিষ্ঠান) ২০২৪ সালের আগস্ট, অক্টোবর এবং নভেম্বরে ফিলিপাইনের কারখানা থেকে এলবিট সিস্টেমস-এ যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছে।
হানিওয়েল
২০২৪ সালের জুনে মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের আল-সারদি স্কুলে ইসরায়েল বোমা হামলা চালায়। ওই হামলায় অন্তত ১৪ জন শিশু এবং ৯ জন নারীসহ প্রায় ৪০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়।
আল জাজিরার ২০২৪ সালের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের একটি পরিমাপের একক তৈরি করেছিল হানিওয়েল। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সামরিক অস্ত্রে ব্যবহৃত সেন্সর এবং গাইডেন্স ডিভাইস ডিজাইন ও সরবরাহে বিশেষজ্ঞ মার্কিন কনগ্লোমারেট।
এইচএসবিসির তহবিল হানিওয়েল ইন্টারন্যাশনালের ১৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার কিনেছে।
রোলস-রয়েস
এইচএসবিসি রোলস-রয়েস হোল্ডিংসে ১৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা এ পর্যন্ত তালিকার একমাত্র ব্রিটিশ কোম্পানি, যারা সামরিক বিমান এবং সাঁজোয়া যানের জন্য ইঞ্জিন ও প্রপালশন সিস্টেম তৈরি করে।
এর জার্মান অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এমটিইউ অ্যারো ইঞ্জিন, ইসরায়েলি সামরিক যানের জন্য পাওয়ার সিস্টেম সরবরাহ করেছে, যার মধ্যে আছে মারকাভা ট্যাংক, নামার আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার ও ইতাইন সাঁজোয়া যান।
২০২৩ সালে রোলস-রয়েস সলিউশনস আমেরিকা ইসরায়েলের ইতাইন যানের জন্য পাওয়ার প্যাক সরবরাহের একটি মার্কিন সামরিক চুক্তি পায়। যেখানে পরে আরও অর্থায়ন করা হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত ইতাইন ইঞ্জিনের সম্ভাব্য ১৮০ মিলিয়ন ডলারের বিক্রয় অনুমোদন করে।
এইচএসবিসি কীভাবে অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবুজ সংকেত দিল?
ইসলামি অর্থায়ন বিশেষজ্ঞরা আল জাজিরাকে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কোন ফান্ডকে ইসলামি অর্থায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যাবে, সে বিষয়ে শিল্পখাতে একাধিক মানদণ্ড রয়েছে। কখনো কখনো এসব মানদণ্ড নির্দিষ্ট সূচকভিত্তিক হয়। বিশেষ করে, কোনটি ইসলামি অর্থায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে গণ্য হবে, তা আলেমদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে।
দার আল-আকরাম স্কুলে উদ্ধার তৎপরতা। ছবি: সংগৃহীত
ওয়াহিউ জাতমিকো আল জাজিরাকে বলেন, “আলেমরা নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধান ও বাণিজ্যিক চাপের মধ্যে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইসলামি নীতিমালাকে বাস্তব নিয়মে রূপান্তর করেন।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এসঅ্যান্ডপি এবং ডাও জোন্স সূচক কোনো কোম্পানিকে ইসলামি অর্থায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। এসঅ্যান্ডপির প্রচলিত ইসলামি অর্থায়ন সূচকগুলো সরাসরি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে বাদ দেয় না, অন্যদিকে ডাও জোন্স ইসলামিক মার্কেট সূচকগুলো তাদের যাচাই-পদ্ধতির অধীনে এসব কোম্পানিকে বাদ দেয়।
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের অর্থায়ন বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, যাচাই প্রক্রিয়ায় একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি’ রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কোম্পানির ঘোষিত প্রধান ব্যবসায়িক কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়, কিন্তু তাদের পণ্যের চূড়ান্ত ব্যবহার বা ক্রেতাদের বিষয়ে মূল্যায়ন করা হয় না।
ইব্রাহিম আল জাজিরাকে বলেন, “কোনো কোম্পানিকে প্রযুক্তি বা শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হলে, তাদের পণ্য অস্ত্রব্যবস্থায় ব্যবহৃত হলেও তারা ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাচাইয়ের ধাপ পার হয়ে যেতে পারে। এইচএসবিসির ঘটনায় ঠিক এই সমস্যাটিই দেখা যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “যাচাই প্রক্রিয়ায় সাধারণত কোনো কোম্পানির সরবরাহব্যবস্থা অনুসরণ করে দেখা হয় না যে, তাদের যন্ত্রাংশ বেসামরিক মানুষের ক্ষতিসাধনে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।”
তবে কোনো বিনিয়োগ কারিগরিভাবে ইসলামি অর্থায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, অথচ নৈতিকভাবে ইসলামি নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তার মতে, “এইচএসবিসির ঘটনাটি এই ব্যবধানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।”
ইব্রাহিম বলেন, “ইসলামি বিধানের লক্ষ্যগুলো শুধু খাতভিত্তিক বর্জনের যান্ত্রিক পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে না।” তিনি যুক্তি দেন, অস্ত্র উৎপাদন বা সামরিক চুক্তির সঙ্গে যেকোনো ধরনের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে যাচাই প্রক্রিয়ায় একটি নির্ধারিত সীমা থাকা উচিত, পরোক্ষ সম্পৃক্ততাও পর্যালোচনা করা উচিত এবং পণ্যগুলোর চূড়ান্ত ব্যবহার অনুসরণ করে দেখা উচিত।
এই অধ্যাপক বলেন, “বর্তমান ব্যবস্থা নিয়মতান্ত্রিকভাবে এসবের কোনোটিই করে না। এটি সরবরাহব্যবস্থা ও চূড়ান্ত ব্যবহার বিশ্লেষণের পরিবর্তে খাতভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং আর্থিক অনুপাতের ওপর নির্ভর করে।”
ইসরায়েলি আগ্রাসনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত ফিলিস্তিনের গাজা। ছবি: সংগৃহীত
ইব্রাহিমের মতে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করে এইচএসবিসি তাদের মুসলিম গ্রাহকদের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। তিনি বলেন, “ফান্ডটি মুসলিম সঞ্চয়কারীদের কাছে ‘শরিয়াহ-সম্মত’ হিসেবে প্রচার করা হয়। তাদের অনেকেই হালাল পেনশন স্কিমের মাধ্যমে এতে বিনিয়োগ করেন।”
“এসব বিনিয়োগকারী যুক্তিসংগতভাবেই আশা করে যে তাদের অর্থ এমন কোম্পানিগুলোকে অর্থায়ন করছে না, যেগুলো বেসামরিক মানুষের ক্ষতির সঙ্গে জড়িত,” যোগ করেন তিনি।
ইব্রাহিম ও জাতমিকো একটি মূল বিষয়ে একমত হয়েছেন, “ইসলামি অর্থায়নব্যবস্থা ‘নৈতিক বিচার-বিবেচনার দায় এমন যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ছেড়ে দেয়, যাদের পদ্ধতি অস্বচ্ছ এবং সংজ্ঞাগুলো সীমিত।”
ইব্রাহিম বলেন, “এইচএসবিসির ঘটনা একটি সতর্কবার্তা। যেটা দেখায় যে, কারিগরি শর্ত পূরণ করা আর নৈতিক আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা এক বিষয় নয়। শরিয়াহর নাম ব্যবহার করা ফান্ডগুলোর দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে শুধু বাহ্যিক কাঠামো নয়, বরং প্রকৃত কার্যক্রমও আইনের উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”