১৫৮৫ টাকার এলপি সিলিন্ডার গ্যাস খোলা বাজারে বিক্রি হয়েছে ২১০০ টাকায়। অক্টোবরে ১৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলো। এখন ভোক্তা কিনছে ২২০০ টাকায়। আমদানিকারকদের দাবি, এই দাম ২,১৩৭ টাকা করা হোক। পরিবেশক আর খুচরা ব্যবসায়ী পর্যায় সিলিন্ডারপ্রতি বাড়াতে চায় দেড় শ টাকা। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে–ভোক্তা পাবেন কততে?
এরই মধ্যে এলপি গ্যাসের ডিলাররা কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ‘বিক্রি বন্ধ’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। কিন্তু সরকারের হস্তক্ষেপ এবং তাদের দাবির বিষয়ে গণশুনানির মাধ্যমে দাম পুনঃনির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিলে সেই ধর্মঘটের ঘোষণা প্রত্যাহার করে এলপি গ্যাস পরিবেশক কল্যাণ সমিতি। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে এ গণশুনানি।
পরিবেশক পর্যায়ে ১০০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ২০ টাকা কমিশন বাড়াতে ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে আবেদন করেছে। একই সাথে এলপিজি গ্যাস আমদানিকারকদের সংগঠন (লোয়াব) জাহাজভাড়া, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ খরচ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১,৮৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,১৩৭ টাকা (৩০০ টাকা বৃদ্ধি) বাড়াতে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে আবেদন করে। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে নিষ্পত্তি করতেই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে এলপিজির মূল্য ও সংশ্লিষ্ট চার্জ না বাড়িয়ে নির্ধারিত মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুত গোপন ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ক্যাব।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, “আমদানিকারকদের উত্থাপিত ব্যয়বৃদ্ধির দাবি প্রকৃত লেনদেনের দলিল ও নিরীক্ষিত হিসাবের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়লেই স্থানীয় পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয় একই অনুপাতে বাড়ে না। তাই আমদানি মূল্যবৃদ্ধির যুক্তিতে সব পর্যায়ে চার্জ ও কমিশন বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই। একই খরচ একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা অদক্ষ পরিচালনার দায় ভোক্তার ওপর চাপানো যাবে না।”
তবে, ভোক্তাদের শঙ্কা–অতীতে কমিশনের শুনানির পরও ফল পাওয়া যায়নি। এবারও তেমনটা হতে পারে। ভোক্তাদের পক্ষ থেকে যতই অকাট্য ও বাস্তব তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি তুলে ধরা হোক, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত যায় সরকার কিংবা ব্যবসায়ীদের অনুকূলে। দাম বাড়ে। ভোক্তা চাপে পড়ে।
ভোক্তাদের এই শঙ্কা অমূলক নয়। কারণ, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশজুড়ে বাজারে এলপি গ্যাসের সংকটে ১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার ২১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সে সময় এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ও আমদানীকারকদের হিসাবে জানানো হয়, চাহিদার চেয়ে বেশি আমদানি করা হয়েছে। অথচ খুচরা বিক্রেতারা জানায় সরবরাহ নেই।
এদিকে কমিশন বলছে, বাজারে নির্ধারিত দাম বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের নাই। সরকারের দিক থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকারকে কঠোর হওয়ার কথা বলা হয়। কিছু অভিযান চলে। কিন্তু পরিস্থিতি একই থেকে যায়।
এর পর ১২ কেজি সিলিন্ডারে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে অক্টোবরের দাম ১৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে কমিশন। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বৃদ্ধি আর ফ্রেইট কস্ট বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে এলপি গ্যাসের দাম (দাম নির্ধারণী সূত্র অনুযায়ী) বেড়ে যায়। তবু এই দর সেপ্টেম্বরজুড়ে বাজারদরের (১৫৮৫ টাকা) চেয়ে কম হওয়ায় আশাবাদী হয়েছিল ভোক্তারা।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাস্তবতা ভিন্ন। এই সময়ে ২১০০ টাকায় কোনো ভোক্তা ১২ কেজির এক সিলিন্ডার গ্যাস পেলে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে এখনো চার থেকে পাঁচ শ টাকা বেশি দিয়েই কিনতে বাধ্য হচ্ছে ভোক্তারা। এবার নতুন করে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম সমন্বয় করার পর এ পরিস্থিতি বদলাবে কি না–সে প্রশ্ন তাই উঠছেই।
রাজধানীর শুক্রাবাদ বাজারে এলপি গ্যাস কিনতে আসা ফখরুল ইসলাম চরচাকে বললেন, “লবণ, পেঁয়াজ, ডিম হলে ম্যানেজ করা যেত। এলপি গ্যাস তো সরাসরি পেটে টান দেয়। চুলা না জ্বললে সংসার চলবে কীভাবে?”
ভোক্তারা মনে করেন, এলপি গ্যাসের মতো এমন জরুরি পণ্য তদারকি ছাড়া চলতে পারে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম চরচাকে বলেন, “এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন তার আইনি এখতিয়ার অনুযায়ী কাজ না করায় এ ধরনের সংকট তৈরী হয়েছে।”