Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৫ অক্টোবর, ২০২৬
২৫ অক্টোবর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৫ অক্টোবর, ২০২৬
২৫ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
> বিশ্লেষণ

দ্বিপক্ষীয় নাকি বহুপক্ষীয়, কোন কূটনীতির পথে বিএনপি সরকার?

মেরিনা মিতু

মেরিনা মিতু

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ২২: ০৫
দ্বিপক্ষীয় নাকি বহুপক্ষীয়, কোন কূটনীতির পথে বিএনপি সরকার?
ছবি: বাসস

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর যখন ঢাকায় পৌঁছায়, ততক্ষণে সব প্রক্রিয়া শেষ। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষের হাতে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও এর আগে বাংলাদেশ সরকার কিংবা জেদ্দায় বাংলাদেশের মিশনকে কিছুই জানানো হয়নি। ঘটনা জানার পর রিয়াদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা। ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো না হলেও তার সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কেন বাংলাদেশকে জানানো হয়নি, দুই নাগরিকের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশ কীভাবে অন্ধকারে থাকল- এসব প্রশ্নের উত্তর চেয়েছে সরকার।

Advertisement

এর কয়েক দিন আগে, ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় প্রাণ হারান আরেক বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহমেদ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা, কনস্যুলার সুরক্ষা এবং সরকারের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোর একটি, অন্যদিকে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আসছে বিএনপি সরকার।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

ঘটনাটি নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গত ১৯ অক্টোবর সাংবাদিকদের বলেছেন, “সৌদি আদালতের রায়ের কপি ও বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। সেসব নথি পাওয়ার পর বিষয়টি মূল্যায়ন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” তিনি এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত না টানারও আহ্বান জানান। একই দিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, “বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু হলে সংশ্লিষ্ট দেশ বাংলাদেশের মিশনকে অবহিত করবে- এটাই প্রত্যাশিত।”

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ঘটনাগুলো বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হিসেবে ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির বাস্তব পরীক্ষা সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবে তথা বিদেশে বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সেই সম্পর্ক কতটা কার্যকর হচ্ছে? শুধু দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, নাকি আন্তর্জাতিক আইন, বহুপক্ষীয় ফোরাম ও সম্মিলিত কূটনৈতিক উদ্যোগ- কোন পথে এগোতে চায় বিএনপি সরকার?

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ ও সরকারি-বিরোধীদলের আশ্চর্য ঐকমত্যsoudi-arab-flag

ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরে বলেছে, কোনো একটি দেশের ওপর অতিনির্ভরশীল না হয়ে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “চীন, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থই প্রাধান্য পাবে।” তিনি আরও বলেছিলেন, “বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের বাইরে গিয়ে আমরা কোনো কিছু করতে পারি না।”

কিন্তু সৌদি আরবের সাম্প্রতিক ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, কূটনীতির সাফল্য শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের উষ্ণতা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই সম্পর্কের মাধ্যমে একজন প্রবাসী নাগরিক কতটা সুরক্ষা পাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’: দ্বিপক্ষীয় নাকি বহুপক্ষীয় কূটনীতি?

বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি মূলত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নির্ভর করতে চায়, নাকি বহুপক্ষীয় কূটনীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়?

সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে দুই ধরনের কূটনীতিরই উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) এক সেমিনারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, “পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের এমন পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন, যা জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেবে।”

তার ভাষায়, “কোনো ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি না করে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা, স্বাধীনতার সঙ্গে আপস না করে সহযোগিতা বাড়ানো এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক শক্তিশালী করাই এর মূল কথা।”

এই নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে শামা ওবায়েদ চরচাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে বাংলাদেশ একা নয়। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক রাখতে চায় সরকার। আমরা এমন যেকোনো বহুপক্ষীয় ফোরামে যোগ দেব, যা বাংলাদেশের জন্য উপকারী হবে।”

তার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সরকার নিজেকে কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কনির্ভর কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকার নীতিই তুলে ধরছে।

তবে বাস্তবে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের গুরুত্ব বেশি দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর, বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ তার উদাহরণ।

চীন সফরে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। মালয়েশিয়া সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি, প্রযুক্তি ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অর্থনৈতিক অর্জনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ছবি: বাসস থেকে নেওয়া
ছবি: বাসস থেকে নেওয়া

অন্যদিকে, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ বহুপক্ষীয় কূটনীতির একটি বড় উদাহরণ। নিউইয়র্কে চার দিনের সফরে তিনি প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সভা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা।

অর্থাৎ, একই সফরে একদিকে জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগও বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের কাছেও এই দুই পদ্ধতি পরস্পরের বিকল্প নয়। বরং দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে তাৎক্ষণিক স্বার্থ আদায়ে কার্যকর হলেও বহুপক্ষীয় কূটনীতি তুলনামূলকভাবে ছোট ও মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য সম্মিলিত অবস্থান তৈরির সুযোগ দেয়।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এ দুই ধারার সমন্বয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন, চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, সৌদি আরবের সঙ্গে শ্রমবাজার এবং জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকট-প্রতিটি ক্ষেত্রের কূটনৈতিক বাস্তবতা এক নয়।

সৌদি আরব: ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যেও নাগরিক সুরক্ষার প্রশ্ন

সৌদি আরবের সাম্প্রতিক ঘটনা বিএনপি সরকারের কূটনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক বা কৌশলগত নয়; অর্থনীতি ও জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরাশক্তিগুলোর সংঘাতের নাট্যমঞ্চ হবে না বঙ্গোপসাগর: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীhumayun kabir

সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম বড় উৎস। ফলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান স্বার্থের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অধিকার।

কিন্তু, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় কনস্যুলার যোগাযোগের দুর্বলতা সামনে এসেছে। ১৮ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তোলা হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মৃত্যুদণ্ডের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।” ১৯ অক্টোবর তিনি আরও বলেন, “রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।”

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, “বাংলাদেশে কোনো সৌদি নাগরিক অপরাধের অভিযোগে আটক হলে দেশটির মিশনকে অবহিত করা হবে, যাতে তারা কনস্যুলার সহায়তা দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের তথ্য বিনিময় প্রত্যাশা করে ঢাকা।” তিনি বলেন, “দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়ায় কোথায় ঘাটতি হয়েছে, তা জানতে সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে।”

এখানে সরকারের বক্তব্যের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নও রয়েছে। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদে, আটক বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগ ও সহায়তার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে রাষ্ট্রকে অবশ্যই আগাম জানাতে হবে-এমন সরাসরি বাধ্যবাধকতা ওই অনুচ্ছেদে নেই। তাই ঘটনাটিতে আইনি দায় নির্ধারণের আগে দুই নাগরিকের আটক, বিচার, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে অবহিত করার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সরকারের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের কাছে রায়ের কপি ও বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, বাংলাদেশের মিশন কীভাবে ওই দুই নাগরিকের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আগে জানতে পারল না? ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে দুই দেশের মধ্যে কনস্যুলার যোগাযোগের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব কি না?

এখানেই দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির সীমাবদ্ধতা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। শুধু সৌদি সরকারের কাছে চিঠি পাঠানো নয়, বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা কার্যকর করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের উদ্যোগ প্রয়োজন।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ কতটা জরুরি?

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সম্পর্ক মূলত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। গত বছরের ৬ অক্টোবর দুই দেশের মধ্যে সাধারণ শ্রমিক নিয়োগসংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাঠামো তৈরি, শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার অধিকার সুরক্ষা এবং চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করা।

কিন্তু চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কর্মীদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে শুধু শ্রমবাজারের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন, জাতিসংঘের অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকারবিষয়ক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণও জরুরি।

বাংলাদেশ চাইলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি এসব আন্তর্জাতিক কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে একটি বৃহত্তর অবস্থান তৈরি করতে পারে। এতে শুধু সৌদি আরব নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শ্রমবাজারেও বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার রক্ষায় কূটনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

এই বিষয়ে সরকারের অবস্থানও কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গত ১৯ অক্টোবর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির আজারবাইজানের বাকুতে এশিয়ায় পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতাবিষয়ক সম্মেলন (সিআইসিএ) এবং বাগদাদে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ওআইসির বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।” গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিয়ে একটি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও তিনি সহ-সভাপতিত্ব করেন।

এটি বহুপক্ষীয় কূটনীতির একটি উদাহরণ। কারণ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; এর জন্য ওআইসি, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত চাপ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। যদিও রোহিঙ্গা ইস্যুতে শুরু থেকে বাংলাদেশ আগে বহুপক্ষীয় কূটনীতির পথে হাঁটছে।

প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরে যাচ্ছেন ২৬ অক্টোবরpm-tarique-rahaman

একইভাবে জলবায়ু অর্থায়ন, সমুদ্রসম্পদ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জন্য বহুপক্ষীয় কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে একক কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করা এবং একাধিক দেশের সমর্থন আদায় করা।

ভারত-চীন সমীকরণে ভারসাম্যের পরীক্ষা

বাংলাদেশের কূটনীতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা। দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থ রয়েছে। তবে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার পর চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার উদ্যোগ সেই অবস্থানের প্রতিফলন।

চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো সরাসরি জড়িত।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন, সীমান্ত হত্যা এবং অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সরকার সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বললেও এসব বিষয়ে জাতীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সমাধান চায়।

নির্বাচনের আগে তারেক রহমান বলেছিলেন, “চীন, ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থই হবে প্রধান বিবেচ্য।” চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “উদ্যোগটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনগণের জন্য উপকারী হলে সরকার তা বিবেচনা করবে।” একই সংবাদ সম্মেলনে সার্ক পুনরুজ্জীবনের কথাও বলেছিলেন তিনি।

তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক। ছবি: পিএমও
তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক। ছবি: পিএমও

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির চরচাকে বলেন, “সরকারের লক্ষ্য কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করা নয়; বরং সব অংশীদারের সঙ্গে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখা। সরকার ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।”

এ ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে গিয়ে ভারতকে অস্বস্তিতে না ফেলা এবং সম্পর্ক উন্নয়নের নামে বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে ছাড় না দেওয়া। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি

বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উন্নয়ন সহযোগিতা ও মানবাধিকার ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব রয়েছে।

বিএনপি সরকারের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখা।

হুমায়ুন কবির বলেন, “বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি করেছে।” তিনি বলেন, “আমাদের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র প্রয়োজন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি প্রয়োজন।”

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।”

সৌদি আরবে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি কারাগারে বন্দী রয়েছে: শামা ওবায়েদState Minister for Foreign Affairs Shama Obaid

এখানে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ কতটা সম্ভব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশের রাজনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান পুরোপুরি মিলে না গেলেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জায়গায় সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক জোটে বাংলাদেশের অবস্থান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফর বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে সরকারের আগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। নিউইয়র্কে তিনি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি জাতিসংঘের মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করেন।

এসব আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে।

এছাড়া, সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়টিকে সরকার আঞ্চলিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, “সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সার্ক ও বিমসটেককে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পরিপূরক কাঠামো হিসেবে দেখছে সরকার।”

বাংলাদেশের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এসব বৈঠক ও উদ্যোগের ফলাফলকে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় রূপ দেওয়া। বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি।

অর্থনৈতিক কূটনীতি: সফর ও বৈঠকের বাইরে অর্জন কতটা?

কূটনীতির সাফল্য শুধু বিদেশ সফর, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক কিংবা সমঝোতা স্মারকের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে কতটা বিনিয়োগ এসেছে, কত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, রপ্তানি বাজার কতটা সম্প্রসারিত হয়েছে এবং প্রবাসী কর্মীদের জন্য কতটা নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে- সেটিই শেষ পর্যন্ত বড় বিবেচ্য।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকPM meeting

বাংলাদেশের সামনে এখন কয়েকটি বড় অগ্রাধিকার রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য তৈরি, দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা।

এ বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেছেন, “অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিনিয়োগ ও উৎপাদনশিল্পের গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার।” বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোকে তিনি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অন্যতম বাস্তব লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এম হুমায়ুন কবিরের মূল্যায়ন হচ্ছে, শুধু পররাষ্ট্রনীতির ঘোষণা দিয়ে স্বাধীন কূটনীতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।” তাঁর মতে, জাতীয় ঐক্য, কার্যকর শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং কূটনৈতিক দক্ষতা ছাড়া স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন কঠিন। কোন দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশের কী প্রয়োজন, তা আবেগ বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বাস্তব স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।”

“এ মূল্যায়ন বিএনপি সরকারের কূটনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। কারণ বিদেশে সম্পর্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো কঠিন।”

সামনে বিএনপির কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

বিএনপি সরকারের কূটনীতির সামনে অন্তত চারটি বড় পরীক্ষা রয়েছে।

প্রথমত, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ধরে রাখা।

দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা ও অধিকার নিশ্চিত করা।

তৃতীয়ত, জাতিসংঘ, বিমসটেক, সার্ক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক কাঠামোয় সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থে বহুপক্ষীয় সমর্থন তৈরি করা।

চতুর্থত, কূটনৈতিক যোগাযোগকে অর্থনৈতিক অর্জনে রূপান্তর করা।

এসব চ্যালেঞ্জের বিষয়ে বিএনপির ঘোষিত অবস্থান হচ্ছে, কোনো একটি দেশ বা ভূরাজনৈতিক বলয়ের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা। শামা ওবায়েদের ভাষায়, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে বাংলাদেশ একা নয়। বরং জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে সব অংশীদারের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বাড়ানো।

উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীরdialog

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাহরাইনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, বাংলাদেশের মূলনীতি হওয়া উচিত ‘বন্ধু, প্রভু নয়’।

তার মতে, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে, কিন্তু কোনো দেশের অধীনস্থ অবস্থান গ্রহণ করা যাবে না।

সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন সম্ভাবনার কথা বলছে। তবে এই নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির সমন্বয় করতে পারে তার ওপর।

সৌদি আরবের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেই নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। আবার আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থিতি থাকলেই জাতীয় স্বার্থ আদায় সম্ভব হয় না। প্রয়োজন কার্যকর কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠান, আগাম তথ্য সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে দক্ষতা এবং সংকট মোকাবিলায় সুস্পষ্ট কৌশল।

অতএব বিএনপির কূটনীতির সামনে মূল প্রশ্নটি শুধু কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো হবে, তা নয়। বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের শক্তি এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির সম্মিলিত প্রভাব কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কতটা নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে- সেটিই হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রকৃত পরীক্ষা।

বিষয়: বিএনপিকূটনীতিবিদেশপররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বাংলাদেশকূটনৈতিক সম্পর্ক
Advertisement
সর্বশেষ
  • ১

    দ্বিপক্ষীয় নাকি বহুপক্ষীয়, কোন কূটনীতির পথে বিএনপি সরকার?

  • ২

    ‘দেশের অসংখ্য নাগরিক সৌদিতে কারাগারে আছেন’

  • ৩

    শ্রেণিকক্ষে ফিরলেও চুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলবে

  • ৪

    মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ীকে অপহরণের চেষ্টা: ডিজিএফআইয়ের দুজনসহ ৬ জন কারাগারে

  • ৫

    ‘অনেকেই ফেরত এসেছেন গর্ভবতী হয়ে, অনেকে এসেছেন বাচ্চা নিয়ে’

সম্পর্কিত
  • চিকিৎসকের মতো ধাপে ধাপে রোগ নির্ণয়ে সক্ষম মাইক্রোসফটের নতুন এআই

    চিকিৎসকের মতো ধাপে ধাপে রোগ নির্ণয়ে সক্ষম মাইক্রোসফটের নতুন এআই

    নতুন ব্যবস্থাটি শুধু রোগীর দেওয়া তথ্য থেকে সম্ভাব্য রোগের নাম বলে না; বরং রোগ নির্ণয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে পরিচালনা করে। কোন প্রশ্ন রোগীকে করা প্রয়োজন, তার চিকিৎসার ইতিহাসের কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, শারীরিক পরীক্ষায় কী কী বিষয় বিবেচনা করতে হবে এবং কোন পরীক্ষা কখন করানো উচিত–এসব সিদ্ধান্তও নেয়।

  • ব্রাজিলের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা ও মার্কিন প্রভাব

    ব্রাজিলের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা ও মার্কিন প্রভাব

    ব্রাজিলের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার ভূমিকা দেশটির রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

  • ব্ল্যাক অক্টোবর: এআই’র হাতে সাইবার হামলার নতুন যুগ, কতটা বিপদে বিশ্ব?

    ব্ল্যাক অক্টোবর: এআই’র হাতে সাইবার হামলার নতুন যুগ, কতটা বিপদে বিশ্ব?

    গুরুত্বপূর্ণ সব অ্যাকাউন্টে বহুধাপের প্রমাণীকরণ বা মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু করা উচিত। এই ব্যবস্থায় শুধু পাসওয়ার্ড জানলেই অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যায় না; পরিচয় যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত একটি ধাপ প্রয়োজন হয়।

  • ইরান যুদ্ধ আবার শুরু হলে বিশ্ব কত দিন সামাল দিতে পারবে তেলের সংকট?

    ইরান যুদ্ধ আবার শুরু হলে বিশ্ব কত দিন সামাল দিতে পারবে তেলের সংকট?

    যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হলে বিশ্ব অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে জ্বালানি সরবরাহের বিপর্যয়।