বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য জানাচ্ছে, বাজেটের আওতাধীন দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংক থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজর ২৪৫ কোটি টাকা। একই ধারাবাহিকতায় নভেম্বরের গোড়াতে সরকারি কর্মচারীদেরকে নতুন বেতন স্কেলে অক্টোবর মাসের বেতন দেওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে আরো ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে এ ঋণ নেওয়া ছাড়া সরকারের হাতে তেমন কোনো বিকল্পও হয়তো ছিল না। কারণ অর্থবছরের প্রথম দু মাসেই (জুলাই-আগস্ট) রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকা।
আর এ ঘাটতি তৈরি হওয়ার বিষয়টিও ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। কর আদায় ব্যবস্থার নানা ত্রুটি, দুর্বলতা ও অস্বচ্ছতার মধ্যেও আবার সবচেয়ে বেগবান হয়ে দেখা দিয়েছে কর মাফ করে দেওয়ার সংস্কৃতি। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যেখানে কর আদায় হয়েছে জিডিপির ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ, সেখানে মাফ করে দেওয়া হয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ধারণা করা যায়, এ ধারা এখনও অব্যাহত আছে এবং সে কারণে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ এ অর্থবছরেও মাফ করে দেওয়া করের তুলনায় কম হবে।
এ অবস্থায় আসন্ন মাসগুলোতেও-যে সরকার ঋণের জন্য আবারও বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হবে, তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। আর বাংলাদেশ ব্যাংকেরও উচিত হবে এজন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা। অন্যদিকে জ্বালানি ঘাটতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, উপকরণ সরবরাহে ঘাটতি প্রভৃতি কারণে প্রবৃদ্ধির হার শুধু-যে শিল্পখাতেই নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে তাই নয়। একইসঙ্গে কৃষি, সেবা প্রভৃতি খাতেও তা প্রায় কাছাকাছি ধারাতেই হ্রাস পাচ্ছে।
সেই সাথে বাড়ছে বেকারত্ব তথা কর্মসংস্থানহীনতাও, যার প্রাকারান্তরিক পরিণাম হচ্ছে দারিদ্র্যের হার অসহনীয় মাত্রায় বেড়ে যাওয়া, যা ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) জরিপমতে ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে ২০২৫ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর অর্থনীতির বর্তমান গতিধারা এবং রাষ্ট্রের এতদসংক্রান্ত চলমান নীতিকাঠামো বহাল থাকলে মোটামুটিভাবে ধরেই নেয়া যায় যে, সহসা দেশের অর্থনীতিতে গতি সৃষ্টি হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই। বরং দিনে দিনে তা আরো অবনতির দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কাই সর্বাধিক।
তো এই যখন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, তখন ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাষ্ট্রের বর্তমান কেন্দ্রীয় সচিবালয়কে সেগুনবাগিচা থেকে শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যুক্তি হিসেবে বর্তমান ভবনসমূহে স্থান সঙ্কুলান না হওয়া, ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহনীয়তা না থাকা, আধুনিক অবকাঠামো সুবিধার ঘাটতি ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে, যা খুবই যথার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, স্থান সঙ্কুলানই যদি মূল সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে যতটুকু স্থানের ঘাটতি রয়েছে, কেনো উপযুক্ত স্থানে ততটুকু নির্মাণ করাটাইতো যুক্তিযুক্ত।
এরজন্য পুরো সচিবালয় স্থানান্তর করতে হবে কেন? পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাতীয় সংসদ সচিবালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইত্যাদিতো আগে থেকেই বাইরে ও আলাদা অবস্থানে রয়েছে এবং এতে কাজের বরং আরো সুবিধাই হচ্ছে (এশীয় দেশ মালয়েশিয়ার নতুন সচিবালয় পুত্রজয়ার প্রতিটি আলাদা আলাদা ভবনে)। ফলে চলতি ব্যবস্থার আদলে শেরেবাংলা নগরে সীমিত পরিমাণ ভূমিতে সীমিত সংখ্যক ভবন নির্মাণ করলেই স্থান সঙ্কুলানের সমস্যাটি মিটে য়ায়। এমনকি ইচ্ছা করলে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বর্তমান পরিকল্পনা কমিশন চত্বরে অবস্থিত ভবনগুলোর ঊর্ধমুখী সম্প্রসারণের মাধ্যমেও এ প্রয়োজন মেটানো যেতে পারে। মনে রাখা দরকার, সীমিত ভূমির এ দেশে প্রতি ইঞ্চি ভূমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারই কাম্য।
আর ভূমিকম্প সহনীয়তা ও আধুনিক অবকাঠামোগত ঘাটতি প্রসঙ্গে বলি। বাংলাদেশের অপরাপর অধিকাংশ ভবন কি ভূমিকম্প সহনীয় ব্যবস্থার আওতায় নির্মিত হয়েছে? ওইসব অধিকাংশ ভবনে কি আধুনিক অবকাঠামো সুবিধাদি রয়েছে? বলছি না যে, ভূমিকম্প সহনীয়তার ব্যবস্থা আগে রাখা হয়নি বলে এখন তা উপেক্ষা করতে হবে। বলার শুধু এটি যে, কাজগুলো রয়েসয়ে ও সময় নিয়ে ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করে গুছিয়ে করা উচিত। হঠাৎ সচিবালয় স্থানান্তরের চিন্তা মাথায় আসলো আর কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই, পর্যালোচনা ও কারিগরি সমীক্ষা ছাড়াই চর দখলের মতো রাতারাতি তা সম্পন্ন করে ফেলার সিদ্ধান্ত কিছুতেই কোনো স্বচ্ছ সুচিন্তা হতে পারে না।
বাংলাদেশ সচিবালয়। ছবি: বাসস
সামগ্রিক বিবেচনায় উক্ত স্থানান্তর দেশের জন্য যথেষ্ট মাত্রায় উপকারী হবে কিনা, এরমধ্য দিয়ে সাধারণ জনগণের সেবা প্রাপ্তির সুবিধা বাড়বে কিনা, নতুন ভবনের নকশা কেমন হবে বা তা যথেষ্ট নান্দনিক ও আধুনিক সুবিধাসম্বলিত হচ্ছে কিনা, আধুনিক নগর পরিকল্পনার সকল অনুষঙ্গ ও বিষয়াদি এতে যুক্ত হলো কিনা, এ স্থানান্তরের ফলে ঢাকা শহরের যানজট পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে কিনা ইত্যাদি কোনো বিষয়ইতো এ পরিকল্পনা গ্রহণের আগে সুনির্দিষ্ট সমীক্ষার আওতায় যাচাই-বাছাই করে দেখা হলো না!
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার আগেই এতদসংক্রান্ত প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ জানিয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি চলে গিয়েছে। এর মানে হচ্ছে, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে প্রকল্প দলিল প্রণীত, পরীক্ষিত ও অনুমোদিত হওয়ার আগেই পরিকল্পনা প্রণয়ন সংক্রান্ত দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে এটি বাজেটে বা এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিষয়টি কি কোনো ভালো লক্ষ্মণ কিংবা এতে যদি কেউ কোনো সন্দেহ করে বসেন, তাহলে কি তাকে দোষ দেয়া যাবে? সচিবালয় যদি স্থানান্তর করতেই হয়, তাহলে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিয়ে ও যাচাই-বাছাই করে গুছিয়ে ও নিয়মমাফিক করতে বাধা কোথায়? কোনো বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ নীতিগত সিদ্ধান্ত দিতেই পারে। কিন্তু নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব হচ্ছে, উক্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি কারিগরি ও পেশাগত দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী করণীয় মন্ত্রিপরিষদের কাছে তুলে ধরা।
আর সে করণীয়র আওতায় গৃহীত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করা বা না-করা উভয় প্রস্তাবই থাকতে পারে। কিন্তু বিষয়টি একেবারেই সে প্রক্রিয়ায় এগোয়নি, যা দাপ্তরিক শৃঙ্খলার একটি পরিপন্থী আচরণ বৈকি! মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে নতুন সচিবালয় নির্মাণ করে ২০২৯ সাল নাগাদ নতুন ভবনে অফিস শুরু করে দিতে হবে–এটি কোনো বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
সবমিলিয়ে তাই বলবো, জনপ্রশানের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আধুনিক অবকাঠামোগত সুবিধা সম্বলিত অফিস ভবন অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তারজন্য পুরো সচিবালয় স্থানান্তর জরুরি নয়। যেসব সুবিধার ক্ষেত্রে এখন ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো বর্তমান স্থানেও সংস্থাপন করা যেতে পারে। বর্ধিত স্থান সঙ্কুলানের জন্য সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের একটি প্রস্তাবও ইতোমধ্যে একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানা যায়, যেটি অনুমোদিত হলে স্থান-সমস্যা অনেকটাই মিটে যাবে বলে আশা করা যায়।
তারপরও যদি স্থান-ঘাটতি থাকে তাহলে কোনো উপযুক্ত স্থানে সীমিত সংখ্যক ভবন নির্মাণের মাধ্যমে তা পূরণ করা যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে সম্পূর্ণ নতুনভাবে একটি আস্ত সচিবালয় নির্মাণের ধারণা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়– অর্থনীতির এ দুঃসময়েতো নয়ই। এরপরও চিন্তাটি যেহেতু মাথায় এসেছে সেহেতু বলবো, সচিবালয় স্থানান্তরের চিন্তা আপাতত স্থগিত রেখে বিষয়টিকে কারিগরি, স্থাপত্যিক, অর্থনৈতিক, জনসেবার মানোন্নয়ন ও নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার কাজ চলতে থাকুক। আর তাতে যদি প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয় এবং ততোদিনে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যদি ভালো অবস্থায় ফিরে আসে, তাহলে তখন বিষয়টিকে পুনরায় বিবেচনা করা যেতে পারে।
আবু তাহের খান: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা।