কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জোয়ার শুরুর চার বছর পর, বিনিয়োগকারীরা এখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন যে এই ধারা আর কতদিন অব্যাহত থাকবে। সোমবার, ‘ক্লড’ চ্যাটবটের নির্মাতা এবং অত্যাধুনিক এআই মডেল তৈরির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’ ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির একটি চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের মতে, এই প্রযুক্তির হাত ধরে বিজ্ঞানের অগ্রগতি, রোগের নিরাময় আবিষ্কার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন সম্ভব। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে তাদের সম্ভাব্য সর্ববৃহৎ ‘ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং’ (আইপিও) বা শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই বিবরণ তুলে ধরেছে।
পত্রিকাটি লিখেছে, অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও আমো দেই এবং কোম্পানির অন্য ছয় প্রতিষ্ঠাতা একটি অত্যন্ত প্রতীক্ষিত করপোরেট নথিতে উল্লেখ করেছেন, “আমরা বিশ্বাস করি যে, মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হলো এআই।” এই নথির মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, কোম্পানিটির শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি।
আমো দেই এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতারা আরও জানান, সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক তাদের এই কোম্পানির লক্ষ্য হলো এআই-এর সুফলগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং একই সঙ্গে “এত দ্রুত ও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকিগুলোকে মোকাবিলা করা ও সেগুলো প্রতিরোধ করা।” দাখিল করা নথিতে অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে যে, বছরের প্রথমার্ধে তাদের আয় নাটকীয়ভাবে বেড়ে ১৬.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ গুণ বেশি। এই আয়ের বড় একটি অংশ এসেছে বিভিন্ন ব্যবসার কাছ থেকে, যারা তাদের এআই সফটওয়্যার—যার মধ্যে ‘ক্লড’-ও রয়েছে—ব্যবহার করছে।
তবে ব্যবসার প্রসারে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে গিয়ে অ্যানথ্রোপিক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮০.৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে তাদের লোকসান ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলার।
অ্যানথ্রোপিক তাদের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তি মাধ্যমে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। এর ফলে কোম্পানিটির মূল্যামান ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা এটিকে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স-কে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম আইপিও হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এই কোম্পানিটি মে মাসেই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই-এর মূল্যায়নকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তখন অ্যানথ্রোপিকের মূল্য ছিল ৯০০ বিলিয়ন ডলার, আর ওপেনএআই-এর ছিল ৭৩০ বিলিয়ন ডলার।
অ্যানথ্রোপিকের দাখিল করা নথিতে একটি অস্বাভাবিক সতর্কবার্তা ছিল। সেখানে বলা হয়েছে যে, তাদের তৈরি প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কিংবা স্বৈরাচারী উদ্দেশ্যে অপব্যবহারের মতো বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যামোডি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতারা লিখেছেন, “এআই তৈরি করা মানে হলো খোদ মানুষের জ্ঞানীয় সক্ষমতাকে কাজে লাগানো; আর এত শক্তিশালী কোনো কিছু ভালো কাজের পাশাপাশি খারাপ কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে।”
অ্যানথ্রোপিক-এর আর্থিক অবস্থা এমন একটি এআই প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে তুলে ধরে, যা মাত্র পাঁচ বছর আগে প্রায় আকস্মিকভাবেই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছিল। কোম্পানিটির প্রযুক্তি এতটাই শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয় যে, এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সাথে তাদের বিরোধের জন্ম দিয়েছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের সক্ষমতার কারণে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে এবং এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রপ্রধান এমনকি ক্যাথলিক চার্চের প্রধানের সাথেও আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছে। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান ড. অ্যামোডি নিজেই তাদের এআই প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
২০২১ সালে ওপেনএআইয়ের একদল কর্মী-যারা এআই উন্নয়নের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে এসেছিলেন, তাদের হাত ধরেই অ্যানথ্রোপিকের যাত্রা শুরু হয়। ওপেনএআইয়ের গবেষণাবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. অ্যামোডি তার বোন ড্যানিয়েলা এবং আরও কয়েকজনের সাথে মিলে অ্যানথ্রোপিক প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, যত দ্রুত সম্ভব এবং নিরাপদে একটি অতি-বুদ্ধিমান কম্পিউটার সিস্টেম তৈরি করা।
২০২২ সালে ওপেনএআই তাদের চ্যাটজিপিটি চ্যাটবট বাজারে এনে ব্যাপক পরিচিতি পায়, তখন অ্যানথ্রোপিক অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালেই কাজ করে যাচ্ছিল। পরবর্তীতে অ্যানথ্রোপিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কোডিং টুলের ওপর মনোযোগ দেয়। এই টুলগুলো সফটওয়্যার কোড তৈরিতে এতটাই কার্যকর ছিল যে, তা সিলিকন ভ্যালির প্রকৌশলী মহলে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করে। গত শরতে স্টার্টআপটি তাদের কোডিং চ্যাটবটগুলোর নতুন সংস্করণ বাজারে আনার পর, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি সেগুলো গ্রহণ করতে শুরু করে, যার ফলে অ্যানথ্রোপিকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম দ্রুত গতি পায়।