ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের দল খুব ভালো কিছু করবে, এমনটাই ছিল সবার প্রত্যাশা। নিজেদের প্রিয় ফরম্যাট বলে পরিচিত, যা ছিল একটা লম্বা সময় ধরে, সেই ওয়ানডে ক্রিকেটে লিটন দাসের অধিনায়কত্বে বাংলাদেশের নতুন যুগের পথচলা শুরু হওয়ার কথা ছিল এই সিরিজ দিয়ে। কিন্তু ইনজুরির কারণে লিটন পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেছেন। তার বদলে দায়িত্ব পাওয়া তাওহিদ হৃদয় প্রথম ম্যাচে ভালো শুরু এনে দিতে পারেননি। জিম্বাবুয়ের কাছে ১০১ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে গেছে বাংলাদেশ। ফাইনালের আগেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার সম্ভাবনা জেগেছে বাংলাদেশের সামনে।
কিন্তু কেন এই বিপর্যয়? যে ওয়ানডে ক্রিকেটকে বাংলাদেশের প্রিয় ফরম্যাট বলা হচ্ছে, সেটা ছিল ২০২৩ সাল পর্যন্ত। ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই সময়টাতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ছিল একটা সোনালি সময় এবং সবচেয়ে বড় বড় অর্জন, সাফল্যগুলো ধরা দিয়েছিল এই সময়টাতে একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে, আর সেটা হচ্ছে ওয়ানডে ক্রিকেট।
টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টিতে সেই সময় বাংলাদেশ মোটেও ভালো কোনো দল ছিল না। সেখান থেকে এখন টেস্টে বাংলাদেশ ভালো করছে, টি-টোয়েন্টিতেও মোটামুটি ধারাবাহিক হচ্ছে বাংলাদেশ দল। কিন্তু ওয়ানডেতে গত কয়েক বছরে যেন পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার দশা হচ্ছে বাংলাদেশের।
অধিনায়কত্বের বদলেও এখানে বড় একটা ভূমিকা রেখেছে। নাজমুল হোসেনের অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে ভালোই করছিল। এরপর আচমকাই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেকগুলো সিরিজ জেতার পর তাকে আর রাখা হয়নি। লিটনকে এখন অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি নিজেকে প্রমাণের আগেই চোট পেয়ে এই ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে ছিটকে গেছেন।
ফলে বাংলাদেশ দলে প্রতিনিয়ত একটা ফরম্যাটের অধিনায়কত্বের বদল হচ্ছে। ২০২৭ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে যখন একেকজন ভিন্ন ভিন্ন অধিনায়ককে দায়িত্ব দেওয়া হয়, পরিকল্পনা বদলে যায়। এগুলো গোটা দলের ওপর একটা বড় প্রভাব ফেলে। কারণ, একেকজন অধিনায়কের চিন্তাভাবনা একেক রকম।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশ ২২২ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে ১৭১ রানে গুটিয়ে গেছে। তবে জিম্বাবুয়ের মতো একটা দলের সঙ্গে এমন পারফরম্যান্স বলে যদি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে চাইলে সেটা বড্ড বড় ভুল হবে। কেননা, সাম্প্রতিক সময়ে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে নিজেদের খেলা চারটি ওয়ানডের মধ্যে বাংলাদেশ জিততে পেরেছে মাত্র একটিতে। চলতি বছরই জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে বাংলাদেশ ওয়ানডে সিরিজে হেরে গিয়েছিল ২-১ ব্যবধানে।
ফলে ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে, এটা বলা ভুল। বরং ফ্ল্যাট বা স্পোর্টিং উইকেটে জিম্বাবুয়ে যে বাংলাদেশের চেয়ে ওয়ানডেতে ভালো দল, সব বিভাগেই এটা তারা বারবার প্রমাণ করে দিচ্ছে। আগামী বছরের ওয়ানডে বিশ্বকাপের অন্যতম স্বাগতিক আবার জিম্বাবুয়েই। ফলে কঠিন চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করছে আগামী এক বছরে।
বাংলাদেশ দলের কী করার আছে, উন্নতি কোথায়—সেটা নিয়ে যদি বিশ্লেষণ করতে বলা হয় কাউকে, তাহলে অনেকগুলো জায়গায় উন্নতির বিষয়টি চলে আসবে। যে ফাঁকফোকরগুলো বাংলাদেশ ঘরের মাঠে সিরিজগুলোতে ঢেকে রাখতে পারলেও, যখনই ফ্ল্যাট উইকেটে খেলা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ তা পারছে না।
পার্টটাইম স্পিনে ২ উইকেট নিয়েছেন সাইফ হাসান। ছবি : বিসিবি
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ভালো না করার কারণ তিন বিভাগেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচেই বাংলাদেশ দলের বোলাররা শুরুটা কিন্তু ভালোই এনে দিয়েছিলেন, বিশেষ করে তাসকিন আহমেদ। তিনি জিম্বাবুয়ের প্রথম তিনটি উইকেট নেওয়ার পর দলটির স্কোর দাঁড়িয়েছিল মাত্র ২৪। সেখান থেকে জিম্বাবুয়ে চতুর্থ উইকেটে পায় ১৫০ রানের বিশাল একটা জুটি, যা গড়েন ব্র্যান্ডন টেইলর এবং ক্রেইগ এরভিন মিলে। দুজনই সেঞ্চুরি বঞ্চিত হয়েছেন। ব্র্যান্ডন টেইলর আউট হয়েছেন ৮১ রানে আর এরভিন করেছেন ৯০ রান।
কিন্তু এই যে শুরুর বিপর্যয়ের পর মিডল অর্ডারের যে শক্তিমত্তা, যে অভিজ্ঞতা আছে জিম্বাবুয়ের, সেটাই বাংলাদেশের নেই। আর এই কারণেই এরকম পরিস্থিতি থেকে জিম্বাবুয়ের মতো একটা দলও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। জিম্বাবুয়ের প্রথম দিকের ইনিংস আর শেষের দিকের ইনিংসের যে তফাত, এটাই দুই দলের মধ্যে একটা বড় ব্যবধান তৈরি করে দিচ্ছে বারবার।
জিম্বাবুয়ের টেইলর যে ভূমিকা পালন করতে পারছেন, বাংলাদেশের লিটন, তাওহিদরা সেটা পারছেন না। এরভিন যা পারছেন, সেটা হয়তো নাজমুল, মোসাদ্দেকরা পারছেন না। আর এই কারণেই বাংলাদেশ দল শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে গেলে মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা টেস্টে হাল ধরলেও ওয়ানডেতে নিয়মিতভাবে পারছেন না।
শুরুতেই ৩ উইকেট নিয়েছেন অভিজ্ঞ পেসার তাসকিন আহমেদ। ছবি : বিসিবি
এরপরও বাংলাদেশের ফিরে আসার অবশ্য একটা সুযোগ ছিল। বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে কয়েকটি উইকেট তুলে নিয়ে একপর্যায়ে ২২৪ রানে জিম্বাবুয়ের সাতটি উইকেট তুলে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে আবার নবম উইকেটে জিম্বাবুয়ে আরেকটি জুটি পেয়ে যায় ৩৭ রানের। আর সেটা জিম্বাবুয়েকে ২৭২ রান পর্যন্ত নিয়ে গেলে তখনই মনে হচ্ছিল, এই রান তাড়া করাটা মোটেও সহজ হবে না।
কেননা, বাংলাদেশের জন্য এই ২০২৬ সালে এসেও ৩০০-৩৫০ প্লাস স্কোর করা কঠিন। যে দলগুলো এমন স্কোর করছে, তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশ দল এখনো ২৫০ রানের বেশি লক্ষ্য পেলেই অনেকটা ধুঁকতে হয়। আর এত বড় রান তাড়া করার রেকর্ডও এখনো বাংলাদেশের সমৃদ্ধ নয়।
সেই জায়গা থেকে তানজিদ হাসান অবশ্যই শুরুটা ভালো এনে দিয়েছিলেন। তার ৪৬ রানের ইনিংসটা বাংলাদেশকে ইতিবাচক একটা সূচনা এনে দিলেও অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানরা একেবারেই তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি। সৌম্য সরকার এত দিন পর সুযোগ পেয়ে ওপেনিংয়ে মাত্র ৯ রান করতে সমর্থ হন। নাজমুল আরও একবার ওয়ানডেতে ব্যর্থ হয়েছেন চার রান করে।
এরপর ইনিংসে লিটনের জায়গায় চারে নেমে যাওয়া সাইফ হাসান ২৬ রানের একটা ইনিংস খেলেছেন এবং বাজে শটে উইকেট বিলিয়ে দিয়েছেন। জিম্বাবুয়ের মিডল অর্ডারকে যেখানে পেয়েছিল ১৫০ রানের জুটিতে, সেখানে বাংলাদেশের মিডল অর্ডারে অধিনায়ক তাওহিদ, মোসাদ্দেক বা নুরুল হাসান কেউই দলের জন্য ভরসা হতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত রিশাদ হোসেনের ক্যামিওতে কোনোমতে ১৭২ রান পর্যন্ত যেতে পেরেছে বাংলাদেশ। আর তার চেয়েও বিস্ময়কর হচ্ছে, পেরেছে মাত্র ৩৩.৪ ওভার। চলতি বছর অনেকগুলো ম্যাচেই এরকম দেখা গেছে। ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ৫০ ওভারের কোটাই পূরণ করতে পারছে না। সেটা আগে ব্যাটিং করে হোক বা পরে ব্যাটিং করে হোক, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর আগেই বাংলাদেশের ইনিংস গুটিয়ে যাচ্ছে।
ব্যাটিং ব্যর্থতা এরকম থাকলে বোলারদের করার থাকে সামান্যই। এই ম্যাচে বাংলাদেশের বোলাররা ফ্ল্যাট উইকেটে বল করলেও খুব একটা মন্দ করেননি। ২৭২ রান তাড়া করার মতোই ছিল। কিন্তু ব্যাটিংয়ে যে সমস্যাটা, তা হলো ওপেনার তানজিদ প্রায় সময়ই খুব ভালো কিছু ইনিংস খেলেন, কিন্তু তিনি ভীষণ অধারাবাহিক।
তার সঙ্গে সাইফ হাসানের টেকনিক থেকে শুরু করে সবকিছুই ভীষণ নড়বড়ে। তবুও তাকে ওপেনিং থেকে সরানো যাচ্ছে না। এর একটি কারণ বাংলাদেশের ষষ্ঠ বোলিং অপশনটা সেভাবে নেই। এই কারণে সাইফকে বাংলাদেশ দল এখনো ওপেনার হিসেবে খেলিয়ে যাচ্ছে। এই ম্যাচেও বল হাতে দুটি উইকেট নিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, সৌম্য ব্যাকআপ ওপেনার হিসেবে ভালো নন। নাজমুলের ফর্মটাও নড়বড়ে এবং লিটন ওয়ানডে ক্রিকেটে ‘হিট অ্যান্ড মিস’ অবস্থায় আছেন। তাকে বিশ্বকাপ পর্যন্ত অধিনায়ক করে দেওয়াটা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের জন্য বুমেরাং হতেই পারে। কারণ, তিন ফরম্যাটে কিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে আধুনিক সময়ে বলতে গেলে সেভাবে কেউই খেলেন না। লিটন খেলছেন বলেই তার চোট সমস্যাও বাড়ছে।
তাওহিদ ওয়ানডেতে যতগুলো ভালো ইনিংস খেলেছেন, সেগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ হেরে গেছে। মোসাদ্দেক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে দুর্দান্ত একটি ফিফটি দিয়ে কামব্যাক করেছিলেন বটে। কিন্তু এরপর থেকে ওয়ানডেতে তার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ইনিংস নেই তার।
এরকম একটা অবস্থায় ব্যাটিং নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বকাপে ভালো করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। কারণ, বিশ্বকাপের এখনো বাকি অনেক সময়। কিন্তু ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচটা এটা দেখিয়ে দিয়েছে, উন্নতির জায়গা আছে অনেক। বোলিংয়ে পঞ্চম ও ষষ্ঠ বোলিং অপশনটা বাংলাদেশের জন্য এখনো চিন্তার কারণ, এবং সেটা মিরাজ খেললেও।
তারকা লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন ওয়ানডেতে এখনো বাংলাদেশের জন্য তিনি একটা হতাশার নাম। এই ম্যাচেও নয় ওভারে ৫৭ রান দিয়েছেন। তাই একমাত্র স্পেশালিস্ট স্পিনার হিসেবে রিশাদকে খেলানো হবে, নাকি অন্য কাউকে বাজিয়ে দেখার সময় এসেছে, সেটা নিয়েও চিন্তা করতে হবে টিম ম্যানেজমেন্টকে।
তাই আফগানিস্তানের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচের আগে বাংলাদেশকে অনেক বিষয় নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে উন্নতি করতে হবে। ফাইনালের আগেই বিদায় নিতে হবে বাংলাদেশকে, যা নিশ্চিতভাবে হবে বড় এক ধাক্কা।