
মোদির সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর প্রায় প্রতিদিনের বিক্ষোভ মোদির সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর মাত্র কয়েক মাস আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় একই ধরনের বিক্ষোভের মুখে তার শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।
চরচা ডেস্ক

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের কৌশল, রাজনৈতিক মেরুকরণ, ডিজিটাল প্রচারণা এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচনটি কেবল ব্রাজিলের ক্ষমতার পালাবদল নির্ধারণের লড়াই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন এবং বিশ্বব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যখন পশ্চিম গোলার্ধে ওয়াশিংটনের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, তখন ব্রাজিলের নির্বাচন সেই কৌশলের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই সামনে নিয়ে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের প্রকাশনা অস্ট্রেলিয়ান আউটলুকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ড. হুয়ান জাহির নারাঞ্জো ক্যাসেরেস ও ড. শ্যানন ব্রিনকাট এই পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব বিস্তারের পুরোনো লক্ষ্য এখনো বহাল থাকলেও তার প্রয়োগ পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। অতীতে সামরিক অভ্যুত্থান, গোপন অভিযান ও সরাসরি হস্তক্ষেপের যে ইতিহাস ছিল, বর্তমান সময়ে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শুল্ক, অর্থনৈতিক চাপ, আর্থিক নিষেধাজ্ঞা, ডিজিটাল প্রচারণা এবং আন্তদেশীয় রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক। এসব উপায়ের মাধ্যমে ওয়াশিংটন এমন সরকার প্রতিষ্ঠা বা শক্তিশালী করতে চায়, যাদের নীতিগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নিবন্ধটি প্রকাশের সময় ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লুলা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি প্রথম দফায় ফ্লাভিওর চেয়ে কম ভোট পেয়েছেন। তবে কেউ ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফার লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে ভোটাভুটি হবে। ফ্লাভিও বলসোনারোর জয়ী হলে লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান আরও বিস্তৃত হতে পারে। ২০২৫ সালে ইকুয়েডর, বলিভিয়া, হন্ডুরাস ও চিলিতে ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর কলম্বিয়া ও পেরুর রাজনৈতিক পরিবর্তনও এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাকে লেখকেরা এই বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখেছেন।
তবে ব্রাজিলের নির্বাচনের গুরুত্ব শুধু ডানপন্থী ও বামপন্থী রাজনীতির দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়। লুলা সরকারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতির ফলাফলও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালে লুলার শাসনামলে ৮৭ লাখ ব্রাজিলীয় দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসেন। ২০২৫ সালে ব্রাজিল আবারও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ক্ষুধাপীড়িত দেশের মানচিত্র থেকে বেরিয়ে আসে। এসব অর্জন সত্ত্বেও দেশটির নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রমাণ করে, সামাজিক উন্নয়নের পরিসংখ্যানই রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব—সব মিলিয়ে ভোটারদের সিদ্ধান্ত গঠিত হয়।
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তর বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আয়বৈষম্যের বিচারে অঞ্চলটি বিশ্বের সবচেয়ে অসম অঞ্চলগুলোর একটি। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি এই বৈষম্যের অন্যতম কারণ হিসেবে অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছে। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও ক্ষমতা ও সম্পদের কাঠামোগত বৈষম্য দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বাইরের শক্তির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব স্থানীয় ক্ষমতাবান গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
লেখকদ্বয় বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ভূমিকার দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে দক্ষিণ আমেরিকার একের পর এক দেশে গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত হয়। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে সামরিক অভ্যুত্থানের সময় অভ্যুত্থানকারীদের সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর সমর্থন প্রস্তুত রেখেছিল। আর্জেন্টিনায় ১৯৬৬ ও ১৯৭৬ সালে, উরুগুয়ে ও চিলিতে ১৯৭৩ সালে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন ঘটে। সত্তরের দশকের শেষ দিকে মহাদেশের অধিকাংশ দেশ সামরিক শাসনের অধীনে চলে যায়, যার অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল।
ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপের পদ্ধতি ছিল বহুমাত্রিক। কখনো অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে, কখনো গোপন অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, আবার কখনো সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৬৫ সালে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে এবং ১৯৮৩ সালে গ্রেনাডায় মার্কিন সেনা পাঠানোর ঘটনাও সেই ইতিহাসের অংশ। লেখকদের যুক্তি, বর্তমান সময়ে পদ্ধতি বদলালেও পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠা বা বজায় রাখার লক্ষ্য পুরোপুরি বদলায়নি।
ব্রাজিলের ইতিহাসে ১৯৬২ সালের নির্বাচন এ ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। দেশটির তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান তিয়াগো দান্তাস কিউবার সঙ্গে সম্পর্কের দরজা খোলা রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্তের বিরোধীদের দিকে মার্কিন সহায়তা পায়। নিবন্ধে বলা হয়েছে, সিআইএর অর্থায়নে পরিচালিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে রক্ষণশীল প্রার্থীদের সমর্থনে প্রায় ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করেছিল। এই দৃষ্টান্ত দেখায়, কোনো দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াও অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে বাইরের শক্তি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার নতুন রূপ হিসেবে সামনে এসেছে মনরো নীতির পুনরুজ্জীবন। ১৮২৩ সালে ঘোষিত মনরো নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নতুন উপনিবেশ স্থাপনের বিরোধিতা করা। কিন্তু ১৯০৪ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের সংযোজন নীতিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত আন্তর্জাতিক পুলিশি ভূমিকা পালনের যুক্তিতে রূপ দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ‘ট্রাম্প করোলারি’ বা ট্রাম্পের সংযোজনের মাধ্যমে এই নীতিকে নতুনভাবে সামনে আনা হয়েছে।
আগের যুগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলো। এখন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে রয়েছে চীন। বাণিজ্যিক শুল্ক, সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্তি, আর্থিক ব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—এসবই হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। পাশাপাশি সামরিক শক্তির ব্যবহারও অব্যাহত রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা তার অর্থনৈতিক আধিপত্যের নিশ্চয়তা দেয় না। ব্রাজিলের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিসংখ্যান এই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে। ২০২৪ সালে ব্রাজিলের মোট রপ্তানির ২৮ শতাংশ গিয়েছিল চীনে, আর যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল ১২ শতাংশ। অর্থাৎ ব্রাজিলের অর্থনীতিতে চীনের গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলও স্বীকার করেছে, পশ্চিম গোলার্ধে বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের নীতির সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত করা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার ঘটনাকে লেখকদ্বয় এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামের একটি কথিত অপরাধী নেটওয়ার্ককে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। এরপর কারাকাসে সামরিক অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে আটক করা হয়। অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রের সংশোধিত অভিযোগপত্রে ওই নেটওয়ার্ককে আগের মতো সুসংগঠিত কার্টেল না বলে একটি পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই পরিবর্তন অভিযোগের প্রকৃতি ও অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও তেল ও অর্থনৈতিক স্বার্থের গুরুত্ব সামনে এনেছে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং ট্রাম্প তাকে সম্মানিত নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সময়ে ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে বড় ধরনের চুক্তির ঘোষণা আসে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থায় ৬৫০০ কোটি ব্যারেল তেলের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা সামনে আনা হয়েছিল। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ট্রাম্পের ‘বিজয়ীরাই লুণ্ঠনের অধিকারী’—এই মর্মের বক্তব্য লেখকদের কাছে শক্তির রাজনীতির একটি স্পষ্ট প্রকাশ।
এই নীতির প্রভাব শুধু ভেনেজুয়েলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। কিউবাকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার পর দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের তেল অবরোধের মধ্যে পড়ে এবং অন্তত ছয়বার দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। কলম্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী ব্যবস্থার আওতায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অন্যদিকে তার উত্তরসূরি আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েলাকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে সমর্থন দেন। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেইয়ের দলের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের সঙ্গে মার্কিন আর্থিক সহায়তাকে শর্তসাপেক্ষ করার ঘটনাও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, মাদক পাচারের মামলায় নিউইয়র্কে কারাদণ্ড পাওয়া হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে ট্রাম্প ক্ষমা করেন।
এসব উদাহরণ পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে: মাদকবিরোধী নীতি কি কেবল অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করছে? লেখকদ্বয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের পার্থক্য এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কোনো নেতা ওয়াশিংটনের বিরোধিতা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, আবার যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তি সুবিধা পাচ্ছে—এমন ধারণা আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে বর্ণনা করে। ওই বিচার তদারককারী বিচারকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে ফ্লাভিও বলসোনারোর অনুরোধে ব্রাজিলের দুটি বৃহত্তম অপরাধী গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ওয়াশিংটন। লুলা সতর্ক করেছিলেন, এমন পদক্ষেপের প্রভাব ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিদের ওপরও পড়তে পারে।
ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের জন্যও ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারোকে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনার অভিযোগে ব্রাজিলের আদালত দোষী সাব্যস্ত করে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলে কনস্যুলার সেবা স্থগিত করে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা জানায়। ব্রাজিলের ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির প্রেসিডেন্ট এই পদক্ষেপকে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেন এবং একে ব্রাজিলের জনমত প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন।
এখানে নির্বাচনী অখণ্ডতার প্রশ্নটি সামনে আসে। আধুনিক গণতন্ত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের প্রকাশ্য চাপ যেমন প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তদেশীয় রাজনৈতিক প্রচারও ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে। ২০২২ সালে ব্রাজিলের নির্বাচনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক সহযোগী স্টিভ ব্যানন দেশটির নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে ভিত্তিহীন জালিয়াতির অভিযোগ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ ধরনের প্রচারণা ভোট গণনার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে এবং নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ব্রাজিলের নির্বাচনকে ঘিরে যে চিত্রটি উঠে এসেছে, তা লাতিন
আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘোষণা করে না। বরং এটি দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক, কূটনৈতিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক উপায়ে আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সেই ক্ষমতা আর আগের মতো নিঃশর্ত নয়। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উপস্থিতি, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্ক, স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, গণতন্ত্রের প্রকৃত ভিত্তি কি কেবল নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা, নাকি জনগণের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ? নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্র নিশ্চিত হয় না, যদি ভোটারদের মতামত বাইরের চাপ, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা কিংবা আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একইভাবে, মাদকবিরোধী অভিযান বা নিরাপত্তার অজুহাতে কোনো রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা হলে আইনের শাসনের ভিত্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ড. হুয়ান জাহির নারাঞ্জো ক্যাসেরেস ও ড. শ্যানন ব্রিনকাটের বিশ্লেষণের তাৎপর্য এখানেই। ব্রাজিলের নির্বাচন তাদের কাছে কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ঘটনা নয়; এটি বিশ্বব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর কতটা স্বাধীন থাকবে, সেই প্রশ্নেরও পরীক্ষা। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো যদি নিজেদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া, বিচার বিভাগ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়, তাহলে তাদের আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় অভিন্ন নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল যুগের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের বিধিব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। অন্যথায়, গণতন্ত্রের নামে পরিচালিত ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় জনগণের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

মোদির সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর প্রায় প্রতিদিনের বিক্ষোভ মোদির সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর মাত্র কয়েক মাস আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় একই ধরনের বিক্ষোভের মুখে তার শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

নড়বড়ে মুশফিকুরকে কেন খেলাচ্ছে বাংলাদেশ?
আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের একমাত্র টেস্টের স্কোয়াড যখন ঘোষিত হয়, তখন থেকেই আলোচনা ছিল মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বাইরের এরকম একটা অগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কেন মুশফিকুরকে দলে রাখা হলো, সেটা প্রশ্নের উদ্রেক করেছিল। কেননা মুশফিকুরের স্কোয়াডে থাকা মানেই একাদশে থাকাটাও ন

নিউইয়র্ক টাইমস: ট্রাম্পের প্রতি রিপাবলিকানদের হতাশা বাড়ছে
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। পরিবর্তনটি সরাসরি ডেমোক্র্যাটদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বা রিপাবলিকান ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং এর কেন্দ্রে রয়েছে ক্লান্তি

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কীভাবে আরও স্পষ্ট হচ্ছে?
পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীই প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে এসেছে। মুনিরকে তার পূর্বসূরিদের যেকোনো ব্যক্তির তুলনায় দেশের অভ্যন্তরে অধিক ক্ষমতাধর বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়।