ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। বুথফেরত জরিপের (এক্সিট পোল) তথ্য বলছে, সরকার গঠন করার জন্য কোনো দলই পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় আসন পায়নি।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ভোট শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। বুথ ফেরত প্রাথমিক জরিপে প্রথমদিকে বিরোধী জোট এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া যায়। তবে পরে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট অল্প ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
ইসরায়েলের চ্যানেল টুয়েলভের বরাতে আল জাজিরার খবরে জানা যায়, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫২ আসনে এগিয়ে আছে। আর সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৯ আসনে এগিয়ে আছে। আরব লিস্ট এগিয়ে আছে ১৯ আসনে।
তবে ইসরায়েলের প্রধান সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান ইলেভেন এবং চ্যানেল থার্টিনের খবরে জানা যায়, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী শিবির এবং আইজেনকোটের বিরোধী শিবির—উভয় পক্ষই ৫১টি আসনে জিতেছে।
ইসরায়েলের এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। ছবি: রয়টার্স
এর ফলে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে (নেসেট) কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৬১ আসন) নিশ্চিত করতে পারছে না।
এর আগে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ। ভোট শেষ হওয়ার পরপরই প্রকাশ করা হয় বুথফেরত জরিপ বা এক্সিট পোলের ফলাফল।
বিবিসি বলছে, গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির ইতিহাসে এ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই এই নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিবিসি জানিয়েছে, ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি থেকে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত আড়াই শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। এবারের নির্বাচনে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে, চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে, বুথ ফেরত জরিপের পর তেল আবিবে আইজেনকটের দল ইয়াশারের প্রধান কার্যালয়ে সমর্থকদের উল্লাস করতে দেখা যায়। ‘বিবি (নেতানিয়াহু), গো হোম’ বলে স্লোগানও দেন তারা। আইজেনকট বলেন, তারা ‘ইতিহাস গড়েছেন’। আইনজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটের আরেক শরিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ বলেন, নেতানিয়াহুর জোট ‘বড় ধরনের পরাজয়ের’ মুখে পড়েছে।
নেতানিয়াহু কী করবেন এখন?
বিবিসির খবর বলছে, জেরুজালেমে নেতানিয়াহুর দল লিকুদের প্রধান কার্যালয়ে আত্মসমর্পণের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী, পার্লামেন্টে একক দল হিসেবে লিকুদই সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের দিন জেরুজালেমের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স
নেতানিয়াহুর মিত্র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার বলেন, বামপন্থীদের উল্লাস করা ‘খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে’। সরকার গঠন করার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছেন কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরও।
পরে লিকুদের কার্যালয়ে এসে ভাষণ দেন নেতানিয়াহু। তিনি দাবি করেন, তার ডানপন্থী জোটের হাতে ‘বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ রয়েছে। তিনি একটি ‘শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার’ গঠনেরও আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, আরবদের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি বেশি হওয়ায় দেশটির দুটি আরব দল–ইউনাইটেড আরব লিস্ট ও জয়েন্ট লিস্ট পার্লামেন্টে আগের চেয়ে কয়েকটি বেশি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব। তাদের অনেকেই নিজেদের ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডভ ওয়াক্সম্যান আল জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সরকার গঠন করা তার জন্য কঠিন হতে পারে। তার মতে, নেতানিয়াহুর জোটের বিরোধী দলগুলো পার্লামেন্টে প্রায় ৬৮টি আসন পেতে পারে।
ওয়াক্সম্যান বলেন, “ইসরায়েলের বেশির ভাগ ভোটারই চান না, নেতানিয়াহু আর প্রধানমন্ত্রী থাকুন। তারা তার বর্তমান জোট সরকারকেও ক্ষমতায় দেখতে চান না। নেতানিয়াহুর পক্ষে সরকার গঠনের মতো জোট তৈরি করার কোনো পথ আমি দেখছি না।”
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের দিন দেশটির মাগার শহরের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার সময় মেয়েকে কোলে নিয়ে আছেন ফিলিস্তিনি প্রার্থী ও রা’আম পার্টির নেতা মানসুর আব্বাস। ছবি: রয়টার্স
ওয়াক্সম্যানের মতে, নেতানিয়াহু আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে সরকার গঠনের অনুপযুক্ত রাজনৈতিক সঙ্গী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন। এতে আইনজেনকটের পক্ষে ওই দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, “নেতানিয়াহু যদি আইনজেনকটকে সরকার গঠন করতে বাধা দিতে পারেন, তাহলে আবার নির্বাচন হবে।”
ওয়াক্সম্যান আরও বলেন, নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরবর্তী নির্বাচনে তার দল আরও ভালো ফল করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে থাকা প্রধানমন্ত্রী হলেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গত ১৭ বছরের মধ্যে ১৫ বছরেরও বেশি সময় তিনি দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। সব মিলিয়ে তার প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ ১৯ বছর।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কথিত ব্যর্থতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দেশে ও বিদেশে তার ওপর চাপ বাড়ছে। ২০১৯ সাল থেকে তিনি দুর্নীতির মামলারও মুখোমুখি হচ্ছেন। তাই এই নির্বাচনে পরাজিত হলে দুর্নীতির মামলায় নেতানিয়াহুর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে শেষ পর্যন্ত তার কারাদণ্ডও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা, তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে এই নির্বাচনের ফল।