আবারও কি ব্যবসায়ীদের দাবিই মেনে নিচ্ছে সরকার? আজ বৃহস্পতিবার এলপি গ্যাসের দাম পুনর্নির্ধারণ নিয়ে গণশুনানি শেষে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্যে এমন ইঙ্গিতই মিলছে।
গণশুনানিতে উপস্থিত এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীরা ১২ কেজির এলপি গ্যাসের দাম ২২৩২ টাকা নির্ধারণের দাবি জানান। তবে বিইআরসির কারগরি কমিটি এ দাম ১ হাজার ৯৭৬ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
শুনানি শেষে কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, ৫ বছর আগে নির্ধারিত কমিশন সমন্বয়ে এলপি গ্যাস পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের তোলা দাবিকে যৌক্তিক বলে মনে মরছে কমিশন।
সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের দাবির দিকেই কমিশন ঝুঁকে আছে বলতে হবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশনের শহীদ এ কে এম শামসুল হক খান মেমোরিয়াল অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে খুচরা পর্যায়ে এলপি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দেন ব্যবসায়ী ও ভোক্তা প্রতিনিধিরা।
গণশুনানিতে ১২ কেজি এলপি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২ হাজার ২৩২ টাকা প্রস্তাব করলেও বিইআরসির কারিগরি কমিটি সিলিন্ডারপ্রতি দাম ১৩৯ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করে।
শুনানি হলেই দাম বাড়ে
রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে শুনানিতে অংশ নেওয়া ভোক্তাদের কেউ কেউ তাদের বক্তব্যে সরাসরিই বলেছেন, বিইআরসি শুনানি করছে মানে ধরেই নেওয়া যায় দাম বাড়বে। এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেও ভোক্তাদের দাবি, এর পর যে দর ঠিক করে দেবে কমিশন, সেই দামেই যেন বাজারে এলপি গ্যাস পাওয়া যায়, তা কমিশন যেন নিশ্চিত করে।
টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ব্যাবসায়ীদের কমিশন বাড়ালে অবধারিতভাবেই এলপিজির দাম আরেক দফায় বাড়বে। এই গণশুনানি সেই দাম বাড়ানোর কেবল আনুষ্ঠানিকতা কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন করেছেন ভোক্তারা।
কমিশনের সমালোচনা করে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রতিনিধি ড. মিজানুর রহমান বলেন, “অপারেটরদের ‘সৃষ্ট’ কৃত্রিম সংকটের মুখে বিইআরসি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে গ্যাস বিক্রি করে ভোক্তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা অন্যায়ভাবে আদায় করা হচ্ছে। কাঠামোগতভাবেই এই অনিয়মের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।”
পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিইআরসি সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে অর্থনীতি সমিতির পক্ষে তিনি গণশুনানি বর্জনের ঘোষণা দেন।
এদিকে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর প্রতিনিধি শাহ আলম সরকার অভিযোগ করেন, এলপিজি খাতের নানা অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছে। তিনি বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে সব স্টেকহোল্ডারের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”
তবু অখুশি ব্যবসায়ীরা
বিইআরসির কারিগরি কমিটির সুপারিশ করা ১২ কেজির সিলিন্ডারের দামকে অযৌক্তিক বলছেন অপারেটররা। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি হুমায়ুন রশিদের দাবি, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক দর বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় বাজারে এলপিজির মূল্য সমন্বয় করা অপরিহার্য। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় এলপিজি খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির সিএমও আবু সাঈদ রাজা বলেন, “বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে কম সুদে ঋণ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। ফলে অপারেটরদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে সুদের হার ও ইক্যুইটি রিটার্ন যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা দরকার।”
ব্যাবসায়ীদের প্রস্তাবিত দরের যৌক্তিকতা তুলে ধরে শুনানিতে অপরেটররা বলেন, যদি ন্যূনতম খেয়ে-পরে বাঁচার নিশ্চয়তা না পান, তাহলে নির্ধারিত দরে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না ব্যবসায়ীরা। ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশনের বিষয়ে অপারেটররা বলেন, একজন খুচরা বিক্রেতা মাসে সীমিতসংখ্যক সিলিন্ডার বিক্রি করে ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও পরিবারের খরচ মেটান। বাজারে কৃত্রিম কারসাজি বন্ধ করতে হলে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলারদের মার্জিন বাস্তবসম্মত পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। না হলে বাজারে আবার অনিয়ম ও অস্থিরতা তৈরি হবে।
তাদের দাবি, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এমনভাবে মূল্য সমন্বয় করতে হবে যাতে ব্যবসায়ীরা টিকতে পারেন এবং ভোক্তারাও ন্যায্য মূল্যে গ্যাস পান। একই সঙ্গে বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অতিরিক্ত লাইসেন্স জটিলতা ও হয়রানি দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির দাবি জানান অপারেটর ও ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির দাবি
ডিস্ট্রিবিউটর সমিতির সভাপতি সেলিম খান জানান, সঠিক কমিশন না পাওয়া এবং টানা লোকসানের কারণে দেশের সিংহভাগ এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ডিস্ট্রিবিউটরদের ব্যবসা পরিচালনা করতে ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, বিইআরসি এবং পরিবেশ দপ্তরসহ একাধিক স্থান থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। এসব লাইসেন্স সংগ্রহ ও নবায়ন করতে ব্যবসায়ীদের অনিয়মিত খরচ ও দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়। বিইআরসির ডিস্ট্রিবিউটর লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করার জোর দাবি জানানোর পাশাপাশি বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতি সিলিন্ডারে ডিস্ট্রিবিউটর কমিশন অন্তত ১৫০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
একটি এলপিজি ব্যবসা চালাতে ছয়টি দপ্তরের অনুমোদন লাগে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকারের ট্রেড লাইসেন্স, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের মজুত লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ছাড়পত্র, বিইআরসির লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন)। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার সরকারি ফির বিপরীতে লাইসেন্স করতে বা নবায়নে অনানুষ্ঠানিক খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে তদারকিরও সংকট আছে। আইন অনুযায়ী ১০টির বেশি সিলিন্ডার মজুত করতে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু প্রায় ৫০ হাজার খুচরা বিক্রেতার বেশির ভাগের কোনো লাইসেন্স বা ফায়ার সেফটি অনুমোদন নেই।
বাজার কীভাবে স্বাভাবিক হবে?
বিইআরসির অনুমোদিত অপারেটর ৩৫টি। এর মধ্যে সরকারি দুটি ও বেসরকারি ৩৩টি। তবে এলসি খুলতে না পারা ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে বেশির ভাগ কোম্পানি নিয়মিত এলপিজি আনতে পারছে না। বেসরকারি অপারেটরদের মধ্যে ওমেরা, আই গ্যাস, ফ্রেশ, বিএম এনার্জি ও যমুনা–এই ছয়টি কোম্পানি নিয়মিত আমদানি করে পূর্ণাঙ্গ সরবরাহে সক্রিয় আছে।
বাজারে প্রায় এক কোটি সিলিন্ডার সরবরাহ করে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস লিমিটেড। কিন্তু এলসি খোলার জটিলতায় আমদানি ঘাটতিতে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বাকি ৭ থেকে ৮টি কোম্পানি অন্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে সিলিন্ডারপ্রতি ২ হাজার ৬০ টাকা পর্যন্ত দরে গ্যাস কিনে ডিস্ট্রিবিউটরদের দিচ্ছে। এই দর বিদ্যমান নির্ধারিত ভোক্তামূল্যের চেয়ে বেশি। ডিস্ট্রিবিউটররা বলছেন, সপ্তাহে ১ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদার বিপরীতে অনেকে পাচ্ছেন মাত্র ১০০টি।
বড় অপারেটররা বাজারে না থাকা এবং এক কোম্পানির সিলিন্ডার অন্য কোম্পানি ব্যবহার না করার নিয়মের কারণে আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজা হচ্ছে বলে জানান বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলারদের কমিশন বাড়ানোর প্রতি কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি, কমিশনের কারিগরি কমিটির প্রস্তাব ও ব্যবসায়ীদের সতর্কতামূলক বার্তা বিশ্লেষণ করে এ কথা পরিষ্কার করেই বলা যায়–আন্তর্জাতিক বাজার দর ও জাহাজভাড়া অপরিবর্তিত থাকলে আগামী মাস থেকে আরও বাড়বে এলপি গ্যাসের দাম।
এ বাস্তবতায় সেই ভোক্তাদের কাছেই ফিরতে হয়। শুনানিতে উপস্থিত ভোক্তা প্রতিনিধি সেরাজুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “দাম বাড়বে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু এলপি গ্যাস সিলিন্ডার কি সরকার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাবে?”