দেশের টেক্সটাইল খাতের বন্ধ কারখানাগুলো আবার চালুর কোনো খবর নেই। কোথাও রপ্তানি অর্ডার না থাকায় সৃষ্টি হয়েছে সংকট, কোথাও রয়েছে ব্যাংক ঋণ ও অর্থায়নের জটিলতা। আবার কোথাও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা বীমার টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তারা নিশ্চিত বলতে পারছে না, কবে কারখানা চালু হবে। এসব বন্ধ কারখানাগুলোর হাজারো কর্মী অনেকে এখনো বেকার। কেউ কেউ অন্য কারখানায় কাজ নিয়েছেন।
বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়েকটি কারখানার মালিক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। ঋণ পুনঃতফসিল, নতুন অর্থায়ন, বীমার দাবি নিষ্পত্তি এবং নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের মতো বিষয়গুলোই এখন কারখানাগুলো চালুর পথে বড় বাধা হয়ে আছে। এর মধ্যে নতুন করে এসেছে জ্বালানি সংকট। তাই কারখানাগুলো ঘুরে দাঁড়াতে যতটা এগিয়েছিল, এই সংকটে আবার তারা পিছিয়ে পড়েছে।
ঋণ পুনঃতফসিল করে কারখানা চালুর চেষ্টা
চলতি বছরের ২৩ জুন সাময়িকভাবে বন্ধ হয় অ্যাপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস। ওই দিন শ্রমিকদের চাকরির বিভিন্ন সার্ভিস বেনিফিট নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হলে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানায় লে-অফ ঘোষণা করে। এতে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েন।
এই কোম্পানিটি এখনো বন্ধ রয়েছে। রপ্তানি ক্রয়াদেশ না থাকা ও আর্থিক সমস্যার কারণে বন্ধ রয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি চরচাকে বলেন, “করোনার পর থেকেই রপ্তানি ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় তাদের আর্থিক সংকট তৈরি হয়। এরপর বন্ধ হয়ে যায়।”
ওই কর্মকর্তা বলেন, “কারখানাটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। মূলত করোনার পর থেকেই রপ্তানি অর্ডার না থাকায় আমরা আর্থিক সংকটে পড়ি। আমরা ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে ঋণ রিসিডিউল সম্পন্ন করে কারখানাটি পুনরায় চালুর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
অর্থাৎ কারখানাটি আবার চালুর উদ্যোগ থাকলেও সেটি এখনো পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পর্যায়েই রয়েছে। ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল শেষ করে ব্যবসার আর্থিক চাপ সামাল দিতে পারলেই উৎপাদনে ফেরার চেষ্টা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এটি এখন একটি বড় বাস্তবতা। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শুধু কারখানা খুলে দিলেই ব্যবসা স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে না। পুরনো ব্যাংক ঋণ, সুদ, চলতি মূলধন সংকট এবং বাজারে ক্রয়াদেশ অনিশ্চয়তা একসঙ্গে সামাল দিতে হচ্ছে অনেক উদ্যোক্তাকে।
বিএমআরই করতে গিয়ে আটকে গেছে মেট্রো স্পিনিং
মেট্রো স্পিনিং লিমিটেডের উৎপাদন ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে বন্ধ রয়েছে। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রায় ৩০ বছরের পুরনো কারখানাটি আধুনিকায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিএমআরই প্রকল্পের আওতায় নতুন কারখানা ভবন নির্মাণ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ করা হবে। এ কারণে প্রায় এক বছরের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি আরও প্রায় ১২ মাস উৎপাদন বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। কোম্পানিটি বলছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, সরবরাহকারীদের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি পেতে বিলম্ব, নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক অসন্তোষ ও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে বিএমআরই প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে।
মেট্রো স্পিনিংয়ের মালিক ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন চরচাকে বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানটি বিএমআরই (আধুনিকায়ন ও সংস্কার) প্রক্রিয়ার অধীনে ছিল। ব্যাংক থেকে অর্ধেক এলসি করে বাকিটা অন্য ব্যাংক থেকে করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ায় কোন ব্যাংক আর অর্থায়ন করেনি।”
খোকন বলেন, “নতুন যন্ত্রপাতি এনে ফেলে রাখা সম্ভব নয়। এ কারণে উৎপাদন স্থগিত রাখতে হয়েছে। বর্তমানে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সহায়তায় বাকি অর্থসংস্থানের চেষ্টা চলছে। ফলে মেট্রো স্পিনিংয়ের ক্ষেত্রেও দ্রুত উৎপাদনে ফেরার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি পাওয়া যাচ্ছে না। আধুনিকায়নের জন্য নেওয়া উদ্যোগই এখন অর্থায়নের অভাবে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধে পরিণত হয়েছে।”
বিটিএমএর সাবেক এই সভাপতি বলেন, “টেক্সটাইল খাতের অবস্থা দিন দিন নাজুক হয়ে পড়ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে অনেক এলাকায় লোডশেডিংয়ের সমস্যা ছিল। সর্বোপরি ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা মেটাতে না পারায় বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত এখন চরম হুমকির মুখে।”
তার মতে, চোরাপথে বিদেশি কাপড় আসাও দেশীয় শিল্পের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করছে। একই সঙ্গে দেশের টেক্সটাইল শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আগুনের পর বন্ধ, চালুর অপেক্ষায় জাহিন স্পিনিং
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে জাহিন স্পিনিং মিলস। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ। কারখানা পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে এখন মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বীমার দাবি নিষ্পত্তি ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কাজ শেষ করা।
জাহিন স্পিনিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান চরচাকে বলেন, “কারখানাটির বীমা সংক্রান্ত কার্যক্রম এখনো চলমান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে রিপোর্টও জমা দিয়েছে। বীমার দাবি নিষ্পত্তি এবং প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হওয়ার পরই কারখানাটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।”
মাহমুদুর রহমান বলেন, “অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি কোন নাশকতা বা শত্রুতার কারণে হয়নি। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের রিপোর্টেও বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। কারখানাটির ইন্স্যুরেন্সের কাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত রিপোর্টও জমা দিয়েছে। ইন্স্যুরেন্সের দাবি নিষ্পত্তি এবং কাজ শেষ হলেই কেবল আমরা কারখানা পুনরায় চালু করতে পারব।”
জ্বালানি সংকটে থমকে যাওয়া কারখানার সংখ্যা কত?
বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরনো মিলগুলোর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়া কারখানা। জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের টেক্সটাইল মিলগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোন কোন কারখানা সক্ষমতার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে, আবার অনেক কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল গত আগস্টের শেষ দিকে চরচাকে বলেন, “গত এক মাসে প্রায় ৬০০ টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। তবে এসবের কতটি শুধু জ্বালানি সংকটের কারণে বন্ধ হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব তখনো সংগঠনটির হাতে ছিল না। আর কারখানার সংখ্যা নিয়েও কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। যেমন: বিটিএমএ বলছে- সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৮০০। কিন্তু তাদের ওয়েবসাইটে প্রায় তিন থেকে চার শটির তালিকা পাওয়া যায়।
এই বিষয়ে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেখানে মূলত সদস্য কোম্পানির তালিকা দেওয়া আছে। আর একটি কোম্পানির একাধিক কারখানা ও ইউনিট থাকতে পারে। সেই হিসেবে সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৮ শ এর কাছাকাছি।
বিটিএমএর জয়েন্ট সেক্রেটারি মোহাম্মাদ জিয়াউর রহমান চরচাকে বলেন, “চলতি বছর জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আর ১৬৫টি কারখানা কম সক্ষমতা নিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।”
বন্ধের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অধিকাংশ বন্ধ হয়েছে জ্বালানি সংকটে। আর বাকিগুলো অন্যান্য কারণে বন্ধ হয়েছে। যেমন: অর্থায়নের কারণে, ব্যবসার পরিবেশ অবনতি হওয়ার কারণে কিছু কারখানা বন্ধ হয়েছে।”
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ বলেন, “গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। আগে থেকেই আর্থিক সংকটে থাকা মিলগুলোর জন্য এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও সুদসহ বিভিন্ন খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।”
এদিকে, সংকটে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণে গ্রেস পিরিয়ড ও পুনঃঅর্থায়নের সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিটিএমএ। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার ওপর জোর দিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি। এর আগে জুলাইয়ের শেষ দিকে এক বৈঠকের পর তিনি জানিয়েছিলেন, গ্যাস সংকটে টেক্সটাইল মিলগুলোর উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বিটিএমএ ১৭ সেপ্টেম্বর জানায়, ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করেছে এবং অনেক মিল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে গার্মেন্টস রপ্তানিকারকদের প্রয়োজনীয় সুতা ও কাপড় সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলেও সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন।
তবে গ্যাস সরবরাহে উন্নতি হওয়ার পর কতগুলো কারখানা উৎপাদনে ফিরতে পেরেছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য সংগঠনটির সভাপতি বা অন্য কোনো নেতা দিতে পারেনি।