দুই বছরেরও বেশি সময় স্থগিত থাকার পর ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ১৬ সেপ্টেম্বর দেশের সকল জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নতুন করে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের সব আবেদন গভীরভাবে যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন অস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় থানা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা থেকে লুট হওয়া হাজার হাজার অত্যাধুনিক অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার না হওয়ায়, সরকারের এই নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে চরচার সঙ্গে কথা বলেছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা। সরকারের এই পদক্ষেপের আইনি ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “১৮৭৮ সালের আর্মস অ্যাক্ট অনুযায়ী আগ্নেয়াস্ত্রের প্রকৃত মালিকানা সবসময় রাষ্ট্রের হাতেই থাকে, নাগরিককে কেবল তা ব্যবহারের পজেশন লাইসেন্স দেওয়া হয়। সরকার চাইলে যেকোনো সময় তা তুলে নিতে পারে।”
এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের পুরনো নীতিমালা বাতিল করে ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০২৫’ জারি করে, যার অধীনে লাইসেন্স ফি ও নবায়নের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। এ ছাড়াও ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেওয়া ২০ হাজার ১০টি লাইসেন্স রাজনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে দাবি করে এই লাইসেন্সগুলো বাতিলের জন্য রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়।
২০২৫-এর আইনে লাইসেন্স পাওয়া কতটা কঠিন হয়েছে?
বাংলাদেশের আগ্নেয়াস্ত্র আইনগতভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে ১৮৭৮ সালের ব্রিটিশ আমলের মূল ‘আর্মস অ্যাক্ট’ এবং ১৯২৪ সালের ‘আর্মস রুলস’-এর ওপর ভিত্তিতে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে এবং সম্প্রতি ২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলাদা ব্যবহারিক নীতিমালা জারি করে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোনো সাধারণ ব্যক্তি লাইসেন্স ছাড়া অস্ত্র কিনতে, আত্মরক্ষা বা বহন করতে পারেন না। করলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ব্যক্তি পর্যায়ে সাধারণত শটগান, পিস্তল ও রিভলবারের লাইসেন্স দেওয়া হয়। লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ নাগরিক হতে হয় এবং বয়স হতে হয় ন্যূনতম ৩০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে।
আইন ও নীতিমালায় সাম্প্রতিক পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছে আবেদনকারীর আর্থিক যোগ্যতা ও সরকারি ফি নির্ধারণে। নতুন নীতিমালায় আবেদনের আগের তিন বছরে একজন আবেদনকারীর ন্যুনতম বার্ষিক আয়করের পরিমাণ পিস্তল বা রিভলবারের ক্ষেত্রে প্রায় দ্বিগুণ আর শটগানের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ করা হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ করা হয়েছে লাইসেন্স ইস্যু ও বাৎসরিক নবায়ন ফি।
তবে নীতিমালার ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে উপদেষ্টা বা মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক এবং ৬ষ্ঠ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ ১০টি বিশেষ ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে আবেদনকারীর ক্ষেত্রে বয়স ও আয়করের পরিমাণের এই কড়াকড়ি শিথিল করা হয়েছে।
আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫-এ ব্যক্তিপর্যায়ে সবাইকেই অস্ত্রের লাইসেন্স নিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার গত ১৬ সেপ্টেম্বর সেই স্মারকটি বাতিল করে এবং যোগ্যতা যাছাই-বাছাইয়ে টিকে গেলে সাধারণ ব্যক্তির নামেও ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করার অনুমতি দেয়।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আবেদা আফসারী চরচাকে বলেছেন, “এগুলোর সিদ্ধান্ত উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে আসে।”
মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই আন্দোলন: অস্ত্র জমা ও উদ্ধার অভিযান
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অস্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান এক সরকারি নির্দেশের মাধ্যমে সর্বসাধারণ ও স্বাধীনতাকামী সকল বাহিনীকে ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২-এর মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই ঐতিহাসিক নির্দেশ মেনে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি জাতীয় স্টেডিয়ামে (বর্তমান ঢাকা স্টেডিয়াম) মুজিব বাহিনী ও গণবাহিনীর সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করেন। এরপর দেশজুড়ে অবৈধ ও বেহাত হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ‘অপারেশন ক্লোজ ডোর’ নামের একটি বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ঠিক ৫২ বছর পর, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পুনরায় একই ধরনের সংকট তৈরি হয়। আন্দোলনের সময় সারা দেশের প্রায় ৪৬০টি থানা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা থেকে হাজার হাজার অত্যাধুনিক অস্ত্র ও লাখ লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়ে যায়। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে থানা থেকে সর্বমোট ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্র এবং ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড গুলি লুট হয়েছিল। যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে এর মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি অস্ত্র (৬২.৪ শতাংশ) এবং ২ লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড গুলি (৫২ শতাংশ) উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তবে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সর্বমোট ৫ হাজার ৭৬৩ থেকে ৫ হাজার ৯৪২টি অস্ত্র বেহাত হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৫১৫টি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো ১ হাজার ৩০৯ থেকে ১ হাজার ৪২৭টি অতি মারাত্মক অস্ত্র, যেমন–চাইনিজ রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, পিস্তল এবং প্রায় ২ লাখ ৭৯ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ অপরাধীদের হাতে রয়ে গেছে।
সরকার এ ব্যাপারে নির্ধারিত সময় বেঁধে দিয়ে বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ার পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) নেতৃত্বে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
উদ্ধার অভিযানে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে নগদ অর্থ পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়েছে। লাইট মেশিনগান (এলএমজি) উদ্ধারে ৫ লাখ টাকা, সাব মেশিনগান (এসএমজি) উদ্ধারে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, চায়নিজ রাইফেলে ১ লাখ টাকা, পিস্তল বা শটগানে ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য ৫০০ টাকা নগদ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে দেশে নিবন্ধিত মোট ৫৩ হাজার ৭০২টি বৈধ অস্ত্রের মধ্যে নির্ধারিত সময়ে ২০ হাজারের বেশি অস্ত্র জমা না পড়ায় সেগুলোকে বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলির যে সরকারি হিসাব, তার থেকেও অনেক বেশি অস্ত্র ও গুলি লুট হয়েছে বলে ধারণা করেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা চরচাকে জানিয়েছেন, সরকারের দেয়া হিসাবটি হলো একটি গড় হিসাব। অস্ত্র উদ্ধারের হিসাবও একটি গড় হিসাব। লুট হওয়া ও উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গুলির যথার্থ হিসাব এখনো করা সম্ভব হয়নি।
বৈধ লাইসেন্সধারীরা কেন হতাশ?
নতুন নীতিমালায় বাড়তি ফি ও করের চাপে দেশের বৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী ও লাইসেন্সধারীরা চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র আমদানিকারক ‘আহমেদ হোসাইন আর্মস অ্যান্ড কোং’-এর স্বত্বাধিকারী তানভীর হোসাইন চরচাকে বলেন, কেনাবেচা বন্ধ থাকায় সারা দেশে নিবন্ধিত ৮৪টি অস্ত্র ডিলারের মধ্যে প্রায় ৭৬ শতাংশ ব্যবসায়ী এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন এবং বর্তমানে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি দোকান কোনোরকমে টিকে আছে। তারা মূলত সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ব্যাংকের সরকারি টেন্ডারে যন্ত্রাংশ সাপ্লাই দিয়ে টিকে আছেন।
তানভীর হোসাইন আরো বলেন, “থানা থেকে লুট হওয়া বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের অবৈধ অস্ত্র কোনো আইনমান্যকারী সাধারণ নাগরিক কখনো কিনবেন না। কারণ অবৈধ অস্ত্র রাখলে ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সামাজিক অবস্থান ধ্বংসের ভয় থাকে। তা ছাড়াও বর্তমানে সিআইডি প্রতিটি নতুন বৈধ অস্ত্র বিক্রির সময় টেস্ট ফায়ারের মাধ্যমে ফায়ার্ড বুলেটের ডিজিটাল ব্যালিস্টিক ফিংগারপ্রিন্ট সফটওয়্যারে সেইভ করে রাখছে, ফলে বৈধ অস্ত্র দিয়ে অপরাধ করলে মুহূর্তেই ধরা পড়া নিশ্চিত। সামরিক অস্ত্রের সাথে সাধারণ সিভিল অস্ত্রের মূল পার্থক্য হলো, সিভিল অস্ত্র সেমি-অটোমেটিক, যা ব্রাশ ফায়ার করতে পারে না।”
অন্যদিকে ‘লাইসেন্সধারী অস্ত্র মালিক কল্যাণ সমিতি’-র সাধারণ সম্পাদক মাহবুব এ খোদা জুয়েল চরচাকে বলেছেন, “বার্ষিক অতিরিক্ত ফি, ভ্যাট এবং এনবিআর-এর প্রস্তাবিত ১ লাখ টাকা এআইটি-র কারণে দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বৈধ অস্ত্রধারী তাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অস্ত্র কোনো গাড়ি বা আয়ের মাধ্যম নয় যে এর ওপর ভারি কর বসাতে হবে। একটি পাড়ায় একটি বৈধ অস্ত্র থাকা মানে আশপাশের ২০টি বাড়ি পরোক্ষভাবে ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকা।”
১৯৪৩ সালে ঢাকার ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট লর্ড লরেন্স একটি সরকারি নোটিশ জারি করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে কোনো এলাকায় ডাকাতি হলে এবং সেখানে বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্রধারীরা নিজের এলাকার সুরক্ষার জন্য অস্ত্র ব্যবহার না করলে তার লাইসেন্স বাতিল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছিল সেই নোটিশে।
মাহবুব এ খোদা জুয়েল বলেন, “আগে বৈধ অস্ত্রধারীরা এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে নিরাপত্তা দিতে পারতেন। আর এখন সরকারি নীতির মাধ্যমে ভালো মানুষকে অস্ত্র নিতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারা যেখানে-সেখানে অস্ত্রের প্রদর্শনী করছেন। এটাও আমাদের আইনে নিষিদ্ধ। বিআরটিএ-র ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো অস্ত্র দেওয়ার আগেও আইনি জ্ঞান ও নিরাপদ ব্যবহারের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত।”
বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শারমিন আক্তার রত্না বর্ধিত লাইসেন্স ফি ও করহার নিয়ে চরচাকে বলেন, “আমাদের শুটিং খেলাটি এমনিতেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দেশের সাধারণ শুটারদের আর্থিক সঙ্গতি সেই পর্যায়ের নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫৮টি নিবন্ধিত ক্লাব ও ফেডারেশনের মতো প্রধান অংশীদারদের সাথে কোনো আলোচনা না করেই নতুন নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এতে পুরো শুটিং স্পোর্টস এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।”
বৈধ অস্ত্রে অতিরিক্ত ফি-র কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে বলেও জানান শারমিন আক্তার, “অতিরিক্ত ফি ও ট্যাক্সের ভারে মানুষ আর বৈধ অস্ত্র রাখতে চাইবে না এবং যাদের আছে তারাও জমা দিয়ে দেবে। বাসা-বাড়িতে বা সামাজিকভাবে বৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি অপরাধীদের মনে যে ভীতি তৈরি করে, অতিরিক্ত খরচের কারণে লাইসেন্স কমে গেলে সেই সুরক্ষা আর থাকবে না। ফলে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা কমে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে এবং অবৈধ অস্ত্রধারীরা তাদের কর্মকাণ্ড চালাতে বাড়তি সুযোগ পেয়ে যাবে।”
সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা লাইসেন্স ও নবায়নের ফি বাড়ানোর ব্যাপারে বলেন, “লাইসেন্স ও নবায়ন ফি ৯-১০ গুণ বাড়ানোর মূল প্রশাসনিক উদ্দেশ্যই হলো সাধারণ মানুষকে ঢালাও আবেদন থেকে নিরুৎসাহিত করা এবং অস্ত্রের অপব্যবহার রোধ করা। তবে বৈধ অস্ত্রধারীদের যৌক্তিক দাবি ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়ে সরকার ও নীতি নির্ধারকদের সাথে আলোচনার পর্যাপ্ত সুযোগ আছে।”
বৈধ অস্ত্র পাওয়ার যোগ্যতা ও শর্ত কী কী
২০২৫ সালের নীতিমালা অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ হতে হবে এবং তার জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকির বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট ভিত্তি থাকতে হবে।
বয়সেরও সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। পিস্তল, রিভলবার কিংবা রাইফেলের মতো শর্ট ও লং ব্যারেল অস্ত্রের ক্ষেত্রে বয়স অন্তত ৩০ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭০ বছরের মধ্যে হওয়া বাধ্যতামূলক।
আর আছে আয়করের শর্ত। আবেদনকারীকে অবশ্যই ব্যক্তি শ্রেণির আয়করদাতা হতে হবে। পিস্তল, রাইফেল বা রিভলবারের ক্ষেত্রে আবেদনের আগের তিন বছরে একজন আবেদনকারীর বার্ষিক আয়করের পরিমাণ অন্তত ৫ লাখ টাকা হতে হবে, শটগানের ক্ষেত্রে অঙ্কটা ২ লাখ টাকা। ২০২৫-এর আগের নীতিমালায় এই অঙ্কটা পিস্তল বা রিভলবারের ক্ষেত্রে ছিল ৩ লাখ, শটগানে ১ লাখ।
আবেদনকারী যদি অনাবাসী বাংলাদেশি বা দ্বৈত নাগরিক হন, সেক্ষেত্রে আবেদনের আগের টানা তিন বছরের প্রতি বছরই অন্তত ১২ লাখ টাকা করে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যাংক সনদ ও বিদেশে আয়করের বিবরণী জমা দিতে হয়।
কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি হলে তিনি লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য হবেন না এবং আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হলে সাজা শেষের পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন না।
তবে এসব নিয়মের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ব্যতিক্রমও আছে। নীতিমালার ৩২ অনুচ্ছেদে ১০টি বিশেষ শ্রেণি বা পদের ক্ষেত্রে বয়স এবং টানা ৩ বছরের নির্দিষ্ট আয়কর দেওয়ার শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এই বিশেষ শ্রেণির মধ্যে আছেন উপদেষ্টা বা মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৬ষ্ঠ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের সামরিক ও বেসামরিক ক্যাডার কর্মকর্তা এবং সনদপ্রাপ্ত জাতীয় দলের নিবন্ধিত শুটার। সাধারণ নাগরিক সর্বোচ্চ ২টির বেশি অস্ত্রের লাইসেন্স না পেলেও নিবন্ধিত শুটাররা বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের সুপারিশে সর্বোচ্চ ৩টি অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে পারেন।
অস্ত্রের লাইসেন্স: আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া
অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে আবেদনকারীকে নিজের স্থায়ী ঠিকানার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আগ্নেয়াস্ত্র শাখায় নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসক ওই আবেদনকারীর পরিচয়, সামাজিক আচরণ ও অপরাধের ব্যাপারে রিপোর্ট নেন পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি/সিটিএসবি) ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে। এরপর জেলা প্রশাসক আবেদনকারীর সরাসরি সাক্ষাৎকার নেন, যার মাধ্যমে আবেদনকারীর শারীরিক-মানসিক সামর্থ্য, অস্ত্র চালানো ও নিরাপদ রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কিত প্রাথমিক জ্ঞান এবং আত্মরক্ষার প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করেন।
শটগান বা রাইফেলের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক নিজেই লাইসেন্স মঞ্জুর করতে পারেন, তবে পিস্তল বা রিভলবারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে সুপারিশসহ ফাইল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ইস্যু করা হলে জেলা প্রশাসক চূড়ান্ত লাইসেন্স মঞ্জুর করেন। লাইসেন্স পাওয়ার পর আবেদনকারী অস্ত্র কিনতে পারেন। অস্ত্র সংগ্রহের তারিখ থেকে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ে তা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করাতে হয়।
লাইসেন্স ও নবায়ন ফি কত? আর কী খরচ আছে?
২০২৫ সালের নীতিমালায় লাইসেন্স ইস্যু ও বাৎসরিক নবায়ন ফি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। পিস্তল বা রিভলবারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিপর্যায়ে নতুন লাইসেন্স ইস্যু করার ফি ৬০ হাজার টাকা এবং বাৎসরিক নবায়ন ফি ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে বন্দুক, শটগান বা রাইফেলের লাইসেন্স ইস্যু করার ফি ৪০ হাজার টাকা এবং বাৎসরিক নবায়ন ফি ১০ হাজার টাকা।
প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ে নির্ধারিত ফি দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করা বাধ্যতামূলক।
সরকারি ফি-র বাইরে ১৫% ভ্যাট ও জেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক চার্জ দিতে হয়। এর বাইরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আরোপ করা বাৎসরিক অগ্রিম আয়করও (এআইটি) দিতে হয়। পিস্তলের ক্ষেত্রে এই অঙ্কটা ১ লাখ টাকা, শটগানে ৫০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ, সব মিলিয়ে একটি শটগানের পেছনে প্রতি বছরে পরিচালন ব্যয় হিসেবে প্রায় ৬৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬৪ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়। পিস্তলের ক্ষেত্রে এই খরচ ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
অস্ত্র ও গুলির ব্যবহার: আইনে কতটুকুর অনুমোদন আছে?
একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ২টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিতে পারেন। গুলির ক্ষেত্রে বছরে কতগুলো কেনা যাবে, সেই সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। শটগান বা রাইফেলের জন্য প্রতি বছর সর্বোচ্চ ১০০টি এবং পিস্তল বা রিভলবারের জন্য সর্বোচ্চ ৫০টি গুলি কেনার অনুমতি দেওয়া হয়।
কোনো লাইসেন্সধারী ব্যক্তি যদি আত্মরক্ষার্থে গুলি ব্যবহার করেন, সেক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা বাধ্যতামূলক। পরবর্তীতে নতুন গুলি কেনার সময় ব্যবহৃত গুলির খোসা ও জিডির কপিসহ জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করতে হয়। জেলা প্রশাসক অনুমোদন দিলেই কেবল নতুন গুলি কেনা যায়।
সিআইডির বিশেষ নির্দেশনানুযায়ী, নতুন কেনা অস্ত্রের বুলেটের ব্যালিস্টিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডিজিটাল ফরেনসিক সফটওয়্যারে টেস্ট ফায়ারের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক।
লাইসেন্স করানো অস্ত্র কেবল নিজের আত্মরক্ষায় ব্যবহার করা যাবে; জনসমক্ষে প্রদর্শন করা যাবে না। অন্যের বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রটেক্টর হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে না। এসব করলে, কিংবা নীতিমালার অন্য কোনো জায়গা মেনে না চললে তাৎক্ষণিকভাবে লাইসেন্স বাতিল ও অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়।
লাইসেন্সের খরচ: ভারত ও পাকিস্তানে কেমন?
উপমহাদেশের সার্বিক আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ার তিন প্রতিবেশী দেশ–বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া ও নিয়ম-কানুন, সরকারি ফি-র কাঠামো এবং বাৎসরিক খরচের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশে খরচের বিশ্লেষণ তো আগেই দেওয়া হয়েছে, যা দেখিয়েছে–বাংলাদেশে একটি শটগানের পেছনে বছরে প্রায় ৬৪-৬৫ হাজার টাকা এবং পিস্তলের পেছনে ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় এত খরচ আর কোথাও নেই।
এছাড়া বাংলাদেশে লাইসেন্স পাওয়ার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে আবেদনের আগের টানা তিন বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়কর (পিস্তলের ক্ষেত্রে বছরে অন্তত ৫ লাখ টাকা, শটগানের ক্ষেত্রে ২ লাখ) দেওয়ার বিধানও আছে বাংলাদেশে।
অন্যদিকে, ভারতের ‘অস্ত্র বিধি ২০১৬’ অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের নতুন লাইসেন্স ফি রাজ্যভেদে ৫০০ থেকে ৫ হাজার রুপি। ভারতে লাইসেন্স নবায়ন করতে হয় তিন বছর পরপর, যার সরকারি ফি ৫০০ থেকে ৩ হাজার রুপি। ভারতে মেডিকেল টেস্ট, পুলিশ ভেরিফিকেশন, গান সেইফ ক্যাবিনেট স্থাপন এবং ওএফবি রিভলবার কেনা বাবদ প্রথম বছরে সর্বমোট ৪৬ হাজার থেকে ৬০ হাজার রুপি খরচ হলেও বাংলাদেশের মতো উচ্চহারে বাৎসরিক আয়কর বা এআইটি-র মতো কোনো অতিরিক্ত কর দিতে হয় না। এছাড়া ভারতের আইনে পয়েন্ট ১৭৭ ক্যালিবার ও ২০ জুলের নিচের ক্ষমতার এয়ার পিস্তল বা এয়ার রাইফেল কেনার ক্ষেত্রে কোনো লাইসেন্স বা পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হয় না।
আর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল ডেটাবেইজ অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অথোরিটির (নাদ্রা) অধীনে ‘অল পাকিস্তান নন-প্রোহিবিটেড বোর (এনপিবি)’ লাইসেন্সের ক্ষেত্রে সরকারি ফি ১২ হাজার ৫০০ রুপি এবং নাদাদ্রা বায়োমেট্রিক ফি ১ হাজার ৫০০ রুপি। পাকিস্তানে ‘আর্মস রুলস ২০২৩’ অনুযায়ী আবেদনকারীর ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর হতে হয় এবং অনলাইন ‘নাদাদ্রা ই-সহুলত’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজে লাইসেন্স নবায়ন করা যায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পাকিস্তান সরকার আয়কর দেওয়াকে উৎসাহিত করতে যারা বছরে অন্তত ৫০ হাজার রুপি আয়কর দেবেন, তাদের সরকারি লাইসেন্স ফি-র ওপর ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে।