Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৯ অক্টোবর, ২০২৬
২৯ অক্টোবর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৯ অক্টোবর, ২০২৬
২৯ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ | স্বত্ব © চরচা
> বিশ্লেষণ

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে, উলুখাগড়ারা যাবে কোথায়?

চরচা ডেস্ক

চরচা ডেস্ক

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ২১: ৫৭
রাজায় রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে, উলুখাগড়ারা যাবে কোথায়?
আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে শক্তিধররা দুর্বলদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গ্রামে হঠাৎ কোনো হিংস্র শিকারি পশুর দেখা মিললে গ্রামবাসী কী করেন? প্রতিবেশিদের ডাক দেন, একজোট হয়ে থাকতে বলেন–যাতে শিকারি পশুটি কাউকে একা পেয়ে মেরে ফেলতে না পারে।

Advertisement

মার্ক কার্নি ঠিক সেই কাজটিই করেছেন। গত জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় কানাডার প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে এক ছাতার নিচে আসার জোর তাগিদ দেন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

বিশ্বনেতাদের সামনে মার্ক কার্নি স্পষ্ট করে বলেছেন, আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে শক্তিধররা দুর্বলদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে। যে আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতির ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যবস্থা চলত, তা আজ বড় বড় দেশগুলোকে লাগাম পরাতে পারছে না। আর ছোট বা মাঝারি দেশগুলো যদি ভেবে থাকে স্রেফ নতিস্বীকার করে আত্মরক্ষা করবে, তবে তারা ভুলের স্বর্গে বাস করছে। এই মুহূর্তে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সামনে দুটি পথ খোলা আছে–হয় সম্মিলিত জোট গড়ে নিজেদের রক্ষা করা, না হয় শক্তিশালী পরাশক্তিগুলোর ‘সহজ শিকারে’ পরিণত হওয়া।

কার্নি তার বক্তব্যে যে আজকের বিশ্বের দুই শীর্ষ পরাশক্তি আমেরিকা ও চীনের ব্যাপারেই সবাইকে সতর্ক করছেন, তা উপস্থিত সব নেতাই বুঝতে পারছিলেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মূলত কথাগুলো বলেছিলেন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। কয়েক দশক ধরে মার্কিন অর্থনীতির ছায়াতলে শান্ত ও নিরাপদ আশ্রয়ে থাকলেও, হঠাৎ করেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রোষানলে পড়ে গেছে কানাডা। এরপর থেকেই কার্নি আমেরিকার ওপর কানাডার অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। ট্রাম্পের সঙ্গে কার্নির এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই অন্যান্য মধ্যম শক্তির দেশগুলোও বেশ আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল।

তবে দাভোসে কার্নির সেই জোরাল আহ্বানের নয় মাস পেরিয়ে গেলেও, মধ্যম শক্তির দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার যৌথ উদ্যোগ এখনো বেশ ঢিলেঢালা ও হতাশাজনক।

কার্নির সেই বক্তব্য অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বের অনেক মধ্যম শক্তির দেশ আগে থেকেই যেসব কার্যক্রম শুরু করেছিল, তার সঙ্গে মিলে যায়। জোরপূর্বক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি, বাণিজ্য রুটগুলোর চোক পয়েন্ট ঘিরে ঝামেলা বা বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়া মিলিয়ে সময়টাই এখন অস্থির। আর এই অস্থির সময়ে বিশ্বের মোড়লদের দাপট কমানো, তাদের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে তৈরি হওয়া ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনা যে কত জরুরি–মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য সেটা কার্নির কাছ থেকে নতুন করে জানার দরকার পড়ে না। দেশগুলো তা কার্নির বক্তব্যের আগে থেকেই উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল।

কার্নির সেই ভাষণের পর দু-একটি ক্ষেত্রে মধ্যম শক্তির দেশগুলো একজোট হয়ে কোনো পরাশক্তির আগ্রাসন রুখে দিতে পেরেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন এবং সে পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো যেকোনো দেশকে তার বিখ্যাত (!) ট্যারিফের বোঝায় পঙ্গু করে দেওয়ার হুমকি দেন, তখন ইউরোপের নেতারা গ্রিনল্যান্ডের শাসক দেশ ডেনমার্কের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। এতে একদিকে বিশ্বের বড় শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধাক্কা লাগে, অন্যদিকে ট্রাম্পের যেকোনো ট্যারিফের ক্ষেত্রে পাল্টা ট্যারিফের ঘোষণা দেয় ইউরোপ। তার এক ঘোষণার প্রভাব যে এতটা নেতিবাচক হবে, তা আবিষ্কার করে কিছুটা হতবাক হয়ে পড়েন ট্রাম্প। চাপের মুখে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন তিনি। শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ড দখলের জেদ ছেড়ে তিনি কেবল দেশটির সঙ্গে একটি বর্ধিত নিরাপত্তা চুক্তিতেই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হন।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্স
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্স

প্রতিরোধের এমন চিত্র এশিয়াতেও দেখা গেছে। তাইওয়ানকে ঘিরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির এক মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয় চীন। তাকাইচি বলেছিলেন, জাপানের গণতান্ত্রিক প্রতিবেশি তাইওয়ানে যদি চীন হামলা করে, তাহলে সেটাকে জাপান তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার ওপর হুমকি হিসেবে দেখবে। জাপানের দিক থেকে দেখলে কথাটা হয়তো সত্যি, তবে এই সত্যি প্রকাশ্যে জোর আওয়াজে বলাটা কূটনৈতিক দিক থেকে অস্বস্তিকর। কেন অস্বস্তিকর, তা স্পষ্ট হয়েছে চীনের প্রতিক্রিয়ায়। তাকাইচির মন্তব্যে ক্ষুব্ধ চীন প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে জাপানের ওপর, এমনকি জাপানে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেয়। চীনা কর্মকর্তারা তাকাইচির উদ্দেশে অপমানসূচক কথাবার্তার পাশাপাশি তাকে যুদ্ধাপরাধীও বলেছেন। কিন্তু একবার কথাটা বলে ফেলার পর পিছু হটা তাকাইচির পক্ষে রাজনৈতিকভাবে আর সম্ভব ছিল না, তাকাইচি পিছু হটেননি। হটবেনও না।

কানাডা কখনো বিক্রি হবে না, ট্রাম্পকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নিIMG_3457

তবে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর এমন দু-একটি সাহসী পদক্ষেপের বিপরীতে দুর্বলতা আর নেতৃত্বহীনতার উদাহরণ আরও বেশি করে চোখে পড়ে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো, এই দেশগুলোর স্বার্থের দিক থেকে একে অন্যের চেয়ে এতই আলাদা যে, এদের এক ছাতার নিচে আসাই বরং কঠিন। তাছাড়া যে পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অবসান নিয়ে কার্নির বক্তব্যে আক্ষেপ ঝরেছে, সেই ব্যবস্থার ব্যাপারে দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি বা আবেগ এক নয়।

বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো সব সময়ই আমেরিকাকে একটা কর্তৃত্ববাদী দেশ হিসেবে দেখে এসেছে এবং সামগ্রিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বকে চরম আত্মকেন্দ্রিক মনে করে। এদিকে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা বা ভারতের মতো প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিগুলো কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না যে, কানাডার মতো একটা ‘ধনী কিন্তু অতিসাধারণ ও প্রভাবহীন দেশ’কে আমেরিকা-পরবর্তী নতুন বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার কে দিল!

কার্নির এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে আরও বড় ঝামেলা হলো–কোন দেশগুলো যে আসলে ‘মধ্যম শক্তি’, তা নির্ধারণের সর্বসম্মত কোনো ধারণাই তো নেই! এ ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত মত হলো, যেসব দেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলার কিছু না কিছু ক্ষমতা আছে–সেটা হতে পারে ওই দেশটির আকার, আঞ্চলিক প্রভাব, সম্পদ, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি, কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক কিংবা সামরিক শক্তি–তারাই মধ্যম শক্তির দেশ। এই বিচারে ইউরোপের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্কের মতো জি-২০ জোটের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি দেশকে অনায়াসেই এই তালিকায় ফেলা যায়।

রাশিয়া প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
রাশিয়া প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ব্রাজিল ও ভারতকেও এই শ্রেণিতে ফেলা যায়, যদিও এই দুই দেশ আগামী দিনগুলোতে নিজেদের উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবেই দেখতে চায়। অন্যদিকে রাশিয়া নিজেকে পারমাণবিক শক্তিধর পরাশক্তি মনে করলেও, তাদের অর্থনৈতিক মন্দা, জনমিতিক বিপর্যয় এবং চীনের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা দেশটিকে বেশ জরাজীর্ণ এক পরাশক্তিতে পরিণত করেছে। তা সত্ত্বেও রাশিয়াকে নিছক মাঝারি সারির দেশ বলা চলে না। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্বমঞ্চে হাতে গোনা কয়েকজন নেতার একজন, যাকে ট্রাম্প নিজের সমকক্ষ ভাবেন। এছাড়া ইউরোপীয় রাজনীতিকদের রাতের ঘুম হারাম করার জন্য পুতিনের আগ্রাসী মনোভাবই যথেষ্ট।

ট্রাম্প যে কারণে ছাড় দিচ্ছেন পুতিনকেtrump and putin

আবার কিছু দেশ আছে যারা আকারে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি তাদের হাতে আছে। যেমন নেদারল্যান্ডস ও তাইওয়ান; তাদের হাতে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ বানানো এমন সব ফ্যাক্টরি আছে যেগুলোকে ছাড়া এই শিল্পের সাপ্লাই চেইন অচল। এর বাইরে ইসরায়েল, সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিছু দেশ রয়েছে, যাদের বাণিজ্যিক ও সামরিক প্রভাব নিজ অঞ্চল ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে।

কার্নির বক্তব্যের আরও একটি বড় দুর্বলতা ছিল। তিনি বর্তমান ভূ-রাজনীতি সংকটের ভয়াবহতা ঠিকই টের পেয়েছিলেন, কিন্তু বড় পরাশক্তিগুলোর কাছ থেকে মূল হুমকিটা কোন দিক থেকে আসছে, তা চিহ্নিত করতে ভুল করেছিলেন। বক্তৃতার শুরুতেই তিনি ‘পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব’ বা বিশ্ব আধিপত্য নিয়ে আমেরিকা ও চীনের মতো দেশের লড়াইয়ের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। এই দুই পরাশক্তির ‘মাঝামাঝি থাকা দেশগুলোকে’ তিনি অনুরোধ করেছিলেন, তারা যেন কোনো এক পক্ষের অন্ধ সমর্থক না হয়ে কিংবা পরাশক্তিগুলোর অনুগ্রহ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় না নেমে বরং একজোট হয়ে শক্তিশালী একটি ‘তৃতীয় বিকল্প’ গড়ে তোলে।

তবে নয় মাস পার হয়ে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বে বিশ্ব যতটা না জেরবার হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের গোপন স্বার্থান্বেষী সমঝোতার কারণে। যেমন–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে গিয়ে ট্রাম্প নিজেই পুতিনের কাছ থেকে ডিজেল কিনছেন এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা বন্ধের হুমকি দিচ্ছেন। আবার অন্যদিকে এক ভঙ্গুর সাময়িক চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যিক উত্তাপও আপাতত থিতু হয়েছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা জানাচ্ছেন, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা এখন প্রকাশ্যে ও সগর্বে নিজেদের দেশকে ‘জি-টু’ বা বিশ্বের একচ্ছত্র প্রভাবশালী পরাশক্তি-জোড় হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

পুরনো বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটেছে, এরপর যা আসতে পারে world order (1)

গুলতি দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না

এর ওপর আবার যোগ হয়েছে দিন দিন গাঢ় হতে থাকা চীন ও রাশিয়ার একপেশে পশ্চিমবিরোধী জোট। ভাগ্য ভালো হলে কোনো মধ্যম শক্তির দেশ হয়তো একটি পরাশক্তির হুঙ্কার রুখে দিতে পারে। কিন্তু দুই পরাশক্তি যখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একসাথে হাত মেলায়, তখন তাদের চ্যালেঞ্জ করার শক্তি বা আশা কোনোটিই আর থাকে না।

ভূ-রাজনীতি যে এই রূপ নেবে, তার সঠিক পূর্বাভাস বহুবছর আগেই দিয়ে গিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরের কঠোর কিন্তু দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ। আমেরিকা ও চীনের দ্বন্দ্ব কীভাবে নিরপরাধ অন্যান্য দেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়–তা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলতেন, “হাতিতে-হাতিতে লড়াই হলে দুর্বাঘাসই পিষ্ট হয়।” তবে তার এই বিখ্যাত প্রবাদের একটি দ্বিতীয় অংশও রয়েছে, যা খুব একটা আলোচনায় আসে না। “আর হাতিরা যখন প্রেমে মজে (সমঝোতা করে), তখনও সেই দুর্বাঘাসেরই মরণ হয়।”

খাতা-কলমে আমেরিকা ও রাশিয়া এখনো একে অন্যের চিরশত্রু। কিন্তু বাস্তবে ওয়াশিংটনে এসে ইউরোপীয় মিত্ররা রীতিমতো তাজ্জব হয়ে যাচ্ছেন, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইউক্রেনকে সহায়তার অপরাধে উল্টো ইউরোপকেই ধমক দিচ্ছেন! তাদের দাবি, ইউক্রেনকে সাহায্য করা মানে নাকি রাশিয়াকে আরও উসকানি দেওয়া!

একই দৃশ্য জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরেও। আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা বিস্মিত হয়ে দেখছেন, অনেক বিষয়েই আমেরিকা, চীন ও রাশিয়া কীভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে–বিশেষ করে নতুন মহাসচিব নিয়োগের মতো বিষয়ে। কূটনৈতিক পাড়ায় জোরাল গুঞ্জন, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী এই তিন পরাশক্তি এমন এক প্রার্থীকে বেছে নিতে চায়, যিনি সংস্থার কেবল দাপ্তরিক কাজ সামলাবেন, কিন্তু পরাশক্তিগুলোর মোড়লগিরিতে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। জাতিসংঘের চলতি ভাষায়, তিনি হবেন স্রেফ একজন ‘সচিব’, বড় শক্তিগুলোর ওপর ছড়ি ঘোরানোর মতো কোনো ‘সেনাপতি’ নয়।

এদিকে আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার এই সাময়িক মধুচন্দ্রিমা কতদিন টিকবে, তা-ও নিশ্চিত নয়। এই সমঝোতা মূলত টিকে আছে ওভাল অফিসে বসা একজন ব্যক্তির একক ইচ্ছার ওপর। ট্রাম্প কখনোই চীন-বিরোধী নীতিতে বিশ্বাসী কোনো কট্টর নেতা ছিলেন না। মানে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র শাসন নিয়ে তার কোনোদিন মাথাব্যথা ছিল না। এখন তার দ্বিতীয় মেয়াদে এসে, চীনের অর্থনৈতিক মডেল কিংবা তাদের আঞ্চলিক আধিপত্যের লাগাম টানতে বেইজিংয়ের সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়ার কোনো আগ্রহই ট্রাম্পের নেই। তার মূল লক্ষ্য খুব সাধারণ। চীনের কাছে সয়াবিন বিক্রি করা, বোয়িং বিমান গছিয়ে দেওয়া এবং চীনের দিক থেকে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, তা নিশ্চিত করা।

আর সে কারণেই তিনি তার কূটনীতিক ও সামরিক কর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সাথে যেকোনো সংঘাত এড়িয়ে চলতে। এমনকি তিনি তাইওয়ানের কাছে প্রতিশ্রুত অস্ত্র সরবরাহও আটকে রেখেছেন। অতি সম্প্রতি তাদের শীর্ষ বৈঠকের চিত্র দেখেও পরিষ্কার বোঝা যায়, এআই প্রযুক্তির মতো স্পর্শকাতর খাতে তাদের নিজ নিজ দেশের আধিপত্যের ওপর বৈশ্বিক কোনো আন্তর্জাতিক নজরদারির আহ্বানে কান দেওয়ার ইচ্ছা ট্রাম্প বা সি চিনপিং কারোরই নেই।

তবে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই সাময়িক স্বস্তির সম্পর্ক যেকোনো মুহূর্তেই ভেঙে পড়তে পারে। কারণ চীনা নেতৃত্ব ছোট-বড় সব বিষয়েই নিজেদের কঠোর অবস্থান ধরে রাখছে। গত সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন সফরের সময় যৌথ সামরিক ঘাঁটি ‘অ্যান্ড্রুজ’-এ ব্যক্তিগতভাবে অভ্যর্থনা জানানোসহ নানাভাবে সি চিনপিংয়ের মন জোগানোর চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের আশা ছিল, জবাবে চীনের ডিজেল সরবরাহ বাড়িয়ে বেইজিং আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সুবিধা করে দেবে। কিন্তু ঘটে উল্টোটা। মাত্র কয়েক দিন পরই চীন ডিজেল রপ্তানি আটকে দিলে ট্রাম্প চরম ক্ষুব্ধ হন।

ভূ-রাজনীতির এই অস্থিতিশীলতা ছোট দেশগুলোকে এক উভয়সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে–ট্রাম্প যেভাবে স্বার্থের ভিত্তিতে বিশ্বকে ভাগ করার ক্ষেত্রে চীনকে তোষণ করছেন, ছোট দেশগুলো কি সে নীতি মেনে চলবে? নাকি দুই শীর্ষ পরাশক্তির মধ্যে আবারও পুরোদমে লড়াই ফিরে আসুক, সেটাই চাইবে?

এদিকে ট্রাম্পের অন্যায্য আচরণের শিকার হিসেবে কানাডার প্রতি বহু বিশ্বনেতা প্রকাশ্যে সহানুভূতি দেখালেও, কার্নির একটি যুক্তির সরলতা নিয়ে বন্ধ দরজার আড়ালে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। কার্নির দাবি ছিল–মাঝারি শক্তির দেশগুলোর স্রেফ একটু ‘সাহসী’ হওয়া দরকার। কিন্তু সমালোচকরা মনে করিয়ে দেন, বিশ্বের সব দেশের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক ভাগ্য কানাডার মতো সুপ্রসন্ন নয়।

‘নয়া বন্দোবস্তে’ স্বাগতম, বাংলাদেশ যাবে কোথায়?multipolar world

কানাডা বিপুল তেল, গ্যাস ও জলবিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর ওপর আমেরিকার উত্তর সীমান্তে নিরাপদে অবস্থান করায়, ন্যাটোর অন্য ইউরোপীয় মিত্রদের মতো রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হুমকি ঠেকানো তাদের জন্য অতটা জরুরি কাজ নয়। ইউরোপের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “কানাডা যেভাবে আমেরিকার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে, ইউরোপের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়।” আবার ‘মাঝারি শক্তিগুলো বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে’–কার্নির এমন ফাঁকা বুলির প্রতি জাপানসহ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও এক ধরনের বিরক্তি স্পষ্ট। টোকিওতে স্পষ্টভাবেই বলা হচ্ছে–কেবল আমেরিকাই পারবে চীনকে থামাতে, আর কানাডা এসে আমাদের বাঁচাবে না।

অবশ্য দাভোসে কার্নির সেই ভাষণের পর থেকে কেটে যাওয়া মাসগুলোতে মাঝারি শক্তির দেশগুলো একেবারে হাত গুটিয়ে বসে ছিল না; কিছু ছোটখাটো সাফল্য তারা ঠিকই আদায় করে নিয়েছে। চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক বাণিজ্য বিরোধের কথাই ধরা যাক। ২৭টি দেশের এই জোটই তো বিশ্বের মধ্যম শক্তির দেশগুলোর মধ্যে হওয়া সবচেয়ে সুসংগঠিত ও প্রভাবশালী জোট! ১৫ অক্টোবর ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে জোটটির নেতারা চীনের বিরুদ্ধে কঠোর বাণিজ্য শুল্ক বা নতুন অর্থনৈতিক অস্ত্র প্রয়োগ করার ব্যাপারে চূড়ান্ত আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে সেই বৈঠকের ঠিক আগেই চীনের সুর নরম হতে দেখা যায় এবং তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ইউরোপের বাজারে তাদের ‘প্লাগ-ইন হাইব্রিড’ গাড়ি রপ্তানি সীমিত করার প্রস্তাব দেয়।

তবে এটিকে খুব বড় কোনো অর্জন বলা চলে না। কারণ, হাইব্রিড গাড়ি রপ্তানি করা চীনের কৌশলগত কোনো স্বার্থের মধ্যে পড়ে না। এর বিপরীতে, তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বেইজিংয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ অন্য এক মাত্রার বিষয়। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যদি কখনো যুদ্ধ বেধে যায়, তবে বিশ্বের এমন কোনো মধ্যম শক্তির জোট নেই যা চীনকে সামরিক আগ্রাসন থেকে পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই কেবল পিপলস লিবারেশন আর্মি বা চীনা সামরিক বাহিনীর কট্টর নীতিনির্ধারকদের মনে ভীতির সঞ্চার করতে সক্ষম। একইভাবে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটাও মূলত খুব একটা বড় ঝুঁকি ছিল না। কারণ সেই সুমেরু দ্বীপটির মালিকানা কেনার জেদটি ছিল একান্তই ট্রাম্পের নিজস্ব এক অদ্ভুত খেয়াল, যার পেছনে সাধারণ মার্কিন জনগণের কোনো জনসমর্থনই ছিল না।

তাছাড়া, কার্নির আরেকটি দাবির প্রতিও বিদেশি সরকারগুলো বেশ সংশয় প্রকাশ করেছে। তিনি বলেছিলেন যে, আমেরিকার নেতৃত্বে ভেঙে পড়া পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে মাঝারি শক্তির দেশগুলোর গড়া নতুন কোনো জোট। কূটনীতবিদরা এমন সব বিষয়ের কথা তুলে ধরেছেন যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের (কিংবা চীনের) সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছাড়া বিশ্বের বড় বড় সংকটগুলো মোকাবিলা করা একেবারেই অসম্ভব। এই বিষয়গুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা থেকে শুরু করে মহামারি মোকাবিলা বা ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি বর্তমান যুগের সবচেয়ে জরুরি বিষয়–এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা নির্ধারণ–সবই ছিল।

মক্কা চুক্তির প্রথম পরীক্ষা mecca pact

প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে অবশ্য মধ্যশক্তির দেশগুলো বেশ দ্রুততার সঙ্গে তাদের অংশীদারত্বে বৈচিত্র্য আনতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে আস্থার সংকট দিন দিনই বাড়ছে, অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না তারা। ফলে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্রগুলো এখন সুইডেন, ইতালি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর কাছ থেকে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম কিনছে। এমনকি ফ্রান্সের পক্ষ থেকে পুরো ইউরোপীয় মহাদেশের ওপর তাদের পারমাণবিক সুরক্ষা বা ‘নিউক্লিয়ার ছাতা’ বাড়িয়ে দেওয়ার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাতেও বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় সরকার প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে। যদিও তা আমেরিকার বিশাল পারমাণবিক শক্তির বিকল্প হিসেবে নয়, বরং তার একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার চরম সংকট দেখা দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো এখন দক্ষিণ কোরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, ইরানের দিক থেকে আকাশপথে হামলার হুমকিতে থাকা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিজেদের তৈরি ড্রোন-বিধ্বংসী প্রযুক্তি বিক্রি করছে ইউক্রেন। ঘটনাচক্রে ইউক্রেনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দিকটিতে একটি বাড়তি প্রযুক্তিগত সুবিধা পাচ্ছে–ইউক্রেন নিজেদের আকাশে রাশিয়ার যে ড্রোনগুলো ধ্বংস করছে, সেগুলো মূল নকশা ইরানের তৈরি করা। এই ড্রোনগুলোকে পরে রাশিয়া প্রযুক্তিগতভাবে আরও উন্নত করে এবং বর্তমানে এগুলো আবার ইরানের হাতেই পৌঁছাচ্ছে।

অন্যান্য খাতেও যখন মাঝারি শক্তির দেশগুলো নিজেদের স্বায়ত্তশাসন ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বাড়াতে চায়, তখন তারা মূলত এক পরাশক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে অন্য পরাশক্তিকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। যেমন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানের জন্য চীনের ওপর অতিনির্ভরশীলতা অনেক পশ্চিমা দেশই মেনে নিতে পারছে না। এর একমাত্র কার্যকর বিকল্প হলো, চীনের বাইরের খনিজের ক্রেতাদের একটা ক্লাব গড়ে তোলা–মূলত জি-সেভেন দেশগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ক্লাবের নেতৃত্বে আছে যুক্তরাষ্ট্র। উল্টো দিকে, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা আমেরিকার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে চিন্তিত দেশগুলো আবার চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি সৌর প্যানেল, উইন্ডমিল ও ব্যাটারির দিকে ঝুঁকছে।

গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

এমনকি মধ্যম শক্তির দেশগুলো যখন কোনো জোট গড়ে তুলছে, তার সবকটিই যে ‘কল্যাণকর’ কিংবা কার্নির প্রস্তাবিত নীতিভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা ও ‘টিম বি’র আদর্শের সঙ্গে মানানসই, তা-ও কিন্তু নয়। উদাহরণস্বরূপ, আগস্ট মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ নামের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটির মূল উদ্দেশ্যই হলো–এই তিন দেশকে যাতে কেউ ঘাঁটানোর সাহস না করে! আবার সুদানের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের কথা ধরা যাক। সেখানেও উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিছু আঞ্চলিক পরাশক্তি নিজেদের সুবিধামতো দুই পক্ষকেই ইন্ধন জুগিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।

চীনে এআই কেন এত জনপ্রিয়?AI china

চীনকে প্রযুক্তিগত ‘বিলুপ্তি ব্যবধান’ তৈরি করতে দেওয়া যাবে না

বিশ্বমঞ্চে মধ্যশক্তির দেশগুলোর সিদ্ধান্ত বা ভূমিকার গুরুত্ব যে কতটা কমে গেছে, তার সবচেয়ে বড় নজির হলো এআই খাত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই খাতে অন্যদের চেয়ে শত যোজন এগিয়ে থেকে যেখানে বিশ্ব আধিপত্যের চূড়ান্ত লড়াইয়ে মেতেছে, সেখানে এআই-এর নিরাপদ ব্যবহার ও বৈশ্বিক নীতিমালা তৈরিতে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে যৌথ সহযোগিতার কোনো লক্ষণই আপাতত দেখা যাচ্ছে না। পরাশক্তিদের এই দাপটের মুখে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে গত সেপ্টেম্বরে ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে সর্বাধুনিক এআই মডেলগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের জোর দাবি জানায়। বিশ্বের বহু দেশ এই উদ্যোগে সই করেছে, তবে ব্রিটেন করেনি। কেন করেনি? কারণ লন্ডনের লক্ষ্য হলো, নিজেদের বিশ্বমানের গবেষণাগার, ‘এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট’ এবং যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যকার সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে এআই খাতে একচেটিয়া বিশেষ অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।

অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠী ২০২৩ সাল থেকে সামরিক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের জোর দাবি জানিয়ে আসছে। কেনিয়ায় এই ফোরামের পরবর্তী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আশার কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এসব বৈঠকে অংশ নিচ্ছে–যা অন্তত একটি ইতিবাচক সূচনা। কারণ, জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে এআইয়ের নীতিমালা তৈরির যেকোনো আলোচনায় অংশ নিতে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।

তবে মোটের ওপর, এআই দৌড়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মতামত শোনার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন–কারোরই যে বিশেষ কোনো মাথাব্যথা নেই, তা স্পষ্ট। অবশ্য ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলগুলোর অভাবনীয় ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার বিকাশ দেখে ট্রাম্প প্রশাসনের এআই নিয়ন্ত্রণবিরোধী কঠোর অবস্থান হয়তো খানিকটা শিথিল হতেও পারে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রন্টিয়ার এআই গবেষণার গতি কমানোর প্রস্তাব উঠলেও একটি মহা-উদ্বেগ এড়ানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আর তা হলো–যুক্তরাষ্ট্র থামলে চীন যদি আন্তর্জাতিকভাবে টেক্কা দিয়ে এগিয়ে যায়! সে ক্ষেত্রে চীনকে থামানোর উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন হয়তো উন্নত চিপ এবং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির ওপর নতুন করে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারে। অথবা এআই-এর লাগামহীন অগ্রগতির সমর্থকরাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারেন। যার ফলে এআই প্রযুক্তির কারণে ভয়াবহ মহাবিপর্যয়ের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেবল ‘চীন যেন আগে সেই বিধ্বংসী প্রযুক্তি বানিয়ে না ফেলে’–এই আতঙ্কেই যুক্তরাষ্ট্র এআই গবেষণার গতি আরও বাড়িয়ে দেবে।

চরম ঝুঁকি ও অভূতপূর্ব সম্ভাবনার এই সন্ধিক্ষণে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো সাধারণত ছোট বা মাঝারি দেশগুলোর প্রতি কোনো ধরনের সহানুভূতি বা উদারতা দেখায় না। আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে রয়েছে মাঝের সারির দেশগুলোর আসল অস্তিত্বের সংকট। দাভোসের যে বক্তব্য নিয়ে নয় মাস পার হওয়ার পরও ভূ-রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক চলছে, সেখানে কার্নি ১৯৪৫-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার অবসানকে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছিলেন। সেই বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিগুলো এতদিন কানাডা ও তার সমমনা দেশগুলোর জন্য চমৎকার সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছিল। তবে তার দেওয়া আশাবাদী সমাধানগুলো যত সময় যাচ্ছে, ততই বাস্তবে আরও কম কার্যকর মনে হচ্ছে।

একজন নেতা বা একটি দেশের জন্য বিচক্ষণতা আর সাহস থাকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু বিপদ যখন ঘনিয়ে আসে, তখন শক্তির সামনে নিছক উপদেশ বা নীতিবাক্য পাত্তা পায় না।

(লেখাটি দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুদিত)

বিষয়: কানাডাযুক্তরাষ্ট্রচীনরাশিয়াজাপানকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাএআইযুদ্ধক্ষেপণাস্ত্রপ্রযুক্তিড্রোনইউরোপীয় ইউনিয়নঅর্থনীতিভূরাজনীতি
Advertisement
সর্বশেষ
  • ১

    ঠাকুরগাঁওয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী মির্জা ফয়সল

  • ২

    রাজায় রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে, উলুখাগড়ারা যাবে কোথায়?

  • ৩

    এলপি গ্যাসের দাম নিয়ে গণশুনানি, দাম বাড়ছেই?

  • ৪

    নতুন মস্তিষ্ককোষ বাঁচাতে টেস্টোস্টেরনের ভূমিকা

  • ৫

    বন্ধু দ্বীপের সাথে মধ্যরাত পর্যন্ত ছিলেন তাহসিফ, মোটরসাইকেল কোথায়?

সম্পর্কিত
  • এলপি গ্যাসের দাম নিয়ে গণশুনানি, দাম বাড়ছেই?

    এলপি গ্যাসের দাম নিয়ে গণশুনানি, দাম বাড়ছেই?

    আবারও কি ব্যবসায়ীদের দাবিই মেনে নেবে সরকার? সরকার বলতে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি। পরিস্থিতি কি সেদিকেই যাচ্ছে? বৃহস্পতিবার গণশুনানির পর বিইআরসি চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অন্তত তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

  • গঙ্গা চুক্তি নবায়নে ভারতকে ‘চাপ দিচ্ছে’ বাংলাদেশ

    গঙ্গা চুক্তি নবায়নে ভারতকে ‘চাপ দিচ্ছে’ বাংলাদেশ

    ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। এসব নদীর মধ্যে গঙ্গা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।

  • নেতানিয়াহু হারলে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে?

    নেতানিয়াহু হারলে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে?

    ইসরায়েলের পার্লামেন্টের নির্বাচন ভোটগ্রহণ শেষে গণনা চলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বুথ ফেরত জরিপের তথ্য বলছে, দেশটির প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোটের কোনোটিই সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।

  • ইসরায়েলে যে কারণে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী থাকছেন নেতানিয়াহু

    ইসরায়েলে যে কারণে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী থাকছেন নেতানিয়াহু

    জোট গঠন নিয়ে আলোচনা চলাকালে এবং সম্ভাব্যভাবে আগামী বছর আরেকটি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।