হাতিরপুল কাঁচা বাজারে এলপি গ্যাসের দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার চাইতেই এক কথায় উত্তর এল, “নাই”। একটু অনুরোধ করার বললেন, “দেওয়া যাবে, কিন্তু দাম দিতে হবে ২৩ শ টাকা।”
সরকারি দাম ১৬০০ টাকার কম। একথা বলাতেই নিমেষে মত বদলে গেল দোকানির চেহারা। বললেন, “এটা ছিল। এখন আর নাই।”
আজ বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের জনতা ট্রেডও জানাল, তাদের কাছে এলপি সিলিন্ডার নাই। সন্ধ্যার পর যোগাযোগ করতে বলল। জানাল, দাম দিতে হবে দুই হাজার টাকা। তাদের যুক্তি, সরবরাহ কম তাই দাম বেশি। খিলগাঁও, মগবাজার, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার এলপিজি গ্রাহকরা ১২ কেজি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ২৫ শ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করছেন।
অথচ, দেশে এলপি গ্যাসের সংকট নেই বলে দাবি করছেন আমদানিকারক ও অপারেটররা। তাদের দাবি, দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আমদানিও অব্যাহত আছে। তবে বাজারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিলেই পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং, বাড়তি বিল, মাসিক বিল দিয়েও পাইপলাইনে গ্যাসের সংকটের মধ্যে সাধারণ মানুষের সামনে নতুন বিপত্তির নাম এখন এলপি সিলিন্ডার গ্যাস।
গত ২ সেপ্টেম্বর আগের মাসের তুলনায় দাম ১৩ টাকা কমানো হয়। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে, বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধির পর থেকে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা।
গতকাল মঙ্গলবার জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এলপিজি খাতের ব্যবসায়ীরা সরকারকে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও পরিবহন পরিস্থিতিতে চাপ থাকলেও দেশে বর্তমানে বড় ধরনের সংকট নেই।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। দেশে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। প্রায় ১ কোটি গ্রাহক এ জ্বালানি ব্যবহার করেন। মোট ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশ যায় গৃহস্থালির রান্নায়। এ ছাড়া পরিবহন ও শিল্পকারখানায়ও এলপিজি ব্যবহার হয়। বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ সরবরাহ বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আসে।
তবে, এ বিষয়ে এলপিজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সেক্রেটারি আহসান জব্বার চরচাকে বলেন, “গত মাসে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আসার কথা থাকলেও তা আসেনি, যার ফলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।” তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী সংকটের কারণে এবং অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দাম বাড়ায় এলপিজির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের দাম অনেক বেড়েছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটছে এবং জাহাজের ভাড়া বা প্রিমিয়াম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য এক আমদানিকারক বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলপিজি কার্গো সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে জাহাজ ভাড়াও।”
দুই ব্যবসায়ীই দাবি করেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো সরবরাহকারী চুক্তির পরিমাণের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম পণ্য দিচ্ছে। আবার খোলাবাজার থেকেও চাহিদামতো কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সরবরাহ ধরে রাখতে রেশনিং করছে।
তারা বলছেন, দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ পথে একই সময়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় পর্যাপ্ত এলপিজি কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। সেপ্টেম্বরে তাদের প্রায় ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে; যা আগের মাসের চেয়ে কম। উৎপাদক পর্যায়ে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাজারে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা চেষ্টা করছেন।
খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অনেকের অভিযোগ, কয়েকটি কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না। এতে বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। তবে কোম্পানিগুলোর অভিযোগ, সরবরাহ কমার সুযোগ নিয়ে কিছু ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা সিলিন্ডার মজুত করে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।
আমদানি কিছুটা কম হলেও বাজারে সরবরাহ সংকট নেই দাবি করে লোয়াব সেক্রেটারি বলেন, “লোয়াব কেবল তাদের সদস্য অপারেটররা নির্ধারিত নিয়মে বিক্রি করছে কি না তা নজরদারি করতে পারে। ডিস্ট্রিবিউটর বা রিটেইলারদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার লোয়াবের নেই। বাজারে বেশি দামে বিক্রি রোধ করতে বিইআরসি, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাজার তদারকি করার জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
একই তাগিদ দেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান। চরচাকে তিনি বলেন, “মিডিয়া ডেকে ম্যাজিস্ট্রেট সাথে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে অসাধু ব্যবসায়ীদের দমন করা যাবে না। এর জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে ভোক্তা অধিদপ্তরকে।”
এদিকে, বুধবার বিকেলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সারা দেশে নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের সাথে অনলাইন বৈঠকে এমন নির্দেশনা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।