যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একের পর এক কৌশলগত সুবিধা এনে দিচ্ছে। রুশ ডিজেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ, ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের পক্ষে ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা বন্ধে কিয়েভের ওপর মার্কিন চাপ—সব মিলিয়ে মস্কোর জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসব সুবিধার বিনিময়ে পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করার কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বরং তার অবস্থান ও সাম্প্রতিক রুশ হামলাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মস্কো।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব, জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণের চাপ এবং ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের রাশিয়াপন্থী ঝোঁক কীভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনীতিকে প্রভাবিত করছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে।
এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো পুতিনের জন্য সুবিধা তৈরি করলেও ইউক্রেনের জন্য যুদ্ধের সামরিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রতিবেদনটির কেন্দ্রীয় বক্তব্য হলো, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং পুতিনের কৌশলগত লক্ষ্য এমন এক জায়গায় এসে মিলেছে, যেখানে ইউক্রেনের স্বার্থ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানো ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণের চেষ্টায় তিনি ইউক্রেনকে এমন কিছু ছাড় দিতে চাপ দিচ্ছেন, যার বিনিময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে সমপরিমাণ কোনো ছাড় আদায় করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অবস্থান থেকে সুবিধা নিচ্ছেন। রাশিয়া অর্থনৈতিক অবকাশ পাচ্ছে, ইউক্রেনের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ছে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মস্কোর আত্মবিশ্বাস শক্তিশালী হচ্ছে।
ট্রাম্প রুশ ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রস্তাব দেওয়ার পরপরই ক্রেমলিন আবারও জানিয়ে দেয়, এই মুহূর্তে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পুতিন আগ্রহী নন। গত মাসে রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময় ইউক্রেনীয় হামলার কারণে পুতিন ক্ষুব্ধ—আলোচনায় অনাগ্রহের পেছনে এমন যুক্তি তুলে ধরে মস্কো। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার পরও রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের পথে অগ্রসর হওয়ার কোনো ইতিবাচক সংকেত দেয়নি। বরং পরদিন ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া শহরে রুশ হামলায় ২২ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে চারটি শিশু ছিল।
এই ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: রাশিয়াকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে এবং ইউক্রেনকে সামরিক পদক্ষেপ সীমিত করতে বাধ্য করে কি সত্যিই যুদ্ধ বন্ধের পথ তৈরি করা সম্ভব? ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপে অন্তত এখন পর্যন্ত তার কোনো প্রমাণ দেখা যাচ্ছে না। বরং পুতিনের আচরণ থেকে বোঝা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি এবং ইউক্রেনের ওপর চাপ বৃদ্ধিকে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তার কৌশল কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অগ্রগতি অর্জনের ওপর নির্ভরশীল নয়; ইউক্রেনের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করা, দেশটির অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আঘাত হানা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়াও এর অংশ।
ট্রাম্পের ঘোষিত ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ এই বৈপরীত্যের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ইউক্রেনের প্রস্তাব ছিল, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করে, তাহলে কিয়েভও রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা স্থগিত করতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প রোববার যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, তার অর্থ ছিল দুই দেশই তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখবে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের মাত্র একটি বড় তেল শোধনাগার রয়েছে এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার হামলায় সেটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ফলে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর ওপর ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করার বিনিময়ে মস্কোকে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করার কোনো সমতুল্য ব্যবস্থা এই ঘোষণায় নিশ্চিত হয়নি।
এখানেই যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে মৌলিক অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেশটির বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়ে মস্কোর যুদ্ধ অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে। ট্রাম্পের ঘোষণার ফলে ইউক্রেনকে তার কার্যকর পাল্টা আক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম থেকে বিরত রাখার চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার পক্ষ থেকে একই ধরনের সামরিক সংযম নিশ্চিত করার কার্যকর নিশ্চয়তা নেই। ফলে আপাতদৃষ্টিতে দুই পক্ষের জন্য সমান শর্তের যুদ্ধবিরতি হলেও বাস্তবে এর প্রভাব দুই দেশের ওপর সমান হবে না।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন। কারণ, রাশিয়ার যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার জন্য পশ্চিমা দেশগুলো এত দিন মস্কোর আয়ের উৎস সংকুচিত করার চেষ্টা করেছে। রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি সেই আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ইউক্রেনের তেল শোধনাগারে হামলা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহেও সমস্যা তৈরি করেছে। দেশটির বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি নিতে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে এবং বিশ্বের অন্যতম বড় ডিজেল সরবরাহকারী রাশিয়াকে রপ্তানি স্থগিত করতে হয়েছে। ইউক্রেনের এই হামলাগুলো রুশ অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাবকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের হামলার কারণে রাশিয়ার তেল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস খাত থেকে কর-রাজস্ব আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ শতাংশ কমেছে। জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও এই পতন ঘটেছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুবলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ভর্তুকিও রাজস্ব পরিস্থিতিতে ভূমিকা রেখেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ইউক্রেনের হামলা রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে। এখন সেই চাপ কমে গেলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
রুশ ডিজেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ তাই কেবল জ্বালানি বাজারের একটি সিদ্ধান্ত নয়; এটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এই চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন ডলার প্রবেশ করতে পারে। এর পাশাপাশি ইউক্রেন যদি মার্কিন চাপের মুখে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ রাখে, তাহলে মস্কো আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়। সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, সেনা পরিচালনা এবং যুদ্ধের অন্যান্য ব্যয় মেটাতে রাশিয়ার রাজস্ব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে যে সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প জ্বালানিসংকট মোকাবিলার অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন, সেটিই রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
তবে এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানিসংকট সমাধানে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতিবিদদের মতে, আলোচনায় থাকা জ্বালানির পরিমাণ ডিজেলের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার জন্য যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ, রাশিয়াকে যে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তারা কতটা উপকৃত হবেন, তা অনিশ্চিত। ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাবের কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানির দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু দাম বৃদ্ধির পেছনে যে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কাজ করছে, তা বিবেচনায় না নিলে এই ধরনের সীমিত চুক্তির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক আলেকজান্ডার গাবুয়েভের বক্তব্য এই রাজনৈতিক হিসাবের ব্যাখ্যা দেয়। তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের মনোযোগ মূলত নিজের রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে তার নিজস্ব ব্যাখ্যার ওপর কেন্দ্রীভূত। গাবুয়েভ মনে করেন, ট্রাম্প নিজের সিদ্ধান্তে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে—এই বাস্তবতা স্বীকার করতে অনিচ্ছুক। তার দৃষ্টিতে, ট্রাম্পের বিবেচনায় উপসাগরীয় যুদ্ধ বর্তমান ডিজেল সংকটের কারণ হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। পরিবর্তে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের প্রতি ট্রাম্পের পূর্ববর্তী ঝোঁকের কারণে পুতিনের কাছ থেকেই তিনি একটি দ্রুত সমাধান খুঁজছেন।
এখানে ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতে পুতিনের পরিস্থিতি খুব একটা অনুকূল ছিল না। রাশিয়ার যুদ্ধব্যয় দ্রুত বাড়ছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি ছিল ধীর এবং দেশটির প্রধান রপ্তানি পণ্য তেলের আন্তর্জাতিক দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলারে নেমে এসেছিল। কিন্তু ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। ফলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
একই সঙ্গে ইরানের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্ররা বিপুল পরিমাণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। এর ফলে ইউক্রেনের জন্য এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ আরও সীমিত হয়ে পড়ে।
রাশিয়ার হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেনের যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রয়োজন, সেগুলোর ঘাটতি দেশটির নিরাপত্তাকে দুর্বল করে তুলেছে। অর্থাৎ, ইরান যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য একাধিক সুবিধা তৈরি করেছে: তেলের দাম বেড়েছে, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে এবং ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় পুতিনকে নতুন কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বাড়িয়ে মস্কোর অর্থনৈতিক সুবিধা সীমিত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এখন ট্রাম্প সেই পাল্টা কৌশল বন্ধ করার জন্য কিয়েভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। ফলে একটি আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব অন্য একটি যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট মোকাবিলার চেষ্টা ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে রাশিয়ার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। এই দুই যুদ্ধের পারস্পরিক সম্পর্কই বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ট্রাম্পের রাশিয়ানীতির আরেকটি দিক হলো পুতিনকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পুনরায় গ্রহণযোগ্য অবস্থানে নিয়ে আসা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন এ বছর উত্তর ক্যারোলাইনা ও উইসকনসিনে অনুষ্ঠিত জি-২০-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচিতে রুশ মন্ত্রীদের স্বাগত জানিয়েছে। ডিসেম্বর মাসে মিয়ামিতে জি-২০ সম্মেলনে পুতিনকে আতিথ্য দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসন ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। ট্রাম্পের দল এসব উদ্যোগকে শান্তিচুক্তির জন্য প্রণোদনা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
কিন্তু এখানে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। রাশিয়াকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া, আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো কিংবা সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি—এসব পদক্ষেপ মস্কোকে আলোচনায় উৎসাহিত করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পুতিন যদি মনে করেন, সময় তার পক্ষে কাজ করছে এবং পশ্চিমা দেশগুলো শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া কমিয়ে দেবে, তাহলে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করার পরিবর্তে চাপ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করতে পারেন।
ট্রাম্প ২০২৫ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরার পর মস্কোর প্রত্যাশা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করে দেবে এবং প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ক্রেমলিনের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করবে। ২০২৫ সালের মার্চে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির প্রকাশ্য বিরোধ সেই প্রত্যাশাকে আরও জোরালো করে। এর পর ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়া স্থগিত করা এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ রাখার মার্কিন সিদ্ধান্ত মস্কোর আশাবাদ বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ইউক্রেন থেকে সরে আসেনি। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আবার শুরু হয়েছে। ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে রাশিয়ার প্রত্যাশিত সম্পূর্ণ মার্কিন বিচ্ছিন্নতা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলা শান্তি আলোচনা কার্যত গতি হারিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মস্কো বুঝতে পারছে, ওয়াশিংটন ইউক্রেনের সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ না করলেও কিয়েভের ওপর চাপ সৃষ্টি করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ক্রেমলিনের উপদেষ্টা ফিওদর লুকিয়ানভ গত মাসে লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক সহায়তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, তাহলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে তার মতে, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হলেও শেষ পর্যন্ত তা নেওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, ইউক্রেনের সম্পূর্ণ পরাজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী মহলে ট্রাম্পের জন্য প্রশংসা বয়ে আনবে না। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল সম্প্রতি সিনেটে পাস হয়েছে। দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে পরিচিত এই বিলটি এমন ব্যবধানে পাস হয়েছে, যা প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। যদিও জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞার কিছু বিধান স্থগিত বা শিথিল করার ক্ষমতা রাখেন, রুশ ডিজেল আমদানির জন্য তাকে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে। ফলে তার প্রশাসনের রাশিয়ানীতির সঙ্গে কংগ্রেসের অবস্থানের বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
এই বিরোধের গুরুত্ব শুধু মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং একই সময়ে নতুন নিষেধাজ্ঞার আইন পাস হওয়া ওয়াশিংটনের নীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। মস্কো এই অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের জন্যও প্রশ্ন তৈরি হয়—মার্কিন সহায়তা কতটা স্থিতিশীল থাকবে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন কতটা দৃঢ় থাকবে?
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক বিপদ হয়ে উঠছে শীতকাল। জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের বিশ্লেষক হানা নোতে, যিনি রুশ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে একটি নতুন বই লিখেছেন, মনে করেন, পুতিনের বর্তমান লক্ষ্য ইউক্রেনের মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন শীত তৈরি করা। রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের অবকাঠামো ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। শীতের সময় এই অবকাঠামোর ওপর হামলা হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, নগরসেবা এবং দেশের সামগ্রিক প্রতিরোধক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর অগ্রগতি সীমিত থাকলেও পুতিনের কৌশল দীর্ঘমেয়াদি। তিনি বিশ্বাস করেন, ইউক্রেন এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের তুলনায় রাশিয়া দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। পশ্চিমা দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক সমস্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচনী চাপ বাড়লে ইউক্রেনকে সহায়তা করার আগ্রহ কমে যেতে পারে। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই মস্কো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সময়কে নিজের পক্ষে কাজে লাগাতে চাইছে।
ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও রাশিয়ার এই হিসাবকে প্রভাবিত করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছরের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন লো পেন ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেন, যিনি ইউক্রেনকে আর্থিক সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসও এমন একটি কট্টর ডানপন্থী দলের চাপের মুখে রয়েছেন, যারা ইউক্রেনকে সহায়তা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স উচ্চ সরকারি ঋণের চাপ মোকাবিলা করছে, আর বর্তমান সুদের হারে এই ঋণ পরিশোধ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
অর্থাৎ, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে না। ইউরোপীয় দেশগুলোর নির্বাচনী রাজনীতি, সরকারি ব্যয়ের চাপ এবং জনমতের পরিবর্তনও যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। পুতিনের কৌশল হলো, ইউক্রেনের সামরিক প্রতিরোধ অব্যাহত থাকলেও তার মিত্রদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে। যদি পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের সমস্যায় ব্যস্ত হয়ে ইউক্রেনের প্রতি সহায়তা কমিয়ে দেয়, তাহলে রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের নতুন অগ্রগতি অর্জন না করেও কূটনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
র্যান্ড করপোরেশনের রাশিয়া-বিষয়ক বিশ্লেষক স্যাম চারাপের মতে, ক্রেমলিনের দৃষ্টিকোণ থেকে ভবিষ্যৎ এখন রাশিয়ার অনুকূলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে। যুদ্ধের ফলাফল মস্কোর শর্তের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে রুশ নেতৃত্ব আশাবাদী। চারাপের যুক্তি হলো, পুতিনের হিসাব পরিবর্তন করতে হলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার এই আশাবাদ কমাতে হবে। অর্থাৎ, শুধু আলোচনার আহ্বান জানানো বা অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া যথেষ্ট নয়; রাশিয়াকে বুঝতে হবে, দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে গেলেই তার কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হবে না।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে নেওয়া কোনো পদক্ষেপের কার্যকারিতা বিচার করতে হবে তার বাস্তব ফল দিয়ে, ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে নয়। রাশিয়াকে জ্বালানি আয়ের সুযোগ দেওয়া, ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণ সীমিত করার চাপ সৃষ্টি করা কিংবা পুতিনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি করা—এসব পদক্ষেপ যদি মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে সেগুলো শান্তির পথ সুগম করার পরিবর্তে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে পারে। একইভাবে, ইউক্রেনকে ছাড় দিতে বাধ্য করা হলেও রাশিয়ার কাছ থেকে সমপরিমাণ ছাড় আদায় করা না গেলে আলোচনার ভারসাম্য নষ্ট হয়।
পুতিনের সামনে এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে সীমিত অগ্রগতি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন। অন্যদিকে, ইউক্রেনকে অস্ত্রের ঘাটতি, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং পশ্চিমা সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এই বৈষম্য যত বাড়বে, যুদ্ধের সমাধান তত কঠিন হতে পারে। কারণ, যে পক্ষ মনে করে সময় তার পক্ষে কাজ করছে, সে পক্ষ সাধারণত দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য কম আগ্রহী হয়।