ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের মূল্যায়ন করতে মঙ্গলবার রেকর্ডসংখ্যক ভোটার দেশটির নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। কেউ কেউ এই নির্বাচনকে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন বলে বর্ণনা করেছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর প্রথম নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন ইসরায়েলিরা। এই নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রগুলোর বাইরে দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার ডানপন্থী মিত্রদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে দেশটির সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে।
প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর প্রকাশিত বুথফেরত জরিপে নির্বাচনে কোনো স্পষ্ট বিজয়ীর আভাস পাওয়া যায়নি। নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট—কেউই পার্লামেন্টে (নেসেট) সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে রয়েছেন বলে জরিপে দেখা যায়নি।
এর আগে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, রেকর্ড গতিতে ভোটগ্রহণ চলছে। রাত ৮টা (বাংলাদেশ সময় ১২টা) পর্যন্ত ভোট পড়ার হার ছিল ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জোটকে নির্বাচনী প্রচারের প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন নেতানিয়াহু। ট্রাম্পও তাকে সমর্থন দিয়েছেন।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘ভীতির পরিবেশ তৈরি করে’ নির্বাচনী প্রচার চালানোর অভিযোগ করেছেন আইজেনকট। তিনি বলেছেন, জনগণের নির্বাচিত যেকোনো নেতার সঙ্গেই ট্রাম্প কাজ করবেন বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোটের নীতি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিভাজন বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর করেছে। তবে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের শত্রুদের মোকাবিলা করার মতো দৃঢ়চেতা একমাত্র নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে হার্জলিয়া শহরের একটি ভোটকেন্দ্র ভোট দেওয়ার পর সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াই, প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকট
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতা নেতানিয়াহু ১৯ বছর ধরে বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দেশটির রাজনীতিতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে অনন্য। তার জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ক্রমেই আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ইসরায়েলের খণ্ডিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে ডানপন্থী, উগ্র ডানপন্থী ও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত তার জোটকে ক্ষমতাচ্যুত করা বিরোধীদের জন্য কঠিন।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট। সাবেক এই সেনাপ্রধান ও কঠোর নিরাপত্তানীতির সমর্থক ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী দলগুলোর পাশাপাশি ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়া বামপন্থীদের অবশিষ্ট অংশের সমর্থন নিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান। জনমত জরিপে দুই নেতার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কারও পক্ষেই সহজে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে না।
রেকর্ডসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে পূর্বাভাসদাতারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের আসন বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমতে পারে। একই সঙ্গে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গঠিত যেকোনো সরকারের জন্য আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও বাড়তে পারে। ইহুদি দলগুলোর নেতাদের মধ্যে এ সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের দিন হার্জলিয়া শহরের একটি ভোটকেন্দ্রে সন্ধ্যায় বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে ভোট দিচ্ছেন এক নবদম্পতি। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
বামপন্থী ও আরব ইসরায়েলিদের মধ্যে বেশি ভোট পড়ার প্রবণতার ভারসাম্য আনতে নেতানিয়াহু তার সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আপনাদের সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। এটি একটি নির্ণায়ক মুহূর্ত।”
তেল আবিবের কাছে রামাত গানের বাসিন্দা ৮১ বছর বয়সী রুথ এপস্টেইন দীর্ঘদিনের বামপন্থী ভোটার। তিনি বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটসকে ভোট দিয়েছেন।
এপস্টেইন বলেন, “আমার মনে হয়, আমি যতগুলো নির্বাচন দেখেছি, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতানিয়াহুর পাশে রয়েছেন। ট্রাম্প বলেছেন, তাদের উচিত “কাজটি শেষ করা”।
১২০ আসনের পার্লামেন্টে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট—কেউই যদি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জোট গড়তে না পারেন, তাহলে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন।
২০০৯ সালের পর নেতানিয়াহুকে মাত্র একবার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরাতে পেরেছেন তার বিরোধীরা। সে ক্ষেত্রেও দুই বছরে চারটি অনিষ্পন্ন নির্বাচনের প্রয়োজন হয়েছিল। ১৮ মাস পর তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন।
‘নতুন চেতনা’ দেখছেন আইজেনকট
নেতানিয়াহুর অনেক বিরোধীর কাছে এবারের নির্বাচনের মূল প্রশ্ন হলো ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বিরোধী গোষ্ঠীগুলো জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে নেতানিয়াহু এ ধরনের তদন্তের বিরোধিতা করে আসছেন।
দক্ষিণ ইসরায়েলের কিবুতজ নির ওজ সফরের সময় আইজেনকট বলেন, “আমি নিশ্চিত, আজকের দিন শেষে আমরা পরিবর্তন দেখতে পাব—ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য একটি নতুন চেতনা, যা গত তিন বছরের ঘটনাবলি এবং সেই ভয়াবহ দিনের ক্ষত নিরসনে ভূমিকা রাখবে।”
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের দিন বেনেই ব্রাক শহরের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন এক ইসরায়েলি নাগরিক। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় আক্রান্ত এলাকাগুলোর অন্যতম নির ওজ। ওই হামলায় হামাসের হাতে অপহৃত হয়ে গাজায় নিয়ে যাওয়া ২৫১ জনের একজন গাদি মোজেসের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যান আইজেনকট।
গাজা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের পাল্টা যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আইজেনকটের মতে, এই যুদ্ধ ইসরায়েলের জন্য ব্যর্থতা, কারণ হামাস এখনো গাজার ক্ষমতায় রয়েছে। সরকার গঠনের ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া বা ধ্বংস করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
নেতানিয়াহুর জোটের উগ্র ডানপন্থী দলের নেতা ইতামার বেন-গভির মঙ্গলবার সকালে অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিরিয়াত আরবা বসতিতে ভোট দেন। তিনি পূর্বাভাস দিয়েছেন, নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তার দল সরকারে ডানপন্থীদের প্রধান শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের দিন দেশটির মাগার শহরের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার সময় মেয়েকে কোলে নিয়ে আছেন ফিলিস্তিনি প্রার্থী ও রা’আম পার্টির নেতা মানসুর আব্বাস। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
আরব ভোটারদের উপস্থিতি হতে পারে নির্ধারক
আরব দলের প্রার্থী আহমেদ তিবি বলেছেন, ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি “বিকল্প সরকার গঠনের পথ তৈরি করবে এবং ভয়াবহ বাস্তবতা পরিবর্তনে সহায়তা করবে।”
আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তবে কিছু পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে তিনি আরব দলগুলোর সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন।
জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব ইসরায়েলিদের নেতানিয়াহু বারবার হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বিরোধীদের অভিযোগ, এ ধরনের বক্তব্য বর্ণবাদী অবস্থানের পর্যায়ে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বোরকা বা নিকাব পরা কিংবা কয়েকজন আরব নারীর ক্ষুব্ধ মুখাবয়বের ছবি প্রকাশ করেন। তার দাবি, ছবিটি একটি ভোটকেন্দ্রের। ওপেনএআইয়ের যাচাইসংক্রান্ত ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটি তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সরঞ্জাম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের দিন জেরুজালেমে দেয়ালে সাঁটানো বিজ্ঞপ্তি দেখছেন অতি-রক্ষণশীল ইহুদিরা। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির পতাকাবাহী গাড়ি জেরুজালেমের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। গাড়িগুলোর মাইকে আজান বাজানোর পাশাপাশি বলা হচ্ছিল, “এখনই ঘর থেকে বেরিয়ে আসুন! আরবরা ভোট দিচ্ছে!”
ইসরায়েলের প্রায় সব ইহুদি দলীয় নেতার মতো আইজেনকটও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধী। একসময় ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কয়েক দশকের শান্তি আলোচনার ভিত্তি ছিল এই সমাধান।
তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের পর থেকে এ সহিংসতা বেড়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী জোটসঙ্গীদেরও বিরোধিতা করেন তিনি।