ইসরায়েলে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসের ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। তিন বছর পর রক্তক্ষয়ী এই সামরিক অভিযানে ফিলিস্তিনের এই ভূখণ্ডটি আজ প্রায় অচেনা এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলায় গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ধুলায় মিশে গেছে। বাড়িঘর ও আবাসিক এলাকা ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামো ও জরুরি নাগরিক সেবাগুলো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে।
এই যুদ্ধে অবরুদ্ধ ভূখণ্ডটির প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ক্রমাগত ইসরায়েলি হামলা ও ঘরবাড়ি ছাড়ার নির্দেশে পরিবারগুলো বারবার বাস্তুচ্যুত হয়ে নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৭৪ হাজার ২৪৫ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করা হলেও তাতে মানবিক দুর্ভোগের অবসান হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৪৬২ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। পুরো গাজাজুড়ে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা ও হামলা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা এই যুদ্ধের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন খাবার, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয় ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানোই গাজাবাসীর কাছে প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াই
গাজার মানুষের জন্য এই যুদ্ধ কেবল তাদের বসবাসের জায়গায় পরিবর্তন আনেনি, বরং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্বাভাবিক চিত্রই বদলে দিয়েছে। ঘরবাড়ি, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ ও যাতায়াত ব্যবস্থার মতো মৌলিক অধিকারগুলো এখন আর তাদের কাছে নেই।
দার আল-আকরাম স্কুলে উদ্ধার তৎপরতা। ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজন ছিল। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ পরিবারই তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে সামান্যই সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
পানির সংকট গাজায় প্রতিদিনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগস্টের শুরুতে পরিচালিত জাতিসংঘের এক জরিপে দেখা যায়, গাজার ৯১ শতাংশ পরিবার মারাত্মক পানির সংকটে ভুগছে—যা জুনে ছিল ৮৪ শতাংশ।
বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। মূল পাওয়ার গ্রিড অচল হয়ে পড়ায় জরুরি সেবা ও পরিবারগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে জ্বালানি তেল ও যন্ত্রাংশের তীব্র ঘাটতিতে সেটিও বন্ধের পথে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও ভঙ্গুর যোগাযোগব্যবস্থার কারণে যাতায়াত, ইন্টারনেট সেবা ও জরুরি সাহায্য পাওয়ার সুযোগ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক ধস ও আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি
যুদ্ধের নির্মম থাবায় গাজার অর্থনীতি পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় শিল্প ধসে পড়ায় পরিবারগুলোর আয় বন্ধ হয়ে গেছে এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা তলারানিতে ঠেকেছে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (ইউএনসিটিএডি)-এর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে বেকারত্বের হার পৌঁছেছে রেকর্ড ৭৮ শতাংশে। ২০২৫ সালে গাজাবাসীর মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ২১২ ডলার, যা ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ১৭ শতাংশ।
পণ্য পরিবহনে ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। জাতিসংঘের হিসেবে, সেপ্টেম্বরে গাজায় পণ্যের দাম ২০২৩ সালের অক্টোবর পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আয় ও কর্মসংস্থান হারিয়ে গাজার অর্থনীতি এখন সম্পূর্ণভাবে ত্রাণের নগদ অর্থ, ঋণ ও ছোটখাটো অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল। ফিলিস্তিনি অর্থনৈতিক গবেষক রামি আল-জাইগ আল জাজিরাকে বলেন, “এই যুদ্ধ গাজার সমাজ ও অর্থনীতিকে কয়েক দশক পেছনে ঠেলে দিয়েছে।”
শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিহ্ন
যুদ্ধের তাণ্ডবে গাজার পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ধসে পড়েছে। প্রায় তিন বছর ধরে অঞ্চলটির কয়েক লাখ শিশু সরাসরি স্কুলে যেতে পারছে না। বহু বিদ্যালয় বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে, আর যেগুলো টিকে আছে সেগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুলই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা তিন বছর পাঠদান থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
শ্রেণিকক্ষে ফেরার বদলে অনেক শিশু তাঁবু ও অস্থায়ী কেন্দ্রে পড়াশোনার চেষ্টা করছে, আর প্রায় ২ লাখ শিশু শিক্ষার সব ধরনের সুযোগ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সতর্ক করে জানিয়েছে, টানা শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শিশুদের মৌলিক দক্ষতায় বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা পুরো একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবার বিপর্যয়
গাজার চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের সবকটিই কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বর্তমানে আংশিকভাবে চালু রয়েছে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল, তবে সেখানে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
চালু থাকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ডায়াগনস্টিক কিট এবং জেনারেটরের জ্বালানির তীব্র সংকট রয়েছে। এর ফলে ক্যানসার, ডায়ালিসিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীরা কোনো চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
গাজার বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও বন্ধ বললেই চলে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, আরও কয়েক হাজার মুমূর্ষু রোগীর জরুরি বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন, যা গাজার ভেতরে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পানি-স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে বিভিন্ন ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে, যা মোকাবিলায় গাজার স্বাস্থ্য খাত একেবারেই প্রস্তুত নয়।
সংকুচিত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড
যুদ্ধের ফলে গাজার ভৌগোলিক মানচিত্রই বদলে গেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে পুরো ভূখণ্ডটি খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছে।
‘ইয়েলো লাইন’ নামে ইসরায়েল একটি সামরিক সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’র পর ইসরায়েলি বাহিনী এই সীমানা জনবসতিপূর্ণ এলাকার আরও ভেতরে সম্প্রসারিত করেছে। ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর জানায়, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকাই এখন ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে। ফলে গাজার ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি মাত্র ৩০ শতাংশের কম জায়গায় গাদাগাদি করে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি এলাকা। ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরটি এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহতে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ফলে সেখান থেকে ৮ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। বর্তমানে রাফাহর পশ্চিমাঞ্চলীয় আল-মাওয়াসি ছাড়া প্রায় পুরো শহরই ইসরায়েলের দখলে, যার ফলে বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা আর নিজেদের ঘরে ফিরতে পারছেন না।
নিরাপত্তাহীনতা ও প্রশাসনিক শূন্যতা
২০০৭ সাল থেকে গাজা পরিচালনা করে আসা হামাসের প্রশাসনিক ও বেসামরিক সুরক্ষা কাঠামো যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত জুলাইয়ে হামাস ঘোষণা দেয়, তারা যুদ্ধ-পরবর্তী প্রশাসনিক দায়িত্ব ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি)-এর কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা করছে। তবে বাস্তবে এই হস্তান্তর এখনও কার্যকর হয়নি।
অন্যদিকে, হামাস নিয়ন্ত্রিত পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের ওপর ইসরায়েলি হামলার কারণে গাজায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় সেখানে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে রাহাজানি, অপহরণ, সম্পত্তিতে হামলা এবং ত্রাণবাহী ট্রাকে লুটপাটের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।
তিন বছরের টানা যুদ্ধ শেষে গাজার মানুষের সামনে ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন বা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কোনো সুস্পষ্ট পথ নেই। অনিশ্চয়তার সাগরে দাঁড়িয়ে গাজাবাসীর একটাই প্রশ্ন—এই নরকযন্ত্রণা থেকে তারা কবে মুক্তি পাবেন?