দেশজুড়ে মারাত্মক সরবরাহের তীব্র ঘাটতির মধ্যেই এলপি গ্যাসের দাম আবারও বৃদ্ধি করায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। যেসব এলাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সরকার-নির্ধারিত ১,৮৩৭ টাকা মূল্যের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২,২০০ টাকা থেকে শুরু করে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত চড়া দামে।
গতকাল রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণের ঘোষণা দেয়। খবর ইউএনবির।
তবে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের খুচরা বাজারে ভোক্তারা আগে থেকেই চরম বিশৃঙ্খলার শিকার হচ্ছেন। যেখানে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২,২০০ থেকে ২,৬০০ টাকায়—যা সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি। পাশাপাশি দেশের বহু খুচরা দোকানে গ্যাসে ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং অনেক দোকান একেবারেই খালি পড়ে রয়েছে।
যদিও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল) তাদের ১২.৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৭৭৭ টাকায় অপরিবর্তিত রেখেছে, তবে বাজারে তাদের নগণ্য শেয়ার থাকায় দেশের ৯৮ শতাংশেরও বেশি বোতলজাত গ্যাস ব্যবহারকারী সম্পূর্ণরূপে বেসরকারি পরিবেশকদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সচিবালয়ে এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে জরুরি বৈঠক করার পরদিনই এই মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটল।
এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি মন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দেন যে বাজার সিন্ডিকেটগুলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কি না তা তদন্ত করে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
পাইপলাইনের গ্যাসের ঘাটতিতে বেড়েছে এলপিজির চাহিদা
খাতসংশ্লিষ্ট ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের চরম ঘাটতিই দেশে এলপিজির অভূতপূর্ব চাহিদার মূল কারণ।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে স্থানীয় উত্তোলন ও এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ মিলছে মাত্র ২,৬০০ এমএমসিএফডি।
এর ফলে সৃষ্ট লোডশেডিং এবং বাসা-বাড়ির পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় হাজার হাজার পরিবার, বাণিজ্যিক রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান বোতলজাত এলপিজির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে। এতে এলপিজির যে চাহিদার বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যমান বেসরকারি সরবরাহ নেটওয়ার্ক।
আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন ও ফ্রেইট ভাড়া বৃদ্ধি
স্থানীয় সংকটের পাশাপাশি বেসরকারি আমদানিকারকেরা আন্তর্জাতিক বৈরী পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরছেন।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে সমুদ্রে ভাসমান ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট। ছবি: চরচা
সেপ্টেম্বর মাসের জন্য সৌদি আরামকো প্রোপেনের কন্টাক্ট প্রাইস (সিপি) প্রতি টন ৬২৫ ডলার এবং বিউটেনের দাম ৬৬০ ডলার নির্ধারণ করেছে।
তবে আরও বড় বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে এলপিজির সহজলভ্যতা কমে গেছে এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের (ফ্রেইট) খরচ রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। আমদানিকারকদের দাবি, বিইআরসি প্রতি টন পরিবহন খরচ ১৬০ ডলার ধরে খুচরা মূল্য হিসাব করলেও বাস্তবে বিশ্ববাজারে জাহাজের ভাড়া বেড়ে প্রতি টনে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। এতে ভারী আর্থিক ক্ষতি এড়াতে বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানি কমাতে বাধ্য হয়েছে।
আমদানি তথ্য নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
চলতি বাজার সংকট এলপিজি খাতের ভেতরের দ্বন্দ্বকেও প্রকাশ্যে এনেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে এলপিজি আমদানির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন হলেও সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার টনে।
তবে এলপিজি পরিচালকদের একটি দল জ্বালানি বিভাগে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে দাবি করেছে যে আমদানির পরিমাণ স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল ছিল। তাদের অভিযোগ, কিছু বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে জাহাজ থেকে আমদানিকৃত এলপিজি খালাস ও বাজারে ছাড়তে ইচ্ছে করে বিলম্ব করছে। তারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
শীতকাল ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানির স্বাভাবিক চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাজার তদারকি এবং আমদানিতে সুনির্দিষ্ট সহায়তা না দিলে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের এলপিজি বাজার আরও গভীর অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা।
বিইআরসির ভূমিকা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ক্ষোভ
এলপিজির এই মূল্যবৃদ্ধির কড়া সমালোচনা করে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বিইআরসির এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ বাজার কারসাজির স্বীকৃতি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, খুচরা বাজারে সরকারি দাম বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এভাবে দাম বাড়িয়ে দেওয়া কেবল অসাধু সিন্ডিকেটকেই সুরক্ষার পথ তৈরি করে দেয়, সাধারণ মানুষের জন্য গ্যাস পাওয়া নিশ্চিত করে না।
প্রখ্যাত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন নীতিগত দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে বলেন, অবক্ষয়িত দেশীয় পাইপলাইন গ্যাসের বিকল্প হিসেবে জাতীয় চাহিদাকে আমদানিকৃত এলপিজির দিকে ঠেলে দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় বাফার স্টক (মজুত) বাড়ানো হয়নি বা কোনো মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন করা হয়নি। এর ফলে আমদানিকৃত এই খাতের সাধারণ ভোক্তাদের পুরোপুরি বেসরকারি কার্টেল এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়ার ওঠানামার দয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।