বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আট গুণ বড়। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর–২০২৬ এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদন বলছে, এ বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি (যা মোট জিডিপিকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যায়) ভারতের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জিডিপি হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের ভেতরে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্য।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ। ২০২৬ সালের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮৮৬ ডলার, যা ভারতের ২ হাজার ৭৪৯ ডলারের চেয়ে বেশি।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে পাকিস্তানের চেয়েও বড়, যে দেশের কাছ থেকে ১৯৭১ সালে ঢাকা স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। বিষয়টিকে বাংলাদেশের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা এই সাফল্যের পেছনে দেশের ৩৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক শিল্প, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন সেই অগ্রগতিকে চাপের মুখে ফেলছে।
অন্যদিকে, এ বছর ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
তাহলে মাথাপিছু জিডিপি বাড়ার বিষয়টি কীভাবে দেখা উচিত তা কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে তা উঠে এসেছে।
আইএমএফের প্রতিবেদন কী বলছে?
আইএমএফের প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি এবং দুটি প্রধান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি বাজারের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে সাড়া দেবে, তার পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে ভারতের জিডিপি হতে পারে ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
তবে দুই দেশের মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার খরচ তুলনা করতে গেলে হিসাবটা কিছুটা আলাদা হয়। পিপিপি বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা পদ্ধতিতে দুই দেশের পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার খরচের পার্থক্য হিসাব করা হয়।
এই হিসাবে ২০২৬ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার। অর্থাৎ, এই পদ্ধতিতে মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকবে।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ হলো, বাংলাদেশিদের চেয়ে ভারতীয়দের কেনাকাটার ক্ষমতা বা ক্রয়ক্ষমতা বেশি। আইএমএফ বাংলাদেশে গড় ভোক্তা-মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাক্কলন করেছে, যেখানে ভারতে তা ৫ শতাংশ। এটি বাংলাদেশে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বেশি হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে।
ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধশালী এবং দেশটির বড় আকারের শিল্প ভিত্তি রয়েছে, যার মধ্যে তাদের উল্লেখযোগ্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতও অন্তর্ভুক্ত। ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৭ হাজার ৭৪৬ ডলার এবং বিশ্বজুড়ে গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৫ হাজার ৮৮৯ ডলার। এর বিপরীতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২ হাজার ৮৮৬ ডলার এবং ভারতের ২ হাজার ৭৪৯ ডলার।
ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতি কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?
আইএমএফের প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, আগামী বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ২১৯ ডলারে পৌঁছাবে, যা তখনো ভারতের ৩ হাজার ৩৬ ডলারের চেয়ে বেশি থাকবে। এই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালেও এই সামান্য ব্যবধান বজায় থাকার কথা। তবে আইএমএফ জানিয়েছে, বর্তমান প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে ২০২৯ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে ৩ হাজার ৬৬১ ডলার, যা বাংলাদেশের ৩ হাজার ৩৩৪ ডলারকে ছাড়িয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রাক্কলিত মাথাপিছু জিডিপি ভারতের চেয়ে সামান্য ওপরে উঠলেও, শিগগিরই দেশটি দুর্বল প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।
আল জাজিরা বলছে, তবে কেবল মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে একটি দেশের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক চিত্র বোঝা যায় না, কারণ এটি আয় ও সম্পদের বৈষম্যকে লুকিয়ে রাখে। এ ছাড়া ডলারে হিসাব করা এই সংখ্যাটি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। এর অর্থ হলো, অর্থনৈতিক উৎপাদনে কোনো পরিবর্তন না হলেও কেবল মুদ্রার মানের পরিবর্তনের কারণেই এই আপেক্ষিক সংখ্যা বদলে যেতে পারে।
সহজ করে বললে, গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল রপ্তানিমুখী ম্যানুফ্যাকচারিং খাত নির্ভর। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, যা রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস ছিল। এর পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সও বড় ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে, ভারতের অর্থনীতি বেশ বৈচিত্র্যময়। দেশটির অর্থনীতি শুধু কৃষি বা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল নয়, সেবা খাতও এতে বড় ভূমিকা রাখে। তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসায়িক সেবা, শিল্পকারখানা এবং দেশের ভেতরে বিপুলসংখ্যক মানুষের পণ্য ও সেবার চাহিদা ভারতের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।
তবে উভয় দেশেই গত এক দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুষম হয়নি, বরং ধনী পরিবারগুলোতে সম্পদের কেন্দ্রীয়করণ বা পুঞ্জীভূত হওয়া বেড়েছে।
বাংলাদেশ কি আসলেই দক্ষিণ এশিয়ার একটি সাফল্যের গল্প?
আল জাজিরা বলছে, কিছুটা হলেও বাংলাদেশ তাই। তবে অর্থনীতিবিদরা অসম প্রবৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করে এ কথা বলেছেন।
ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা আল জাজিরাকে বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দীর্ঘমেয়াদে হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতি বছরে ৬ শতাংশ হারে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্পকারখানার অবদানও বেড়েছে।
২০১৪ সালে দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনে ম্যানুফ্যাকচারিং বা পণ্য উৎপাদন খাতের অবদান ছিল ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান ২০১৪ সালে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থাকলেও ২০২৪ সালে কমে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, বাংলাদেশ রপ্তানির জন্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভালো অগ্রগতি করেছে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি ইতিবাচক দিক। তবে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ধাক্কা লেগেছে। কারণ এই যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৯৫ শতাংশ আমদানি করে এবং এর বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
একইসঙ্গে, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে বিঘ্ন ঘটায় বিদেশে পোশাক পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে এই খাতের পণ্য পরিবহন বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে।