আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৭ ডলার ছুঁয়েছে। এটি সাড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। দেশে কয়েকদিন আগে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে এখন ভোক্তাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে—বিশ্ববাজারে তেলের এই দাম কি বাংলাদেশের বাজারেও আগুন ধরাবে?
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর (৮ মার্চ) ব্রেন্ট ক্রডের প্রতি ব্যারেলের দাম ১৩৯ ডলার ছাড়িয়েছিল। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দেয়। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের বেশি ছিল। মে মাসের মাঝামাঝি এই দাম ১০৯ ডলারে পৌঁছায়।
এরপর দাম নিম্নমুখী থাকলেও সৌদি আরবে হুতিদের অব্যাহত আক্রমণ এবং ইরানে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কায় সেপ্টেম্বর থেকে আবার বাড়তে থাকে দাম। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আবারও ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার জেরে শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ দশমিক ৭২ ডলারে ওঠে।
এদিকে, বৈশ্বিক এ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বিশ্বব্যাপী বাড়লেও চলতি বছরের মে মাসের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে এ দাম নিম্নমুখী ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ২০ টাকা বাড়িয়ে দেয় সরকার। এতে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিসহ জীবনযাপনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সম্প্রতি ব্রেন্ট ক্রডের দাম ফের বৃদ্ধি পাওয়ায় অজানা শঙ্কায় পড়েছেন দেশের জ্বালানি তেলের ভোক্তারা।
তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান চরচাকে বলেন, “বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি মনিটর করা হচ্ছে। দেশে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত আছে এবং পাইপলাইনে যে তেল আছে, তাতে শঙ্কার কোনো কারণ নাই।”
বিপিসির এ পরিচালক বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ পড়ে। তবে বাংলাদেশ যে পরিশোধিত ডিজেল, পেট্রোলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে, সেগুলোর দাম, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহকারীর প্রিমিয়াম এবং ডলারের বিনিময়হারও আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু ব্রেন্টের দাম দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ করা যাবে না।”
গত ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, দেশে ২ লাখ ১ হাজার ৬১০ টন ডিজেলের মজুত রয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা। এ ছাড়া ১৭ দিনের পেট্রোল ও ৩১ দিনের অকটেনের মজুত রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) দেশে পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। এ সময়ে এসব পণ্য আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ৩৭০ কোটি ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২২৮ কোটি ডলার। অপরিশোধিত তেল আমদানির এলসির মূল্যও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। আগের বছরের একই সময়ে এ খাতে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ২০ কোটি ডলারের কিছু বেশি, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বেড়ে প্রায় ৬৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। পেট্রোলিয়াম আমদানির এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে ২৬ শতাংশ, যার মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৯৩ কোটি ডলার।
তবে এলসির মূল্য বাড়লেও একই সময়ে জ্বালানি আমদানির পরিমাণ একই হারে বেড়েছে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের। পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত না হলেও আমদানি ব্যয় যে বেড়েছে বিভিন্ন সূচক থেকে তা স্পষ্ট।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন চরচাকে বলেন, “এই ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর সাথে জ্বালানি আমদানির পরিমাণের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।”
এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘‘সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে কৃষি, যোগাযোগ ও নিত্যপণ্যের দামে। কাজেই জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনায় সরকারকে আরও মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য সরকারকে তৈরি থাকতে হবে।”
তবে বিপিসি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানির ব্যয় এবং দেশের খুচরা বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে সংস্থাটির আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। এই ঘাটতি সরকারকে ভর্তুকি, ঋণ বা অন্য আর্থিক সহায়তা দিতে বাধ্য করবে; অথবা ভবিষ্যতে আবারও দাম সমন্বয়ের চাপ তৈরি হবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে।