ক্রিকেটীয় পরিভাষায় ‘ব্রেইন ফেড’ খুবই পরিচিত একটি শব্দ। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে যারা সম্যক পরিচিত, তাদের কাছে ২০১৯ বিশ্বকাপে মুশফিকুর রহিমের সেই রানআউট মিস ছিল তেমনই এক ঘটনা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তৃতীয় দিনে হৃদয় যে শটটি খেলে আউট হলেন, সেটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্রেইন ফেড ঘটনা কি না, তা নিয়ে তর্ক হতেই পারে।
অভিষেকের পর অল্প সময়ের মধ্যেই হৃদয় সাদা বলের ক্রিকেটে খুবই চেনা এক নাম হয়ে উঠেছেন। এর কারণ তার শট খেলার প্রবণতা। তবে মিডল অর্ডারে ব্যাট করলেও তার ব্যাটিং বেশ পরিণত। চার দিনের ক্রিকেটেও তিনি অতীতে বড় বড় ইনিংস খেলেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে ৩৫০ রানের এক ম্যারাথন ইনিংস খেলেন হৃদয়।
এরপর প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেছিলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মিডল অর্ডারের কাণ্ডারি হতে পারেন হৃদয়। মুশফিক টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলে পাঁচ নম্বরে তিনিই হতে পারেন যোগ্য উত্তরসূরি।
তবে তার আগেই মুশফিকের মতোই ২২ গজে ব্যাখ্যাহীন কাণ্ড ঘটাচ্ছেন হৃদয়। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে বাজে শটে আউট হওয়া কিংবা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কেন উইলিয়ামসনকে রানআউট করার সুযোগ মিস করা—এমন আরও অনেক ব্রেইন ফেড মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন মুশফিক।
প্রথম ইনিংসে ৪২ রান করেছিলেন তাওহীদ হৃদয়। ছবি: বিসিবি
তার জায়গাটা যিনি নিতে পারেন, সেই হৃদয় প্রথম টেস্টে খেলছেন মুশফিকের চোটের কারণেই। এরপর ডানহাতি এই ব্যাটসম্যানের মূল কাজ ছিল ব্যাট হাতে নিজেকে এমনভাবে প্রমাণ করা, যাতে মুশফিক ফিট হয়ে একাদশে ফিরলেও তাকে যেন কোনোভাবেই বাদ দেওয়া না যায়।
প্রথম ইনিংসে রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছাড়ার পর ফিরে এসে ৪২ রান করেন হৃদয়। তবে মূল পরীক্ষা ছিল দ্বিতীয় ইনিংসে। ২৮ রানে ২ উইকেট হারানোর পর ব্যাট করতে নামেন তিনি। টার্নিং উইকেটে ভয়ংকর হয়ে ওঠা রোস্টন চেজের মুখোমুখি দ্বিতীয় বলেই উইকেট স্রেফ বিলিয়ে দিয়ে আসেন হৃদয়।
অফ সাইডে ফিল্ডিং সাজিয়ে ফাঁদ পেতেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক। সেই ফাঁদে পা দিয়ে দলের অবস্থা, ম্যাচের প্রেক্ষাপট—সব ভুলে উড়িয়ে মারার চেষ্টা করলেন হৃদয়। ফলাফল, মিড-অনে সহজ ক্যাচ।
উইকেটে টিকে থাকা কঠিন, দল চাপে, লিড কম এবং একাদশে জায়গা নিশ্চিত নয়—এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে হৃদয় যেভাবে আউট হয়েছেন, এর কোনো ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা সম্ভবত তার নিজের কাছেও নেই।
প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৫০ রানের মালিক তাওহীদ হৃদয়। ছবি: বিসিবি
চেজের যে ডেলিভারিতে হৃদয় শটটি খেলেছেন, তা কাউন্টার অ্যাটাকিং ক্রিকেটের একটি ভালো উদাহরণ হতে পারত, যদি তিনি সফল হতেন। কিন্তু তিনি পারেননি। টেস্ট ক্রিকেটে এখনো পায়ের তলার মাটি খুঁজে না পাওয়া একজন ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে এমন শট ঠিক কতটা প্রত্যাশিত?
বিশেষ করে ৩৫০ রান করার মতো টেম্পারামেন্ট যদি একজন ব্যাটসম্যানের থাকে, তাহলে তিনি কেন এতটা অধৈর্য হয়ে পড়লেন? মাত্র দ্বিতীয় বলেই কেন এমন শট খেলতে গেলেন? এসব কারণেই হয়তো এখনো পাঁচ নম্বর পজিশনের জন্য টেস্টে বাংলাদেশ দল মুশফিকের ওপরই ভরসা করছে। প্রায় চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়সেও তরুণদের চেয়ে এগিয়ে আছেন তিনি।
টেস্ট ক্রিকেটে পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলতে পারাটাই একজন ব্যাটসম্যানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কখনো আক্রমণ করতে হবে, আবার কখনো রক্ষণাত্মক হতে হবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসে তেজনারায়ণ চন্দরপল ঠিক সেই কাজটাই করেছিলেন। মূলত সেই কারণেই অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানরা দীর্ঘ সময় ব্যাট করে ভালো স্কোর গড়ার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি স্রেফ উইকেটে মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন। নিজেকে প্রমাণের আদর্শ মঞ্চ পেয়েও হৃদয় সেই কাজে একেবারেই ব্যর্থ।
আর তাই হৃদয় টেস্ট ক্রিকেটের জন্য কতটা প্রস্তুত, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে সাড়ে তিনশ রান করা একজন ব্যাটসম্যান কেন নিজের উইকেটের মূল্য বুঝতে পারবেন না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
তবে নির্বাচকদের জন্য আপাতত কাজটা কিছুটা সহজই করে দিয়েছেন হৃদয়। কেন তারা হৃদয়কে বসিয়ে মুশফিককে খেলাচ্ছেন, অন্তত কিছুদিন এই প্রশ্নের উত্তর তাদের দিতে হবে না।